পাঠের পথে পৃথিবী বদলের গল্প

বইকে বলা যায় মস্তিষ্কের আলোকিত সন্তান। আলো যেমন জাগতিক নিয়মে অন্ধকার দূর করে সবকিছু স্পষ্ট করে ফুটিয়ে তোলে, তেমনি ভালো বই মানুষের মনের ভেতর জ্ঞানের আলো এনে যাবতীয় অন্ধকারকে দূর করে পরিচ্ছন্ন চেতনার আলোতে সবকিছুকে উদ্ভাসিত করে।

বই মানুষকে শুধু তথ্য দেয় না, সে মানুষের ভেতরের দরজা খুলে দেয়। একটি বই হাতে তুলে নেওয়া মানে কেবল কাগজ ও কালির সঙ্গে পরিচয় নয়; বরং এটি একটি যাত্রার শুরু। মানুষের ভিতরের অন্ধকার দূর করে কুসংস্কারমুক্ত, প্রগতিশীল, আলোকিত সমাজ, দেশ ও জাতি গঠনে বই হলো শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সাহিত্যপাঠ মানুষের সহমর্মিতার ক্ষমতা বাড়ায়।  গবেষকরা দেখিয়েছেন, যারা নিয়মিত গল্প-উপন্যাস পড়েন, তারা অন্যের আবেগ বুঝতে বেশি পারদর্শী। তাদের মধ্যে সামাজিক বোধ বেশি সক্রিয়। একটি কাল্পনিক চরিত্রের বেদনা অনুভব করতে করতে গিয়ে পাঠক আসলে নিজের মানবিকতাকেই শান দেন। বই পাঠ এমন এক যাত্রা, যেখানে পাঠক নিজের অজান্তেই অন্য কারও চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখতে শেখেন, অন্য কারও বেদনায় কাঁদেন, অন্য কারও আনন্দে উদ্বেলিত হন। বইয়ের চিরায়ত আবেদনের প্রসঙ্গে মনে পড়ে পারস্য কবি ওমর খৈয়ামের সেই অমর বাণী, ‘রুটি-মদ ফুরিয়ে যাবে/ প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে,/ কিন্তু বই সে তো অনন্ত যৌবনা!’

বই পড়া তাই শুধু জ্ঞান অর্জনের কাজ নয়, এটি আত্মার অনুশীলন। আর বইমেলা সেই অনুশীলনের সবচেয়ে বড় উৎসব। প্রতি বছর অমর একুশে বইমেলা যখন শুরু হয়, তখন ঢাকার বুকে এক অদ্ভুত জাগরণ ঘটে। বইপ্রেমী মানুষেরা দল বেঁধে আসেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ, ছাত্র থেকে শিক্ষক, গৃহিণী থেকে গবেষক; সকলে একই টানে এসে থামেন বইয়ের স্টলের সামনে। এই যে মিলন, এই যে একটি জাতির প্রতি বছর বইয়ের সামনে নত হওয়া, এটি কম বড় কথা নয়। এটি একটি সভ্যতার আত্মপরিচয়। বইমেলা শুধু বই কেনাবেচার জায়গা নয়। এটি একটি জাতির সাংস্কৃতিক আত্মার দর্পণ। যেদিন একটি শিশু তার বাবার হাত ধরে প্রথমবার বইমেলায় আসে, সেদিন আসলে তার সঙ্গে একটি সভ্যতার পরিচয় হয়। সে দেখে হাজারো মানুষ এক জায়গায় জড়ো হয়েছেন শুধু বইয়ের জন্য। এই দৃশ্যটি তার মনে যে ছাপ ফেলে, তার রেশ সারাজীবন থেকে যায়।

জার্মানের ফ্রাংকফুর্ট বইমেলা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বইমেলা। প্রতি বছর সেখানে শতাধিক দেশের লেখক, প্রকাশক আর পাঠক মিলিত হন। এখানে একজন বাংলাদেশি লেখকের বই হয়তো জার্মান পাঠকের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে, একজন জাপানি ঔপন্যাসিকের গল্প পড়ছেন কোনো ব্রাজিলিয়ান পাঠক। বই তাই ভাষার দেয়াল ভেঙে মানুষকে মানুষের কাছে নিয়ে আসে। আমাদের অমর একুশে বইমেলার কথা আলাদাভাবে বলতে হয়। ভাষার জন্য জীবন দেওয়া একটি জাতির কাছে বইমেলা শুধু উৎসব নয়, এটি একটি শপথের জায়গা। এখানে দাঁড়িয়ে বই হাতে তুলে নেওয়া মানে সেই শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো, যারা বলেছিলেন

মাতৃভাষাই আমাদের পরিচয়। অমর একুশে বইমেলাতে অনেক বিদেশি লেখকদেরও আগমন ঘটে। বন্ধুত্বের বন্ধন দৃঢ় করার উৎসও এই বইমেলা। যে বন্ধু বা আত্মীয়ের সঙ্গে কালেভদ্রে দেখা বা কথা হয়, বইমেলাতে তাকেও হয়তো নির্মল পরিবেশে পাওয়া যায়। মজবুত হয় হৃদয়ের বন্ধন। এ জন্যই বইমেলাকে মিলনমেলাও বলা যায়।

বিজ্ঞান বলছে, বই পড়লে আমাদের মস্তিষ্ক আক্ষরিক অর্থেই বদলে যায়। নিয়মিত বই পাঠে মস্তিষ্কের ধূসর পদার্থের ঘনত্ব বাড়ে, যা স্মৃতিশক্তি ও বিচারবুদ্ধিকে শক্তিশালী করে। ২০১৩ সালে এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা যায়, উপন্যাস পড়ার পরও মস্তিষ্কে একটি বিশেষ উত্তেজনা কয়েক দিন পর্যন্ত থাকে।

বই পড়লে মানসিক চাপও কমে। ২০০৯ সালে সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখেছেন, মাত্র ছয় মিনিট বই পড়লে মানসিক চাপ ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। এমনকি সঙ্গীত শোনা বা চা পানের চেয়েও বেশি কার্যকর বইপড়া। কারণটা সহজ বই পড়ার সময় মন সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন জগতে ডুব দেয়, দৈনন্দিন উদ্বেগ থেকে সাময়িক মুক্তি পায়।

বয়স্কদের ক্ষেত্রেও বইপড়ার উপকার অসামান্য। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত বই পড়েন তাদের আলঝেইমার রোগ হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বই পড়ার অভ্যেস মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে, তাকে বুড়ো হতে দেয় না। তাই বলা চলে, বই শুধু মনের খোরাক নয়, এটি আমাদের শরীরের জন্যও দাওয়াই।

বই মানুষের মনোজগৎ ও পার্থিব জগতের কার্যক্রমকে চিরদিনের জন্য ইতিবাচকভাবে বদলে দিতে পারে। ঊনিশ শতকের আমেরিকায় ফ্রেডেরিক ডগলাস নামে এক ক্রীতদাস ছিলেন। তখনকার আইনে দাসদের পড়াশোনা শেখা ছিল নিষিদ্ধ। কিন্তু ডগলাস লুকিয়ে পড়তে শিখলেন। বই পড়তে পড়তে তিনি বুঝলেন দাস প্রথা কতটা অন্যায় আর অমানবিক। সেই উপলব্ধিই তাকে পালিয়ে যেতে সাহস দিল। এরপর তিনি হয়ে উঠলেন আমেরিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবাধিকার নেতা। ১৮৪৫ সালে প্রকাশিত তার আত্মজীবনী ‘Narrative of the Life of Frederick Douglass ’ গ্রন্থটি আমেরিকায় দাসত্বের ভয়াবহতা তুলে ধরেছিল। বাল্টিমোরে থাকার সময় তিনি রুটির বিনিময়ে শ্বেতাঙ্গ ছেলেদের কাছ থেকে অক্ষরজ্ঞান অর্জন করেন এবং মুক্তির পথ হিসেবে বইকে বেছে নেন। পড়তে শেখাই ছিল তার মুক্তির পথ। দক্ষিণ আফ্রিকার রবেন আইল্যান্ডের কারাগারে বন্দি নেলসন ম্যান্ডেলা ও তার সঙ্গীরা একটি শেকসপিয়ারের একটি পূর্ণাঙ্গ রচনাবলি লুকিয়ে রেখেছিলেন।

এটি তাদের কাছে ‘রবেন আইল্যান্ড বাইবেল’ নামে পরিচিত ছিল। ২৭ বছরের কারাজীবনে এ বইটি ছিল তাদের অন্যতম মানসিক অবলম্বন। প্রতিটি বন্দি তার প্রিয় লাইনে সই করতেন। ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, বই ছিল তাদের একমাত্র মুক্তি। অত্যাচারের অন্ধকারেও বই যে আলো জ্বেলে রাখে, এটাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। মালালা ইউসুফজাই গুলি খাওয়ার পরে হাসপাতালের বিছানায় জ্ঞান ফিরে প্রথম যা চাইলেন, তা হলো একটি বই। তালেবানরা তাকে থামাতে পারেনি, কারণ বইয়ের প্রতি ভালোবাসা কোনো বন্দুক দিয়ে থামানো যায় না। তিনি বলেছিলেন, একটি শিশু, একজন শিক্ষক আর একটি বই দিয়েই পৃথিবী বদলানো সম্ভব। মার্কিন চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক স্টিভেন অ্যালান স্পিলবার্গ একদিন টমাস কেলেনি রচিত ‘Schindler’s Ark’ উপন্যাসটি পড়তে পড়তেই রাতভর কাঁদলেন। উপন্যাসটির ঘটনাক্রম আবর্তিত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মান ব্যবসায়ী অস্কার শিন্ডলারের সত্য কাহিনি অবলম্বনে, যিনি ১১০০ জনেরও বেশি ইহুদিকে নাৎসিদের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। সকালে উঠে স্পিলবার্গ সিদ্ধান্ত নিলেন এই গল্পটি পৃথিবীকে জানাতে হবে। তারপর তৈরি হলো Schindler’s List’ নামক বিখ্যাত সিনেমাটি। যা হলোকাস্টের স্মৃতিকে নতুন করে পৃথিবীর কাছে মানবিক ভাষায় উপস্থাপন করল। একটি বই একজন মানুষকে বদলে দিল আর সেই মানুষটি কোটি কোটি দর্শকের হৃদয় স্পর্শ করলেন। বইপাঠে জীবন বদলের গল্পে এই মানুষগুলো ছাড়াও বিশাল মানবস্রোতে দৃশ্যমান অসংখ্য মুখ প্রতিফলিত। যুগে যুগে বইয়ের আলোয় দিশেহারা মানুষেরা বারবার নিজেকে খুঁজে পেয়েছে। সারা পৃথিবীতে প্রতিদিন অসংখ্য নারী একটি বই হাতে তুলে নিয়ে প্রথমবারের মতো আবিষ্কার করছেন, তাদেরও কণ্ঠস্বর আছে, তাদেরও স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে। বই পড়া মানুষের ভেতরে এক অদৃশ্য রূপান্তর ঘটায়, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায় মানুষটির কথা বলার ভঙ্গিতে, তার তাকানোর দৃষ্টিতে, অন্যের কষ্টে তার চোখ ভিজে আসার মুহূর্তে। যে মানুষ সত্যিকার অর্থে বই পড়েছেন, তিনি জানেন প্রতিটি মানুষের ভেতরে একটি আলাদা পৃথিবী আছে, সেই পৃথিবীকে আঘাত করা মানে একটি মহাবিশ্বকে ধ্বংস করা। বই তাই মানুষকে হিংসার অনুপযোগী করে তোলে, তার হাতকে আঘাতের বদলে সাহায্যের জন্য বাড়িয়ে দিতে শেখায়। কারণ যে হৃদয় একবার শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্তের সঙ্গে পথে নেমেছে, রবীন্দ্রনাথের চোখে সংসারের মর্মবেদনা দেখেছে, তলস্তয়ের কারুণ্যে অভিষিক্ত হয়েছে, সেই হৃদয় আর কখনো সহজে কঠিন হতে পারে না। বই পড়া মানে তাই কেবল অক্ষর পড়া নয়, এটি মানুষ হওয়ার সবচেয়ে নিবিড় সাধনা।

আজকের দ্রুতগতির ডিজিটাল দুনিয়ায় অনেকে প্রশ্ন করেন, বইয়ের কি আর প্রয়োজন আছে? সব কিছু তো ইন্টারনেটে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এর উত্তর একটাই, ইন্টারনেট তথ্য দেয় আর কাগজের বই দেয় বোধের গভীরতা। স্ক্রলিংয়ের মাধ্যমে আমরা তথ্যের ওপর দিয়ে ভেসে যাই, কিন্তু বই পড়লে আমরা ভাব ও বোধের জগতে ডুব দিই। এই ডুব দেওয়াটাই মানুষকে চিন্তাশীল করে, সৃজনশীল করে। বিল গেটস প্রতি বছর পঞ্চাশটির বেশি বই পড়েন। অপেরা উইনফ্রে জানিয়েছেন, বই পড়াই তাকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষদের জীবনে বই একটি অপরিহার্য সঙ্গী।

আমাদের এই ব্যস্ত জীবনে হয়তো প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বই পড়ার সুযোগ হয় না। কিন্তু প্রতিদিন মাত্র বিশ মিনিটও যদি বই পড়া যায়, তাহলে বছরে পনেরোটি বই পড়া সম্ভব। এই পনেরোটি বই একজন মানুষের চিন্তার জগতকে কতটা বদলে দিতে পারে, তা ভাবাও কঠিন। বইমেলা আসে বছরে একবার, কিন্তু বই পড়ার সুযোগ আসে প্রতিদিন। বইমেলায় গিয়ে বই কেনা যতটা জরুরি, তার চেয়েও জরুরি সেই বই ঘরে ফিরে পড়া, সন্তানকে পড়ে শোনানো, কাছের মানুষকে পড়তে উৎসাহিত করা। একটি পড়ুয়া পরিবার থেকে তৈরি হয় পড়ুয়া সমাজ, আর পড়ুয়া সমাজ থেকেই তৈরি হয় আলোকিত জাতি।

বই তাই কেবল কাগজ ও কালির সমাহার নয়। এটি একটি নিঃশব্দ বিপ্লব। বই মানব সভ্যতার জন্য বয়ে আনা সেই আলো, যা ভেতর থেকে জ্বলে বাইরের অন্ধকারকে সরিয়ে দেয়। যতদিন মানুষ বই পড়বে, ততদিন সে মানবিক থাকবে, সংবেদনশীল থাকবে, আর স্বপ্ন দেখার সাহস রাখবে। বইমেলা তাই শেষ হয়, কিন্তু বইয়ের যাত্রা শেষ হয় না। বই পড়ার সংস্কৃতির এই যাত্রাই আমাদের সভ্যতার যাত্রা। 