বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ কোন বিষয়ে বেশি সময় ব্যয় বা স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করি? কিছু অভিজ্ঞতা বলে কারও নিন্দা বা সমালোচনায় আমরা যতটা উৎসাহ অনুভব করি, সেই তুলনায় কারও প্রশংসা করতে, কৃপণতার শেষ সীমায় পৌঁছে যাই। সমালোচনায় ‘কুলা’ বা ‘চালনির’ ছিদ্র গুনতে ভালো লাগে। চারপাশে নিন্দুক বা সমালোচকদের সংখ্যা কেবল বাড়ছে। ব্যক্তিগত বা সামাজিক জীবনের বাইরে রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পদক্ষেপে অধিকাংশ সময় একে অন্যের ‘তীব্র’ সমালোচনায় ব্যস্ত থাকি। কিন্তু কতবার ভাবি, দায়িত্বপূর্ণ চেয়ারে বসলে কারও সমালোচনা করা সহজ। কিন্তু দায়িত্ব পালনের জায়গা তত সহজ না। অবশ্য ব্যতিক্রম আছে। সকালে উঠে খবরের কাগজ পড়লে, রেডিও শুনলে বা টেলিভিশন দেখলে প্রথম যে জিনিসটা কান সতর্ক করে কোনো কিছুর সমালোচনা, নিন্দা বা তীব্র নেতিবাচক কুতর্ক। কেউ সেটা মুখ, দেহভঙ্গি বা প্রগাঢ় নীরবতা অবলম্বন করে কাউকে উপেক্ষা করে। নাগরিকরা সম্মানিত হন এবং পরিচিতি পান, অনেক সময় রাষ্ট্রের রাজনীতির পক্ষ-বিপক্ষে তাদের ভূমিকা নিয়ে। একজন ভালো মানুষ সবার ভালো চান, কিন্তু একজন নাগরিক যদি সে রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত হন বেশি, তাহলে অধিকাংশ সময় তিনি সেই রাজনীতির দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, তার বিপরীত মানুষকে নেতিবাচক হিসেবে দেখেন। এ জন্য ‘মতান্তরে’ আমাদের ‘মনান্তর’ হয়। বিশেষ করে ওই মানুষটা যদি তার কোনো কাজের সমালোচনা করেন বা তার দলের সমালোচনা করেন, তখন ভালো মানুষ নিমিষে খারাপ হয়ে যান তার কাছে।
সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে আমরা অধিকাংশ সময় তাড়িত হই, বস্তুগত চাওয়া-পাওয়ার মধ্য দিয়ে। আমাদের মধ্যে গভীর প্রজ্ঞা, লেখাপড়া, ত্যাগ, ধৈর্য ও বিনয়বোধের ক্রিয়া কমে আসে। অধিকাংশ সময় আমরা বিষয়গুলোকে মনে করি এসব উদাসীন ভাব দার্শনিক চিন্তা! এই চিন্তার কার্যকারিতা বাস্তবে তেমন নেই। ব্যাপারটা কি ঠিক? বর্তমান সমাজ প্রচ- নেগেটিভ চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। নিজেকে ছাড়া অন্য সব, বাঁকা চোখে দেখি আমরা। সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব যত কমে আসবে, ততই এ রকম বিভিন্ন ধরনের সংকট বাড়তেই থাকবে। এ বিষয়টার প্রভাব কেবল যে আমাদের সমাজ ও রাজনীতিতেই পড়ছে তা নয় সাংস্কৃতিক চর্চা এবং তার অনুভূতির মধ্যেও এর নেতিবাচকতা ক্রমান্বয়ে সংক্রমিত হচ্ছে। বিষয়টা ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা, আনুগত্য ও ভালোবাসায়ও বিষ ঢালছে। এর পেছনে হয়তো ‘ডিপস্টেট’র ভূমিকাও আছে। সেই ভূমিকার উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষকে সত্য, ন্যায়পরায়ণতা, ধৈর্য, বিনয়, একতা ও প্রজ্ঞা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। এটা যে সবসময় বাইরে থেকে হয়, তা না। সমাজের ভেতর থেকে কোনো বিশেষ শ্রেণির স্বার্থেও হয়। এই প্রক্রিয়া এবং সেই প্রক্রিয়া পরিচালনার হাত দীর্ঘ ও লম্বা। এ ব্যাপারে দেশীয় শ্রেণি শক্তি, মূলত নিকট ও দূরের কোনো পরদেশী দ্বারা প্রভাবিত, উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত হন। এটা বুঝতে হলে, মহলের ন্যারেটিভদের শ্রেণি অবস্থান এবং তাদের রাজনৈতিক চর্চার অতীত ও বর্তমানকে জানা দরকার।
সমাজ ও ব্যক্তিকে অগ্রসর হতে হয় জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে। আবেগ বা জেদের ওপরে নয়। অধিকাংশ সময় আমরা চলি জেদের ওপরে ভরসা করে। অথবা কোনো ধরনের অজ্ঞানতাকে জ্ঞান বলে ধারণ করে। যেমন বিজ্ঞানের গাণিতিক ভাষা আমরা সহজে বুঝতে পারি না। তাই অনেক সময়, এর মূল কথাগুলো দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে, অনেকের কাছে বিজ্ঞান দুর্বোধ্য হয়ে যায়। বিজ্ঞান মানে আবেগে নয়, চিন্তার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া। পৃথিবীতে প্রায় ৮০০ কোটি মানুষের মধ্যে, কতজন কোয়ান্টাম বলবিদ্যা, কোষীয় জীববিজ্ঞান বা ম্যাক্রো অর্থনীতি বুঝি? কিন্তু তা সত্ত্বেও বিজ্ঞানের প্রতি সাধারণ মানুষের যে অগাধ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস, তার প্রধান কারণ বিজ্ঞান আমাদের দিয়েছে অবিশ্বাস্য ক্ষমতা, নতুন সম্ভাবনার সন্ধান। একটা দেশের প্রেসিডেন্ট বা সামরিক কর্মকর্তা হয়তো নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞান সম্পর্কে জানেন না, কিন্তু নিউক্লিয়ার বোমার আগ্রাসী ভূমিকা কত ভয়ংকর হতে পারে সে সম্পর্কে তিনি যথেষ্ট ধারণা রাখেন। কথাটা বলার কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে আমরা বিভিন্ন বিষয়ে অনেক জনের যেসব আগ্রাসী সমালোচনা দেখি নানান বিষয়ে; সেটা কতটা ভয়ংকর হতে পারে, আমরা জানি। কিন্তু এর বিজ্ঞান সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান কম। এখানে কেবল আবেগটুকু কাজ করে বেশি, চিন্তা কাজ করে কম। এই কারণেও আমরা কথায় কথায়, পায়ে পায়ে শুধু সমালোচনায় ভয়ানক আনন্দ পাই এবং উৎসাহী হই। অথচ কারও প্রশংসায় নয়। অনেক সময় নিজের পাণ্ডিত্য দেখাতে গিয়েও, অনেক কিছুর সমালোচনা করি। সাধারণত সমালোচকদের একটা সাধারণ চরিত্র এই তারা যেকোনো কিছুর সমালোচনায় সবসময় এক পায়ে অগ্রসর হয়ে থাকেন যতটা তারা কোনো প্রশংসায় উৎসাহ বোধ করেন না। বেশ কিছু বুদ্ধিজীবীর মধ্যে এমন প্রবণতা প্রবল। তারা সব বিষয়ে কথা বলতে বা লিখতে গেলে, তার ভেতর প্রথমে একটা বাঁকা কিছু আবিষ্কার করেন। প্রয়োজন থাক বা না থাক। তারা মনে করেন, সমালোচনাটাই মূল আলোচনা। তারা অন্যকে যতটা শেখাতে চান, নিজেরা অন্যের থেকে কিছু শিখতে চান না। এ ব্যাপারে তাদের মধ্যে একটা নাক উঁচু ভাব আছে। কিন্তু বিনয় নেই। সমাজ ও রাষ্ট্র সামনে আরও বদলাবে। সেই বদলানোর পথযাত্রায় আমাদের কুসমালোচনা এবং অর্থহীন আলোচনা থেকে দূরে থাকা দরকার। বিষয়টা সমাজ ও রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে। আগামীতে রাষ্ট্রের কোনো নাগরিকের রাজনৈতিক ভিন্নমত বা সমালোচনাকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজ থেকে একটু দূরে রাখা দরকার। বিশেষ করে, যারা সরকারের রাজনৈতিক আদর্শবিরোধী ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক, কবি, শিল্পী এদের কারোর সঙ্গে রাষ্ট্রের বিরোধিতা হলে অথবা তাদের কিছু পছন্দ না হলে, একমাত্র রাজনৈতিক কারণে তাদের বন্দি করা, জেলহাজতে পাঠানো, রিমান্ডে নিয়ে যাওয়া। আবার তাদের কাউকে নিজ দলে টেনে আনার জন্য মুক্ত করে আনা। কিন্তু এর বিকল্প কী হতে পারে? বিষয়টি রাষ্ট্রের গুণিজনদের একটু ভেবে দেখা দরকার কীভাবে নেতিবাচক সমালোচনার যৌক্তিক উত্তর দেওয়া যায়। ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় এখানে সততা, ত্যাগ, ধৈর্যের কোনো বিকল্প নেই।
সরকারের প্রেস উইং, প্রতি মাস বা সপ্তাহে একবার সরকারের বিভিন্ন কাজের ব্যাপারে বিভিন্ন সমালোচকদের ডেকে, সরাসরি নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন। পাশাপাশি সমালোচনার ব্যাখ্যা চাওয়া যেতে পারে। এই প্রক্রিয়া সততার সঙ্গে চালানো গেলে মনে হয়, সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে নেতিবাচক সমালোচনা কিছুটা হলেও কমে আসবে। এক কথায় সবার দায়িত্ববান ও সতর্ক থাকার সংস্কৃতি চালু হোক। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সার্বভৌম শক্তি ও একতার ব্যাপারে যারা বিভ্রান্ত ছড়াবেন, সুষ্ঠু আইনানুযায়ী তাদের বিচার হওয়া জরুরি। যেকোনো ধর্মের ব্যাপারে, কারও কোনো গবেষণা ও প্রমাণ ছাড়া, মনগড়া মন্তব্য ও তাকে অবজ্ঞা করা বন্ধ করা দরকার। এটা জাতীয় ঐক্য এবং শৃঙ্খলার সরাসরি বিরোধিতা করে। এ ধরনের ব্যক্তিস্বাধীনতা মূলত উশৃঙ্খলতা। এখানে মুক্ত মন বা চিন্তার স্বাধীনতার মূল্য, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। স্বাধীনতাকে আমরা লাইসেন্স দিতে পারি না, তথাকথিত অবাধ মুক্ত কোনো ব্যক্তি অধিকারের নামে। এতে সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা বিঘিœত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। বিশাল জ্ঞানের জগতে, প্রতিদিন আমরা কিছু না কিছু শিখি। এই শেখা শুরুর কোনো শেষ নেই। শিখে ফেলেছি, অতএব বলে ফেলি। বলার আগে ভাবা উচিত, কতটা শিখলাম এবং কোথা থেকে শিখলাম। কার কাছ থেকে কী শিখলাম, কেন শিখলাম। আসলেও কি কিছু শিখেছি? এই চিন্তা তখনই মাথায় কাজ করতে পারে, যখন আমাদের মধ্যে অবজ্ঞা নয়, বিনয় বেশি কাজ করবে। বিনয় কোনো দুর্বলতা নয়। বরং বিনয় মানে নিজের অজ্ঞানতা মনে রেখে অন্যের জ্ঞানকে শ্রদ্ধা করা। ভাবতে হবে আমি ভুল হতেও পারি। তার অর্থ এই না, অন্য কেউ নির্ভুল হবেন না। অধিকাংশ সময় কোনো কিছুর নিন্দা করার ব্যাপারে যে যুক্তির সাহায্য আমরা গ্রহণ করি, তার একটা সহায়ক বিষয়ের নাম- ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ। এখান থেকে আমরা ধরে নিই, কোনো কিছুকে বিনা প্রতিবাদে মানা ঠিক না। তাতে আমাদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকে হয়তো অবজ্ঞা করা হয়। আবার অনেক গুণিজন মনে করেন, ব্যক্তি সম্পর্কিত চরম কর্তৃত্ববাদী তত্ত্বের প্রতিক্রিয়ার রূপ ধরে রাষ্ট্রচিন্তা ও রাষ্ট্রতত্ত্বে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের আবির্ভাব হয়। এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের থিওরি বা তত্ত্ব ঊনবিংশ শতাব্দীর সামাজিক এবং রাজনৈতিক চিন্তা ও তত্ত্বের জগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অষ্টাদশ শতকের শেষ পর্বে তৎকালীন সরকারি তথা রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে এক বিপ্রতীপ প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এই মতবাদ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিল। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী অনেক তাত্ত্বিক রাষ্ট্রের কর্মপরিধিকে সর্বাধিক মাত্রায় সঙ্কুচিত করে কেবল ব্যক্তির জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা রক্ষা, অভ্যন্তরীণ শান্তি ও শৃঙ্খলা সুরক্ষিত রাখা, বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিহত করা প্রভৃতি বিভিন্ন প্রকারের দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান। অনেকে মনে করেন রাষ্ট্র হবে প্রধানত এক পুলিশি রাষ্ট্র। তারা এও মনে করেন, রাষ্ট্রের ক্ষমতা এবং কর্মক্ষেত্রের বিস্তৃতি ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। সর্বাধিক ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ন্যূনতম রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের মূল প্রতিপাদ্য। এই কারণেও আধুনিক সময় আমরা আনুগত্যের চেয়ে বিদ্রোহ, আলোচনার চেয়ে সমালোচনা। প্রশংসার চেয়ে বেশি নিন্দা ও অপপ্রচারকে বাড়তে দিচ্ছি। তাই এখন প্রতিদিন সকাল থেকে রাত অবধি চারদিকে নানা সমালোচনা, নানা নিন্দা, নানা ভেংচি কাটা। অবজ্ঞা দেখেও প্রতিবাদ করতে ইচ্ছা করলেও প্রশংসা করি এই বলে যে, কোনো ব্যক্তি তার ব্যক্তিস্বাধীনতার চূড়ান্ত অধিকার ভোগ করে। যদি সে মনে করে, তিনিই শুধু সঠিক পথে আছেন। যে ব্যক্তি নিজেকে পরিবর্তন করতে পারবেন না, সৃষ্টিকর্তা বা প্রকৃতিও হয়তো তাকে সাহায্য করেন না। আর পরিবর্তনের ব্যাপারটা যত নীরবে হবে, ততই সেটি আত্মজিজ্ঞাসা চর্চায় প্রশংসা পাবে।
লেখকঃ রাজনীতি ও সমাজ বিশ্লেষক
mahmud315@yehoo.com