সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক মাহবুবুল হক

হাম প্রতিরোধে অবশ্যই দুই ডোজ টিকা লাগবে

দেশে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হাম রোগের সংক্রমণ। সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের মধ্যে এ সংক্রামক রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন শিশুর প্রাণহানি হয়েছে। শিশুদের নিয়ে অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন। হামের মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে শুধু চিকিৎসা নয়, সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায়ও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুল হক। তিনি বলেছেন, ‘প্রতিটি শিশুকে যথাসময়ে টিকার আওতায় আনা, অসুস্থ শিশুকে আলাদা রাখা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এ তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হবে।’

গতকাল দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে মুঠোফোন আলাপে বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল কাজ হলো প্রতিরোধ করা। প্রতিরোধ করতে গেলে অবশ্যই দুই ডোজ টিকা দিতে হবে। অনেক অভিভাবক বিভ্রান্ত হন। বিভিন্ন সময়ে টিকা নিয়ে ওঠা গুজবে কান দেন। বলেন, সন্তান টিকা দিতে চায় না। আবার অনেক অভিভাবক অবহেলা করে সন্তানকে টিকা দেন না। টিকার বিষয়টিকে তারা গুরুত্ব দেন না। কিন্তু তারা এটি করে মূলত তাদের সন্তানকে ঝুঁকিতে ফেলে দেন। তাই অভিভাবকদের বলব, আপনারা বিভ্রান্ত হবেন না। সন্তানের সুরক্ষার জন্য অবশ্যই টিকা দিতে হবে।’

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এ কথা উল্লেখ করে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এটা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তির থেকে আশপাশের অনেকেই সহজে সংক্রমিত হতে পারে। প্রথম দিকে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, এসব উপসর্গ দেখা দেয়। সাধারণত তিন থেকে চার দিন পর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা র‌্যাশ ওঠে, যা হামের প্রধান লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত।’

হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে বেশ কয়েকটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুল হক বলেন, ‘হামে কমপ্লিকেশন হয়ে, নিউমোনিয়া হয়ে বেশকিছু শিশু মারা গেছে। হাম সংক্রামক ব্যাধি। এটার কমপ্লিকেশন বেশি। মারা যায়, অপুষ্টি হয়, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। চোখের মারাত্মক ক্ষতি হয়। হামে মৃত্যুর প্রধান কারণ সরাসরি ভাইরাস নয়বরং এর জটিলতা। যেমন অনেক ক্ষেত্রে হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া যুক্ত হয়ে যায়, যা শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। এ ছাড়া অপুষ্টির কারণে শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। হামের কারণে চোখের মারাত্মক ক্ষতি, এমনকি দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঘটনাও ঘটে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিরোধ। হামের কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ নেই, এ রোগ প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো টিকা। সরকারিভাবে শিশুদের জন্য হাম-রুবেলা টিকা দুই ডোজে দেওয়া হয়। একটি ডোজ নয়, পূর্ণ সুরক্ষার জন্য দুই ডোজ টিকা নিশ্চিত করতেই হবে। সরকারি হোক বা বেসরকারি, যেখান থেকেই দেওয়া হোক না কেন, নির্ধারিত দুই ডোজ সম্পন্ন করা জরুরি। প্রথম ডোজ শিশুর ৯ মাস বয়স পূর্ণ হলে এবং দি¦তীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে দেওয়া হয়।’

চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি থেকেই হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মার্চে তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এক বছরের কম বয়সী শিশুরা। এর মধ্যে অনেকেই আছে যাদের টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি। ৯ মাসের কম বয়সীরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। আগে যেখানে ধারণা ছিল, মায়ের শরীর থেকে পাওয়া রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শিশুকে অন্তত ৯ মাস পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়, এখন দেখা যাচ্ছে তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে ৬ মাস বা তারও কম বয়সী শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে টিকা দেওয়ার জন্য এই বয়সসীমা নিয়ে নতুন করে গবেষণা ও আলোচনা চলছে। কোনো কোনো দেশ বলছে ৯ মাসের আগে, ছয় মাসের পরে দিতে।’

হাম প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন টিকাদানের ঘাটতি এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া। অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুল হক বলেন, ‘২০২০ সালের পর নিয়মিত বড় আকারের টিকাদান ক্যাম্পেইন হয়নি। সাধারণত চার বছর পরপর একটি জাতীয় ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৪ সালে তা হয়নি। ২০২৫ সালেও বিভিন্ন কারণে টিকার সরবরাহ ও প্রয়োগে ঘাটতি ছিল। ফলে অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে, যা বর্তমান প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ। এ অবস্থায় সরকার দ্রুত সময়ের মধ্যে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার পরিকল্পনা নিচ্ছে। দ্রুত ক্যাম্পেইন করা হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।’

আক্রান্তদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে আইসোলেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু হামে আক্রান্ত হলে অন্তত সাত দিন তাকে আলাদা ঘরে রাখতে হবে। যারা শিশুটির পরিচর্যা করবেন, তাদের মাস্ক ব্যবহার করতে হবে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। কারণ, হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এ রোগ খুব সহজেই অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। আর জটিল মনে হলে হাসপাতালে নিতে হবে।’

এ পরিস্থিতিতে শিশুদের স্কুলে পাঠানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পরামর্শ হলো, যদি কোনো শিশুর জ্বর, সর্দি, কাশি বা হামের প্রাথমিক লক্ষণ থাকে, তাহলে তাকে কোনোভাবেই স্কুলে পাঠানো উচিত হবে না। তার জ¦র ভালো মতো কমবে, তারপর স্কুলে পাঠাতে হবে। কারণ, র‌্যাশ উঠে তিন দিন পর। তার আগে তো বুঝতে পারবে না হাম হয়েছে কি না। ওই শিশু র‌্যাশ ওঠার আগেই সংক্রমণ ঘটাতে পারে। তাই জ্বর থাকলে শিশুকে বাড়িতে রেখে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।’

শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুল হক মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি একটি সতর্কবার্তা। টিকাদানে অবহেলা বা ঘাটতি থাকলে যেকোনো সময় হাম মহামারীর আকার নিতে পারে।