গণঅভ্যুত্থানের স্বপ্ন ছিল, বৈষম্যহীন সমাজ গড়া। ছাত্র-জনতা, সব রাজনৈতিক দল, হকার-শ্রমিক-দিনমজুর, চাকরিজীবী, পথশিশু সব শ্রেণির মানুষ একত্র হয়েছিল ন্যায়ভিত্তিক সমাজের প্রত্যাশায়। কিন্তু বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন পূর্ণতার ঢের দেরি। ফরাসি বিপ্লব-পরবর্তী সময়ের মতো, এখানেও নেতৃত্বের স্বার্থপরতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সংস্কারকে ব্যাহত করেছে। মিশেল ফুকো যেভাবে ক্ষমতা ও জ্ঞানের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন, তেমনি বাংলাদেশে ক্ষমতাকাঠামো ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক চেতনাকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ফুকোর মতে, ক্ষমতার ‘ডিসিপ্লিনারি মেকানিজম’ অপরিবর্তিত থাকলে, প্রকৃত পরিবর্তন অসম্ভব। সাধারণ মানুষের কাছে সংস্কার বা পরিবর্তনের মানে, জীবনের মানোন্নয়ন। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, কৃষকের ফসলের মূল্য, চাকরির জন্য ঘুষমুক্ত পদ্ধতি, শিক্ষা ও চিকিৎসায় সমতা এ সবই সংস্কারের মাপকাঠি। শ্রমিকের মজুরি বাড়েনি, কৃষক ফসলের ন্যায্য দাম পায়নি, সড়কে মৃত্যুমিছিল থামেনি। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পোশাক বদলে ছিল, কিন্তু তাদের চরিত্র কতটুকু পরিবর্তন হয়েছে? একজন সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, মজুর কিংবা চাকরিজীবীর চাওয়া-পাওয়ার তালিকা কখনোই জটিল বা বিলাসী নয়, বরং তা অত্যন্ত সরল, ন্যায্য এবং মানবিক। তারা চায়, দিনভর পরিশ্রমের বিনিময়ে এমন একটি আয়, যা দিয়ে তারা স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা, ভাইবোনসহ সুখে-শািন্ততে জীবনযাপন করতে পারে। সন্তানরা যেন নিশ্চিন্তে স্কুলে যেতে পারে, ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারে এবং শিক্ষাজীবন শেষে কোনো প্রকার ঘুষ বা অনিয়ম ছাড়া একটি সম্মানজনক চাকরি পেতে পারে। হাসপাতালে গিয়ে যেন উন্নত ও সুলভ চিকিৎসা পাওয়া যায়। কোনো ধরনের অবহেলা বা দুর্নীতির শিকার না হতে হয়। থানা-পুলিশ, আদালতসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জায়গায় যেন, প্রকৃত অর্থে ন্যায় পাওয়া যায়। আইনের চোখে সবাই যেন সমান হয়। কোনো প্রভাব, ক্ষমতা বা অর্থ যেন বিচারকে প্রভাবিত করতে না পারে। এই চাওয়াগুলো মোটেও বড় কিছু নয়, এগুলো একটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার, একটি রাষ্ট্রের ন্যূনতম দায়িত্ব।
২০২৪ সালের নির্বাচন, যার ৬ মাস পার না হতেই দেশ আবারও দেখেছে গণঅভ্যুত্থান। সেই প্রেক্ষাপটে গঠিত হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর আসে নতুন সরকার, প্রধানমন্ত্রী হন তারেক রহমান। উদ্বেগজনক বিষয় হলো- বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের দুর্নীতি ও দুঃশাসনের যে অভিযোগ, তা গণঅভ্যুত্থানের পরেও বন্ধ হয়নি, বরং নানা রূপে তা অব্যাহত ছিল যা পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারের সময়ও কমবেশি রয়েছে। বাংলাদেশ আজ এক গভীর সন্ধিক্ষণে। বারবার প্রতিশ্রুতির পরিবর্তন এবং বিকৃত রূপ সাধারণ মানুষ দেখেছে। রাষ্ট্র ক্রমেই মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে এক অপরিচিত, অচেনা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। যেখানে সাধারণ মানুষের আর্তি পৌঁছায় না, ন্যায্য দাবি প্রতিধ্বনিত হয় না। যখন রাষ্ট্র জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন গণতন্ত্র শুধু কাগজে-কলমে টিকে থাকে। বিচার হয়ে ওঠে বিক্রয়যোগ্য, দুর্নীতি ঢুকে পড়ে রাষ্ট্রের রক্তপ্রবাহে, আর নাগরিকরা ধীরে ধীরে অধিকারহীন প্রজায় রূপান্তরিত হয়। গত ৫৪ বছর ধরে এই চক্রেই ঘুরপাক খেয়েছে আমাদের রাষ্ট্র ও রাজনীতি। কিন্তু দল পরিবর্তিত হয়েছে, ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, অথচ রাষ্ট্রের চরিত্র কতটুকু পরিবর্তন হচ্ছে?
স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্ক এখনো ‘মালিক-প্রজা’র কাঠামোয় আবদ্ধ। জনগণের রাষ্ট্র এখনে প্রতিশ্রুতিতে আটকে আছে। এই বাস্তবতায়, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে তারেক রহমান যে স্বপ্ন ও অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে কেউ বঞ্চিত থাকবে না, কেউ নিপীড়িত হবে না, যেখানে রাষ্ট্র হবে জনগণের এবং জনগণই হবে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক।’ এটাই শেষ কথা। আমরা এমন রাজনীতি চাই যা শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং জনগণের জীবনে গুণগত পরিবর্তন আনে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার অগ্রসর হচ্ছে। এ জন্য ১৮০ দিনের একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকারের দিক থেকে, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা দেশের প্রথম ২৮ দিনের ২৮ পদক্ষেপ প্রকাশ করে একে ‘এক অভূতপূর্ব কর্মযজ্ঞ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নির্বাচনের আগে আলোচিত ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি ১০ মার্চ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ৩৭,৫৬৭ পরিবারকে মাসিক ২,৫০০ টাকা ভাতা দেওয়া হয়েছে। পরে ধাপে ধাপে চার কোটি পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা কৃষিঋণ মওকুফ এবং ২৭,০০০ কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়া হবে। এছাড়াও খাল খনন কর্মসূচিও শুরু হয়েছে। যা অব্যাহত থাকবে। পররাষ্ট্রনীতিতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ শুরু হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তি নতুন সরকার কীভাবে সামাল দেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। প্রায় প্রতিদিন বাস-ট্রাক বা বাস-মিনিবাস অথবা বাস-অটো সংঘর্ষে মৃত্যুর খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরতে থাকে। ঈদের সময়কালে ট্রেন লাইনে উঠে পড়া বাসের মধ্যে থাকা মানুষের মৃত্যু, ফেরিঘাটে বাস ডুবে মানুষের মৃত্যু বা ট্রেনে কাটা পড়ে মানুষের মৃত্যু দেশব্যাপী মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। যা শুনে বা দেখে সবার মন খারাপ হয়ে যায়। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়া আর কিছু করার নেই আমাদের! অথচ রাষ্ট্র আছে, আছে তার সব কাঠামো। তারপরও এই সড়ক দুর্ঘটনা নামক হত্যাযজ্ঞ বন্ধ হচ্ছে না। প্রতিবছর ঈদের সময় দুর্ঘটনার হার বেড়ে যাওয়ার যে প্রবণতা, এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। পবিত্র ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে আগে ও পরের দিনগুলোতে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ২৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে চাঁদাবাজি কোনোভাবে থামছে না, থামানো যাচ্ছে না। চাঁদাবাজি না থামলে সরকারের সব উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক লক্ষ্য ব্যাহত হবে। নির্বাচনের আগে থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগের মুখে থাকা বিএনপি সরকার গঠনের পরেও, একে কতটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে, সেই প্রশ্নও এখন সামনে আসছে। বিরাজমান চাঁদাবাজি সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে সরকারের প্রতি জোরালো ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, দেশে তেলের কোনো ঘাটতি নেই; তবে কিছু অসাধু চক্রের কারণে দুর্নীতি ও কালোবাজারি হচ্ছে। যদি এমন অনিয়ম চলতেই থাকে, তবে তা রোধে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর ভূমিকা কোথায়? রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল অবস্থানে থেকে এসব চক্র ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগই বা কতটা দৃশ্যমান? অন্যদিকে দেশে অসংখ্য বেকার তরুণ, একের পর এক মিল-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, নতুন কর্মসংস্থানের অভাব এসব বাস্তবতা এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এই সংকট নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের জন্য কাজ শুরু করা প্রয়োজন। কর্মসংস্থান না তৈরি করা পর্যন্ত বেকার ভাতা চালু করা জরুরি এবং সময়ের দাবি। দেশের বাস্তবতা আজ আড়াল করার কিছু নেই। অসংখ্য শিক্ষিত তরুণ বেকার, মিল-কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণে কর্মসংস্থানের পথ বন্ধ হয়েছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু অর্থনীতি নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়বে। তাই এখন আর দেরি করার সুযোগ নেই। জরুরি ভিত্তিতে একটি সুসংগঠিত, বাস্তবসম্মত এবং সময়োপযোগী কর্মসংস্থান পরিকল্পনা গ্রহণ ও কার্যকর বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। শিল্প পুনরুজ্জীবন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ এবং নতুন খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ সবকিছুকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষিত বেকার তরুণদের জন্য বেকার ভাতা চালু করা এখন সময়ের দাবি। এই ভাতা তরুণদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তা দেবে, তাদের আত্মমর্যাদার সহায়ক হবে এবং চাকরি খোঁজার সময়টুকুতে একটি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। পাশাপাশি, এই কর্মসূচি দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা হলে তা আরও কার্যকর হবে।
‘আজকের বাংলাদেশে মানুষ আগের চেয়ে অনেক সচেতন। তারা চোখে দেখে, কানে শোনে, আর হৃদয়ে বিচার করে। তারা বিএনপির ওপর আস্থা রাখতে চাচ্ছে। এটি একটি বড় অর্জন, আবার একই সঙ্গে বড় চ্যালেঞ্জ। এই আস্থা যদি কারও ভুল, দলীয় কোন্দল, মারামারি, খুন-খারাপি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সীমাহীন স্বার্থপরতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেই ব্যক্তিকে দলে রাখবেন না’ বলে নির্বাচনের আগে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিএনপির নেতৃত্বকে আদর্শ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে যুক্ত করতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। শুধু দায়িত্ব নিয়ে কথা বলেননি, বরং ভুলের শুদ্ধি এবং নেতাদের ব্যক্তিগত চরিত্রকে দল ও জনগণের স্বার্থের ওপরে রাখার বার্তা দিয়ে যাচ্ছেন। এক্ষেত্রে তিনি কতটা সফল হবেন, তা নির্ভর করবে তার দল ও তার পাশে থাকা আমলাতন্ত্রের ওপর।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক
sk.rafiq1982@gmail.com