এক মাসের বেশি সময় ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি প্রতিনিয়তই পাল্টাচ্ছে। পাল্টাপাল্টি হামলা ও হুমকির মাধ্যমে উত্তেজনা জিইয়ে রাখছে যুদ্ধরত সব পক্ষই। এ যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি ঝুঁকিতে পড়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর লাখ লাখ অভিবাসী শ্রমিকের ভাগ্য। পশ্চিম এশিয়ার চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতায় চরম নিরাপত্তা ও জীবিকা সংকটে পড়েছেন উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোর অভিবাসী শ্রমিকরা। গতকাল বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ আশঙ্কার কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি বলছে, চলমান এই সংঘাত উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে বিদ্যমান শ্রম সুরক্ষা আইনের দুর্বলতা এবং বিতর্কিত ‘কাফালা’ (স্পন্সরশিপ) ব্যবস্থার নেতিবাচক দিকগুলো আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। সেই সঙ্গে শ্রমিকদের শারীরিক নিরাপত্তা ও আয়ের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে নতুন হুমকি তৈরি করেছে।
এইচআরডব্লিউর মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাবিষয়ক উপ-পরিচালক মাইকেল পেজ বলেন, হাজার হাজার মাইল দূরে কাজ করতে আসা অভিবাসীরা এখন নিজেদের নিরাপত্তা ও চাকরি নিয়ে শঙ্কিত। এই সংকট তাদের শ্রম অধিকারের অভাবগুলোকে প্রকট করে তুলেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সরকারি সূত্রের বরাতে সংস্থাটি জানিয়েছে, গত ২৫ মার্চ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের জেরে বেশ কয়েকজন অভিবাসী শ্রমিক হতাহত হয়েছেন। নিহতদের তালিকায় পাকিস্তান ও নেপালের নাগরিকের পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকও রয়েছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য বাধ্যতামূলক জীবন বিমা চালুর দাবি জানিয়ে আসছে, যাতে মৃত্যুর পর তাদের পরিবার পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পায়।
চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জরুরি সেবা যেমন হাসপাতাল, পরিবহন ও ডেলিভারি খাতে কর্মরত শ্রমিকরা চরম আতঙ্কের মধ্যে কাজ করছেন। কাতারের এক হাসপাতাল কর্মী বলেন আমি হাসপাতালে কাজ করি, তাই কাজ বন্ধ করার উপায় নেই। দিন হোক বা রাত, প্রায়ই বিস্ফোরণের শব্দে বুক কেঁপে ওঠে। এক ডেলিভারি কর্মী আক্ষেপ করে বলেন, পরের মিসাইলটি কোথায় পড়বে তা জানি না, কিন্তু পেটের তাগিদে রাস্তায় থাকতেই হয়। যদিও অনেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখছেন, তবুও বেশিরভাগ শ্রমিকের মধ্যে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান হারানো নিয়ে উদ্বেগ কাজ করছে। এইচআরডব্লিউ জানায়, সংঘাতের প্রভাবে কমিশন ভিত্তিক কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের আয় নাটকীয়ভাবে কমেছে। কুয়েতে কর্মরত এক ট্যাক্সি চালক জানান, তার আয় এখন অর্ধেকে নেমেছে। এ ছাড়া আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের শ্রমিকদের খাদ্য খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। হোটেল বা হসপিটালিটি সেক্টরে অনেকের কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে বা বেতনহীন ছুটিতে পাঠানো হচ্ছে অথবা ছাঁটাই করা হচ্ছে।
আরব আমিরাতের এক শেফ জানান, তার কর্মস্থলে কর্মী সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। অনেককে দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। আবার টিকিটের চড়া দাম শ্রমিকদের ওপরই চাপিয়ে দিচ্ছেন নিয়োগকর্তারা।
যারা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বিদেশে গেছেন, তাদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। নথিপত্রহীন বা ‘ফ্রি’ ভিসায় থাকা শ্রমিকরা কোনো কাজ না পেয়ে দেশে ফেরার আকুতি জানাচ্ছেন। বাহরাইনে থাকা অভিবাসী জানান, টিকে থাকার জন্য এখন উল্টো তাকে দেশ থেকে টাকা আনতে হচ্ছে।
কুয়েতে থাকা এক শ্রমিক জানান, তার আয় কমলেও প্রতি মাসে স্পন্সরকে (কফিল) নির্দিষ্ট ফি দিতেই হচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ। এর মধ্যে রয়েছে শ্রমিকদের আয়ের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত ও জীবনযাত্রার ন্যূনতম মজুরি প্রদান করা। শ্রমিকদের ওপর কোনো আর্থিক বোঝা না চাপিয়ে নিয়োগ চুক্তি মেনে চলা। যারা ফিরে যেতে চান, তাদের বিমান টিকিটের খরচ নিশ্চিত করা। শ্রমিকদের নিজ ভাষায় জরুরি নিরাপত্তা নির্দেশিকা প্রচার করা। মাইকেল পেজ বলেন বিদেশে যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জরুরি সেবা দিচ্ছেন, তাদের সুরক্ষায় সরকার ও নিয়োগকর্তাদের এখনই এগিয়ে আসতে হবে। এইচআরডব্লিউ জানায়, তারা জিসিসি দেশগুলোর সরকারের কাছে এ বিষয়ে চিঠি দিলেও এখনো কোনো কার্যকর সদুত্তর পায়নি।