অসংকুলান

এই শহরে মানুষ মারা গেলে কবর দেওয়া হয় না। গত কয়েক বছর ধরে চলছে এই অবস্থা। কারণ এখানে শব মাটিতে দিলে মাটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। কয়েক বছর আগে শুরু হয়েছিল ব্যাপারটা। কবর দিলে মাটির গায়ে ফোস্কা উঠত, বৃক্ষ, শস্যের, শেকড় কালো হয়ে যেত। আর রাত গভীর হলে মাটির শ্বাসকষ্ট শোনা যেত, কম্পন হতো, যেন একটা প্রলয় ঘটবে। মাটি যেন অভিমান করেছে, মাটি যেন ক্রুদ্ধ হয়েছে। বলছে, তোমরা তো আমায় ছেড়েছ বহু আগেই। আমার বুক চিরে বাড়ি বানিয়েছ, শপিং মল তুলেছ, রাস্তায় পিচ ঢেলে আমার দম বন্ধ করেছ, এখন আবার আমায় চাইছ, শেষ আশ্রয়ের জন্য?

কবর দিলেই এরকম অহরহ ঘটতে থাকে। দুঃখের ভার শোকের ভয়াবহতা কবর যেন আর নিতে চায় না।

মানুষের মধ্যে অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ‘মাটি আর কবর নিতে পারছে না, শব নিতে পারছে না, মাটির কষ্ট হয়, রেগে যায়’। সিদ্ধান্ত হয়, মৃতদেহ আর মাটির নিচে রাখা হবে না। তাই এ শহরে কোথাও কোনো কবর নেই, কবরস্থান নেই। মাটির বুকের সেই শীতল, চিরস্থায়ী, নীরব আশ্রয় আর নেই। কবরের জায়গা নেই, কবর দেবার উপায়ও নেই।

এই শহরে মৃত্যু মানে নিঃশব্দে মৃতদেহ সরিয়ে ফেলা। শরীরগুলোকে ধুয়ে, শুকিয়ে, রাখা হয় দীর্ঘ সময়। এরপর বাতাসের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কেউ জানে না ঠিক কোথায় তারা যায়। শুধু জানা যায়, তারা আর কখনো ফেরে না। ফেরে না কারোর উষ্ণতা, কারোংর নামের উচ্চারণ কিংবা শেষ বাণী।

শহরের আকাশ তাই ভারী। সবসময় আকাশে এমন এক চাপা ভাব থাকে, যেন সবাই কিছু গোপন করে রেখেছে। মেঘ জমলে বৃষ্টি হয় না, বয় ছাইয়ের মতো নীরব ঝরনা। প্রাচীন মানুষ যারা আছেন তারা বলেন, এগুলো পুরনো দেহের স্মৃতি যাদের কোথাও ঠাঁই হয়নি।

কেউ মারা গেলে আর কান্নার শব্দ শোনা যায় না। হাসপাতালের মৃদু নীল আলোয় যন্ত্রের বিপবিপে একটা জীবন নিভে যায়। তারপর কাগজের সই সাবুদ, সনদ, আর দেহ হস্তান্তর। ঘরে এনে শোয়ানো হয় ঘরের সবচেয়ে শান্ত কোনায়। যেখানে এক সময় জানালা ছিল, এখন কেবল বাতাস ঢোকার অভ্যাস।

এখানে শোক পালিত হয় না, অপ্রয়োজনীয় মনে করা হয়। সময়ের অভাব, মনের অভাব। মৃতেরা ধীরে ধীরে প্রকৃতির অংশ হয়ে যায়। চেয়ারের হাতলে, রান্নাঘরের দেয়ালে, নিঃশব্দ বিকেলে, দোকানের ঝাঁপে, ফোনের মিসড কলে তারা মিশে থাকে। তাদের চুপচাপ উপস্থিতি নিয়ে। ঘরে ঘরে আয়না ঢেকে রাখা হয়। কারণ কেউ মারা গেলে আয়নায় নাকি তার ছাপ রেখে যায়। একটা অসম্পূর্ণ প্রতিফলন, চোখের জায়গায় ফাঁকা গর্ত। আবছায়া দেখা যায় কি দেখা যায় না। ভীতিকর। তা দেখে মানুষ ভাবে মৃত্যু আসলে শেষ কথা নয়।

শহরের প্রান্তে যে পুরনো কবরস্থান ছিল, সেখানে এখন আলো ঝলমলে টাওয়ার দাঁড়িয়ে। কবরের জায়গায় কাচের দেয়াল, স্বচ্ছ লিফট আর বিজ্ঞাপণের বিশাল রঙিন বিলবোর্ড। কেউ আর মাটির গন্ধ শোঁকে না, সবাই কেবল কৃত্রিম সুগন্ধি বাতাসে বাঁচতে চায়।

কবর তো আদতে স্মৃতিই। স্মৃতি রাখার জায়গা কই! রাখার জায়গা নাই, সময় নাই, ইচ্ছেও নাই। সব ফসলের মাঠ, কলকারখানা, ইটভাটা, পশুর খামার, মৎস্য খামার, বিনোদন কেন্দ্র, গেস্টহাউজ, মিউজিয়াম বা আবাসস্থল। মিউজিয়ামের জায়গা আছে, কবরের জায়গা কই! তাই কোনো কবর নাই। কবর নাই বলে কোনো শোকচিহ্নও নেই। শোক এখানে জমা হয় না, বাতাসে ভাসে। সাথে শোকের এক ধরনের গন্ধ ভাসে যা পচা নয় বরং ভুলে যাওয়ার গন্ধ, মুছে ফেলার গন্ধ, বেঁচে থাকার গন্ধ, বাস্তবতার গন্ধ।

প্রাচীন মানুষ কিংবা এলাকার গোত্রপ্রধানরা চিন্তাভাবনা করে বলেন, ‘মৃত মানুষেরা যদি ফিরে আসে তারা কোনো চিৎকার করবে না। তারা আবার টিকিট হাতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকবে। চালক তাকিয়ে থাকলেও প্রশ্ন করার সাহস পাবে না। কারণ প্রশ্ন করলেই এই শহর ভেঙে পড়তে পারে। ফিরে আসা মানুষগুলো কারো দরজায় কড়া নাড়বে না। তারা জানে এ শহরে দরজা মানে আর আশ্রয় নয়। তাই তারা হয়তো দাঁড়িয়ে থাকবে সেই জানালার নিচে যেখানে শেষ সময় শুয়ে ছিল। অথবা কেউ অপেক্ষা করত তার জন্য’।

তারা আরও বলে, ‘ফিরে আসা মানুষদের চোখে থাকবে না অভিমান, থাকবে না অভিযোগ। তাদের চোখে থাকবে এক ধরনের চকচকে স্বচ্ছতা যেন তারা জেনে গেছে কে কে বেঁচে থেকেও অনেক আগেই মরে গেছে। সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য আয়নার সামনে দাঁড়ালে জীবিতরা দেখবে নিজেদের মুখের ভেতর অন্য কারুর মুখের ছায়া’।

জীবিতরা এসব কথা শুনতে চায় না। তারা ভয় পায়, কবর না থাকলেও সকলেই তো কোনো না কোনোভাবে এখানেই বাস করছে। রাতের আলো ঝলমলে শহরে যে কোনো দিন তাদের ঘোষণা ভেসে বেড়াবে, ‘এবার বেঁচে থাকার জবাব দিতে হবে’।

শোনা যাবে, মাটির নিচ থেকে নয়, ওপর থেকে হাঁটার শব্দ। ছাদের ওপর, বৈদ্যুতিক তারে, বাতাসের গায়ে, যেন যাদের নাম মুছে গেছে তারা জায়গা খুঁজে বেড়াচ্ছে দাঁড়ানোর জন্য।

এ শহরে কেউ আর তাই মরতে চায় না, কেবল বাঁচার লড়াই লড়ে। মরলে কবর নাই, শান্তি নাই, ঘুম নাই। আছে কেবল অনিঃশেষ ঝুলে থাকা। মাটি, আকাশ আর বাতাসের মাঝে ঝুলে থাকা।

এ শহর আসলে এখন সবাই ভয় পায় ‘মৃতেরা যদি একদিন জায়গা চাইতে শুরু করে’।