দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দায় কার?

বছর দুয়েক আগের কথা। ঈদের ছুটি শেষে ট্রেনে বাসায় ফিরেছিলাম। পা রাখতেই এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলাম। টিকিটে নির্দিষ্ট আসন থাকা সত্ত্বেও, যাত্রীর ভিড়ে কামরার ভেতরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। তাই দরজার কাছে অনিশ্চিত ভরসায় দাঁড়িয়েছিলাম। যাত্রীর ভিড়ের মধ্যেই বয়স্ক এক মহিলা ও তার ছেলে ট্রেনে উঠলেন। ভিড় ঠেলে মহিলাটি ট্রেনের ভেতরে প্রবেশ করতে পারলেও, ছেলেটি ট্রেনের দরজায় আটকে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ট্রেন চলতে শুরু করল। দরজার সামনে আমার দাঁড়ানোর অবস্থান নড়বড়ে থাকা সত্ত্বেও, ছেলেটির হাত টেনে ধরেছিলাম যাতে সে ছিটকে না যায়। সেদিন মনে হয়েছিল, ট্রেনটি যদি অল্প সময় স্টেশনে থামত, তাহলে ঝুঁকি কিছুটা হলেও কমত। এ ধরনের ঘটনা কাঠামোগত দুর্বলতাকে নির্দেশ করে, যা ধারাবাহিকভাবে দুর্ঘটনা ঝুঁকির প্রবণতা বাড়ায়। বাসে বা ট্রেনে উঠার সময় যাত্রীর পা পিছলে পড়ে যাওয়ার ঘটনা কেবল একটি মুহূর্তের ভুল নয় বরং এর পেছনে রয়েছে বাসের ডিজাইন, চালকের আচরণ, স্ট্যান্ড ব্যবস্থাপনা  এবং যাত্রীর আচরণ এই চারটি স্তরের সমন্বিত ব্যর্থতা। একইভাবে ফেরিতে গাড়ি উঠানোর সময়, যানবাহন কীভাবে এবং কত দূরত্ব বজায় রাখা হবে সেই পরিকল্পনার অভাব, অনেক সময় ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে। এটি আরও  বেশি হয়, যখন গাড়ির স্টিয়ারিং থাকে অদক্ষ চালকের হাতে। ফলে গাড়ি দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়। সম্প্রতি রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে বাস পড়ে অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। রেলিংবিহীন অরক্ষিত পন্টুন, ঢালু ও খানাখন্দে ভরা সংযোগ সড়ক, ফেরিতে আগে উঠতে যানবাহনগুলোর প্রতিযোগিতা এবং অব্যবস্থাপনার কারণে ফেরিঘাট যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। ঈদের বন্ধে সড়ক, রেল ও নৌপথে ৩৭৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। নিহত হয়েছেন ৩৯৪ জন। আর আহত হয়েছেন ১ হাজার ২৮৮ জন। এর মধ্যে শুধু সড়কেই ৩৪৬টি দুর্ঘটনায় ৩৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৪৩ শতাংশ জাতীয় মহাসড়ক, ৩০ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ২২ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়েছে।

ঈদের সময়ে পরিবহন চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। এতে বিদ্যমান অবকাঠামো সেই চাপ সামলাতে পারে না। ফলে দুর্ঘটনা বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে উৎসব-পরবর্তী ৭২ ঘণ্টায় সড়ক দুর্ঘটনার হার স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পায়। ওই সময় যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও, সড়কের সক্ষমতা অপরিবর্তিত থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ পরিস্থিতি আরও জটিল। কারণ এখানে মিক্সড ট্রাফিক সিস্টেম বিদ্যমান অর্থাৎ একই সড়কে বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, রিকশা ও পথচারী একসঙ্গে চলাচল করে যা সংঘর্ষের সম্ভাবনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া ঈদের সময় চালকরা দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ি চালানোর জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায় না। ফলে তাদের মনোযোগ বিচ্যুত হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৭ ঘণ্টা জেগে থাকার পর একজন মানুষের প্রতিক্রিয়া ক্ষমতা এমন পর্যায়ে নেমে আসে, যা ০.০৫ শতাংশ রক্তে অ্যালকোহল থাকার সমতুল্য। ফলে ক্লান্তি এক ধরনের ওহারংরনষব রহঃড়ীরপধঃরড়হ হিসেবে কাজ করে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে পুলিশের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। যা মোট দুর্ঘটনার ৪২ শতাংশ। পুলিশ সদর দপ্তরের ‘রিসার্চ, প্ল্যানিং অ্যান্ড ইনোভেশন’ বিভাগ ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চ্যালেঞ্জ ও কৌশল নিয়ে গবেষণা করেছিল। এই গবেষণায় যুক্ত ছিল ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ’। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ঈদের সময় সড়কে গাড়ির বাড়তি চাপ থাকে, এতে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়। অনেক ফেরিঘাটে ডিজিটাল কিউ বা সময়ভিত্তিক প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের অভাব রয়েছে। ফলে চালকরা আগে উঠার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমে ‘গেম থিওরিটিক’ পরিস্থিতি তৈরি করে। যেখানে প্রত্যেকে মনে করে, নিয়ম না মানলে সে লাভবান হবে। কিন্তু সবাই একই কাজ করলে সামগ্রিকভাবে ক্ষতি হয়। ফলে ব্যক্তিগত লাভের চেষ্টা সমষ্টিগত ক্ষতির দিকে নিয়ে যায়। সেক্ষেত্রে রোড সেফটি অডিট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই প্রক্রিয়ায় সড়কের প্রতিটি অংশ, মোড়, ব্রিজ, বাসস্টপ, ক্রসিং বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করে সংশোধন করা হয়। ডেটা-ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনেক ছোট বা মাঝারি দুর্ঘটনা নথিভুক্ত হয় না। ফলে প্রকৃত ঝুঁকির চিত্র পাওয়া যায় না। এর ফলে নীতিনির্ধারণে একটি ডেটা গ্যাপ তৈরি হয়, যা কার্যকর সমাধানে বাধা সৃষ্টি করে। এ ধরনের সমস্যা সমাধানের জন্য সমন্বিত ডেটা সিস্টেম ব্যবহার করা যেতে পারে। যেখানে পুলিশ, হাসপাতাল এবং বীমা সংস্থার তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করা হবে।

গাড়িতে উঠার মুহূর্তে দুর্ঘটনাগুলোকে ‘অ্যান্ট্রি-পয়েন্ট রিস্ক’ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। বাসস্টপে বাসের দরজা ও প্ল্যাটফর্ম একই উচ্চতায় রাখলে, ওঠানামার সময় পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে যাবে। যদিও আমাদের দেশে এ ধরনের নকশাগত সমাধানের অভাব রয়েছে। চলাচল নিশ্চিত করতে,  ‘ডোর কন্ট্রোল সিস্টেম’ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।  যেখানে বাস বা ট্রেন সম্পূর্ণ থামার আগে, দরজা খোলা যাবে না। ফেরিঘাটে ডিজিটাল কিউ ও লোড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু এবং ঈদের সময় বিশেষ ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ একটি কার্যকর কাঠামো প্রদান করে। যেখানে চারটি মূল উপাদান সেফ রোড, সেফ ভেহিকল, সেফ স্পিড এবং সেফ ইউজার একত্রে বিবেচনা করা হয়। এই পদ্ধতিতে যেকোনো একটি ব্যর্থ হলেও,  অন্যগুলো তা সামলে নিতে পারবে।  সে জন্য ‘ভিশন জিরো’ নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে। সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থা এমনভাবে নকশা করতে হবে, যাতে মানবিক ত্রুটি থাকলেও তা প্রাণঘাতী না হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি কেবল প্রযুক্তিগত নয়, বরং নিরাপত্তাকে অর্থনৈতিক গতি বা পরিবহন দক্ষতার চেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এর ফলে নিশ্চিতভাবেই দুর্ঘটনা কমে আসবে। এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট

anjan999roy@gmail.com