নিজভূমে পরবাসী ফিলিস্তিনিরা

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার মানুষকে ‘অসহায়’ বলে অ্যাখায়িত করলে খুব একটা অত্যুক্তি হবে না। কেননা উপত্যকাটিকে অবরুদ্ধ করে বিশ্ব সম্প্রদায়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দশকের পর দশক আগ্রাসন চালিয়ে আসছে ইসরায়েল। হামাসকে নির্মূলের নামে একদিকে ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা; অন্যদিকে অস্ত্র ও পেশিশক্তির জোরে মহোৎসবে ফিলিস্তিনিদের জমির নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে দখলদার ইসরায়েল। প্রতিবছর ৩০ মার্চকে ‘ভূমি দিবস’ হিসেবে পালন করে ফিলিস্তিনিরা। এই ভূমি দিবসের ৫০ বছরের মধ্যেই অধিকাংশ ভূমি হাতছাড়া হয়েছে ফিলিস্তিনিদের। ১৯৭৬ সালের ৩০ মার্চ ইসরায়েলি কর্র্তৃপক্ষ গ্যালিলি অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ ফিলিস্তিনি জমি নিজেদের দখলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল; তার প্রতিবাদে একাধিক গ্রাম ও শহরে বিস্তৃত ধর্মঘট ও নানান কর্মসূচি নেওয়া হয়। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এই প্রতিবাদ গুঁড়িয়ে দেয় ইসরায়েল, প্রাণ হারান ছয় ফিলিস্তিনি, আহত হন অনেকে, গ্রেপ্তার কয়েকশ। এর প্রতিবাদেই ৩০ মার্চকে ‘ভূমি দিবস’ হিসেবে পালন শুরু করে ফিলিস্তিনিরা। দিনটি হয়ে ওঠে তাদের জাতীয় পরিচয়ের অনুষঙ্গ, জমির সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের সম্পর্ক ও জমি বেদখল প্রত্যাখ্যানের প্রতীক।

পশ্চিম তীরের জেনিনের দক্ষিণে নিজের জমিতে কয়েক দশক আগে নিজের হাতে যে জলপাই গাছগুলো লাগিয়েছিলেন, সম্প্রতি সেগুলো কেটে ফেলার মতো দুঃসহ এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে ৬৫ বছর বয়সী আবদুল রহমান আজমকে। অবৈধ এক বসতির রাস্তা নির্মাণে ওই জমিটি জব্দে ইসরায়েলি কর্র্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের পর তিনি নিজেই ওই গাছগুলো কেটে ফেলেন। গত ডিসেম্বরে ইসরায়েল ৫১৩ ডুনামের (৫১ দশমিক ৩ হেক্টর) বেশি জমি করায়ত্ত করেছিল, তার মধ্যে ৪৫০ ডুনামই ছিল আল-ফান্দাকুমিয়া গ্রামের, বাকিটুকু সিলাত আদ-দাহর ও আল-আত্তারার মতো পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোর। ফিলিস্তিনিরা যখন এ বছর ভূমি দিবসের ৫০ বছর পালন করছে, তখনো অবৈধ ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, ভূমি বেদখল, নিজের জমিতে সীমিত প্রবেশাধিকারের মতো চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে।

১৯৯৩ সালে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের সঙ্গে ইসরায়েলের স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী পশ্চিম তীরকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে এরিয়া এ থাকার কথা পুরোপুরি ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণে, পশ্চিম তীরের ১৮ শতাংশের মতো এলাকা এ অঞ্চলভুক্ত। ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের যৌথ নিয়ন্ত্রণে থাকবে এরিয়া বি, এটি পশ্চিম তীরের ২২ শতাংশ। বাকি ৬০ শতাংশই এরিয়া সি, যা পুরোপুরিভাবে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে আছে। বসতি সম্প্রসারণ পরিকল্পনা কার্যকরের প্রস্তুতিস্বরূপ ইসরায়েল ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পশ্চিম তীরের এরিয়া সি এলাকায় একের পর এক ফিলিস্তিনি জমি জব্দের আদেশ এত দ্রুতগতিতে দিয়ে যাচ্ছে, তাতে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে এ বিশ্বাস পোক্ত হয়েছে যে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিলেও ইসরায়েল পুরো এলাকায় নিজেদের বসতি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা জোর কদমে এগিয়ে নিচ্ছে।

ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষের কমিশন অ্যাগেইনস্ট ওয়াল অ্যান্ড সেটেলমেন্টসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সামরিক কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে জমি জব্দের ৯৪টি আদেশের মাধ্যমেই ইসরায়েল ৫ হাজার ৫৭২ ডুনাম জমি দখল করেছে। এর বাইরে রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহারে জমি নেওয়ার তিনটি আদেশ ও কিছু জমিকে রাষ্ট্রীয় ভূমি ঘোষণার চারটি আদেশও জারি করা হয়েছে। এসব আদেশ বসতি সম্প্রসারণ, সীমানার নিরাপত্তা, রাস্তা নির্মাণ এবং ফিলিস্তিনিদের জমিকে খণ্ড খণ্ড করে এর স্বাভাবিকতা নষ্ট করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলেই মত কমিশনের। একইসঙ্গে ইসরায়েল আগে থেকে দখল করা ১৬ হাজার ৭৩৩ ডুনাম জমিও গবাদি পশু চরানোর জন্য সেটলারদের দিয়ে দিয়েছে, যাকে বিপজ্জনক পদক্ষেপ বলছে কমিশন।

অন্য আরেক প্রতিবেদনে কমিশন জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে ইসরায়েল ৫৫ হাজার ডুনাম জমি দখল করেছে। এর মধ্যে ২০ হাজার ডুনাম দখল করেছে প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকার সীমানা সংশোধনের অজুহাতে। জেরুজালেম, নাবলুস, রামাল্লা, বেথেলহেম ও কালকিলিয়া শহরের ২৬ হাজার ডুনাম নিয়েছে ১৪টি ‘রাষ্ট্রীয় ভূমি’ ঘোষণার মাধ্যমে। বিভিন্ন বসতির আশপাশে সামরিক টাওয়ার, নিরাপত্তা সড়ক ও নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১০৮টি সামরিক ব্যবহারের উদ্দেশ্যে জমি দখল আদেশের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে মোট ১ হাজার ৭৫৬ ডুনাম। তবে সামরিক আদেশের বাইরেও যে প্রতিনিয়ত অনেক জমিই দখল হচ্ছে তা এখন ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।