এআই কি যানজট কমাতে পারবে 

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৮:১১ এএম

মতিন সাহেবের অফিস সকাল ৯টায়। ৮টা ৪৫-এ তিনি শাহবাগের সিগন্যালে আটকে আছেন। সামনে লাল বাতি, পাশে কয়েকটি মোটরসাইকেল, পেছনে বাসের হর্ন। ঢাকার নিয়ম অনুযায়ী এই পরিস্থিতিতে সাধারণত সবাই একটু একটু করে সামনে এগিয়ে যায়। প্রথমে মোটরসাইকেল, তারপর সিএনজি, তারপর প্রাইভেট কার। শেষ পর্যন্ত দেখা যায় লাল বাতির প্রতি আমাদের সম্মান ঠিকই আছে, শুধু সম্মানটা আমরা একটু সামনে গিয়ে দেখাই। মতিন সাহেব অবাক হয়ে ওপরে তাকালেন। একটি ক্যামেরা। তিনি হয়তো জানেন না, ক্যামেরাটির সঙ্গে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও যুক্ত হয়েছে। তবে এটুকু বুঝলেন, আজ নিয়ম ভাঙলে শুধু ট্রাফিক পুলিশ নয়, আরেকজন দেখছে। সেই ‘আরেক জনের’ সঙ্গে কথা বলে বোঝাপড়া করার সুযোগও খুব বেশি নেই। ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থায় এই দৃশ্য একেবারে কল্পনা নয়। গত মে মাস থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশ পরীক্ষামূলকভাবে এআই নির্ভর ক্যামেরা ব্যবহার করে লাল বাতি অমান্য, ভুল লেনে চলা, উল্টোপথে গাড়ি চালানো এবং অবৈধ পার্কিংয়ের মতো অপরাধ শনাক্ত করছে। প্রথম দশ দিনেই প্রায় এক হাজার মামলা এবং পাঁচ হাজারের মতো ভিডিও রেকর্ড সংগ্রহ করা হয়েছিল। কিছু গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে চালকদের আচরণেও পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৩ আগস্ট শাহবাগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিগরি সহায়তায় পরীক্ষামূলক স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল চালু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। প্রথম পর্যায়ে ২০টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়কে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, পরে আরও ৫০টি মোড়ে সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। 

ঢাকার পুরনো ট্রাফিক ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা হলো, আমরা অনেক সময় বাস্তব পরিস্থিতির চেয়ে অভ্যাসের ওপর বেশি নির্ভর করি। কোনো একটি রাস্তায় গাড়ির দীর্ঘ সারি, অথচ অন্যদিকে রাস্তা প্রায় ফাঁকা। তারপরও সিগন্যাল তার নির্ধারিত সময় মেনে চলছে। এ আই-ভিত্তিক ব্যবস্থায় ক্যামেরা ও সেন্সর থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন দিকে কত গাড়ি, কোথায় সারি দীর্ঘ হচ্ছে, কোন সময়ে কোন রাস্তায় চাপ বাড়ছে, এসব বিবেচনায় সিগন্যালের সময় পরিবর্তন করা সম্ভব। আমাদের ট্রাফিক পুলিশ রোদ, বৃষ্টি, ধুলো আর হর্নের মধ্যে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেন; কম্পিউটারের সে সমস্যা নেই। কিন্তু ‘ঢাকার যানজটের সঙ্গে কয়েক দিন পরিচিত হলেই বোঝা যায়, সমস্যাটি শুধু সিগন্যালের নয়। আমাদের একটি অদ্ভুত স্বভাব আছে, আমরা জটিল সমস্যার জন্য একটি সহজ সমাধান খুব পছন্দ করি। বাস্তবে একটি সিগন্যাল পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান সিগন্যাল হলেও তার সামনে যদি বাস রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলে, ফুটপাতের অর্ধেক দোকানে চলে যায়, রাস্তার এক লেন পার্কিংয়ে বন্ধ থাকে, মোটরসাইকেল সুযোগ পেলেই নতুন একটি কাল্পনিক লেন আবিষ্কার করে এবং মোড়ের মাঝখানে গাড়ি ঢুকে পুরো ইন্টারসেকশন আটকে দেয়, তাহলে এআইও সম্ভবত কিছুক্ষণ হিসাব করে নীরব হয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞরাও তাই সতর্ক করছেন, এআই ক্যামেরার পাশাপাশি গাড়ির নিবন্ধনব্যবস্থা, লেন শৃঙ্খলা, অবৈধ যান নিয়ন্ত্রণ এবং মাঠপর্যায়ে ধারাবাহিক আইন প্রয়োগ না থাকলে প্রযুক্তি একা খুব বেশি দূর যেতে পারবে না।

যানজট তৈরির ছোট ছোট নিয়মভঙ্গগুলো খুব গুরুতর মনে করি না। অনেক ছোট প্রশ্ন এক সঙ্গে মিলে শেষ পর্যন্ত এমন একটি শহর তৈরি করে, যেখানে পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার আগে মানুষ পরিবারের সদস্যদের জানিয়ে বের হয়। এ জায়গাতেই এআইয়ের একটি বড় সম্ভাবনা আছে। প্রযুক্তি শুধু যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ করবে না, ধীরে ধীরে মানুষের আচরণও বদলাতে পারে। কারণ মানুষ আইনকে যতটা ভয় পায়, নিশ্চিত শাস্তিকে সম্ভবত তার চেয়ে একটু বেশি ভয় পায়। এআইকে যদি আমরা শুধু ডিজিটাল ট্রাফিক পুলিশ বানিয়ে রাখি, তাহলে তার সবচেয়ে বড় শক্তিটিই নষ্ট হবে। আসল সম্ভাবনা তথ্যের মধ্যে। কোন মোড়ে দিনের কোন সময়ে যানজট তৈরি হচ্ছে, কোথায় একটি বাসস্টপেজ পুরো প্রবাহ আটকে দিচ্ছে, কোথায় ইউটার্নের কারণে সারি দ্বিগুণ হচ্ছে, কোন এলাকায় পথচারীর চাপ বেশি, কোন রাস্তায় অবৈধ পার্কিং সবচেয়ে বেশি। এসব তথ্য কয়েক মাস সংগ্রহ করলে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থার একটি জীবন্ত মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব। আরেকটি বড় সত্য হচ্ছে, ঢাকার যানজট কমানোর সবচেয়ে কার্যকর প্রযুক্তি সম্ভবত কোনো ক্যামেরা নয়, ভালো গণপরিবহন ব্যবস্থা। চল্লিশজন মানুষ যদি চল্লিশটি গাড়িতে যান, রাস্তায় জায়গা লাগে এক রকম; একই চল্লিশজন একটি ভালো বাসে গেলে হিসাবটি সম্পূর্ণ বদলে যায়। তাই স্মার্ট সিগন্যাল, মেট্রোরেল, উন্নত বাস নেটওয়ার্ক, নিরাপদ ফুটপাত, পরিকল্পিত বাসস্টপেজ এবং ট্রাফিক আইন প্রয়োগকে আলাদা প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো একই ব্যবস্থার অংশ। একটি শহর তখনই স্মার্ট হয়, যখন সেখানে গাড়ি দ্রুত চলে তা নয়; মানুষ কম কষ্টে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। এই ছোট পার্থক্যটি আমাদের নগর পরিকল্পনায় অনেক বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

এআই কি ঢাকার যানজট কমাতে পারবে? পারবে। তবে শর্ত হলো, আমরা যেন তাকে জাদুর প্রদীপ মনে না করি। যানজট বিশেষ করে ঢাকার যানজট শুধু গাড়ির জট নয় এটি পরিকল্পনার জট, ব্যবস্থাপনার জট, অভ্যাসের জট এবং কখনো কখনো আমাদের সম্মিলিত অধৈর্যের জট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই জটের কিছু সুতো চিনিয়ে দিতে পারে। কোন সুতোটি আগে টানতে হবে, আর কোনটি টানলে পুরো গিঁট আরও শক্ত হবে, সেই বুদ্ধিটুকু এখনো আমাদেরই দেখাতে হবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, পুরকৌশল ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত