বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের কাজ করে থাকে এবং অনেকদিন ধরেই করছে। গুরুত্বপূর্র্ণ এ খাত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চেষ্টা করছে একাধিক বিদেশি রাষ্ট্র। সর্বশেষ যুক্তরাজ্য এ কাজে ইচ্ছা ব্যক্ত করায় কিছুটা জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে বিমানের সঙ্গে তাদের ঠান্ডা লড়াই চলছে। এরপরও বিমান আশাবাদী, থার্ড টার্মিনাল উদ্বোধন হওয়ার আগেই তারা হ্যান্ডেলিংয়ের দায়িত্ব পাবে। এ জন্য সংস্থাটি প্রায় হাজার কোটি টাকার সরঞ্জামাদি কিনেছে। যদিও মন্ত্রণালয়ের একটি অংশ লাগেজ কাটাসহ নানা বদনাম থাকায় বাইরের কোনো সংস্থাকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের কাজ দিতে চায়।
বিমানের লন্ডন-ঢাকা রুটের কার্গো ব্যবসা পুরোপুরি ধসে পড়েছে। লাভজনক রুটটি বিদেশি এয়ারলাইন্সের দখলে চলে যাওয়ায় সংস্থাটির কয়েকশ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। বিমানের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচার, অসাধু চক্রের ষড়যন্ত্র, আওয়ামী লীগের সাবেক একজন প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্যের হস্তক্ষেপে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি মালিকানার জেএমজি কার্গো অ্যান্ড ট্রাভেলস লিমিটেডকে কার্গো সেলস এজেন্ট থেকে বাদ দেওয়ার পরেই এ বিপর্যয় দেখা দেয়। বিমানের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিউল আজিমের সভাপতিত্বে এক সভায় জানানো হয়েছিল, ২০০৯ সাল থেকে জেএমজি কার্গো বিমানের সঙ্গে সফলভাবে ব্যবসা করেছে। তখন বিমান বছরে ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা লাভ করত। জেএমজি কার্গোকে বাদ দেওয়ার পর লন্ডনের কার্গো শূন্যে নেমে এসেছে।
নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সঙ্গে ২০১৩ সালের ২২ অক্টোবর ও ২০১৪ সালের ১৮ অক্টোবর পৃথক পৃথক কার্গো সেলস এজেন্ট চুক্তি ও লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক প্রণোদনা চুক্তি সম্পাদিত হয় জেএমজি কার্গোর। বিমানের লন্ডন অফিসের তৎকালীন কান্ট্রি ম্যানেজার হারুন খানসহ একাধিক চক্রের প্ররোচনায় জেএমজি কার্গোকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। চুক্তি বাতিলে কোনো নিয়মনীতি মানা হয়নি, কোনো যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠানটিকে শুধু কার্গো সেবা থেকেই বাদ দেওয়া হয়নি, তাদের বকেয়া বিপুল পরিমাণ টাকাও দেওয়া হচ্ছে না। চুক্তি বাতিলের আগে জেএমজি কার্গো বিমানের প্রতি ফ্লাইটে প্রায় ৮ টন কার্গো দিলেও কারণ না দেখিয়েই তৎকালীন কান্ট্রি ম্যানেজার হঠাৎ কমিয়ে তা ৩ টনে নামান। বর্তমানে বিমানের অধিকাংশ ফ্লাইটে লন্ডন থেকে কোনো কার্গো আসে না। এখন লন্ডনের কার্গো বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো পরিবহন করছে।
২০২৩ সালে ১৪ ডিসেম্বর মোহাম্মদ সালাহউদ্দীন স্বাক্ষরিত বিমানের বিপণন বিভাগের প্রতিবেদন অনুসারে এবং সংশ্লিষ্ট সভার কার্যবিবরণীর বিশ্লেষণে
জেএমজির পক্ষে শক্ত যুক্তি রয়েছে। তাতে উল্লেখ রয়েছে, একটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করতে কীভাবে ষড়যন্ত্র হয়েছে। বলা হয়েছে, জেএমজি কার্গোর সঙ্গে বাংলাদেশ বিমানের সিএসএ চুক্তি বাতিলের পর লন্ডন-ঢাকা রুটে বিমান তার কার্গো বাজার হারিয়েছে। বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে লন্ডন-ঢাকা রুটে কার্গো থেকে বিমানের আয় ছিল ৪৭ হাজার ৪৪ কোটি টাকা, যার অর্ধেকেরও বেশি আসে জেএমজি কার্গো থেকে। ২০২০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জেএমজি কার্গোর চুক্তি বাতিলের পর ২০২০-২১ অর্থবছরে বিমানের আয় নেমে আসে ৫ হাজার ৯৩ কোটি টাকায়। সভায় বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিউল আজিম বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতির জন্য জেএমজি-এজেন্টের চুক্তি বাতিলে যুক্ত কর্মকর্তাদের তিরস্কার করে প্রতিষ্ঠানটির কার্গোকে পুর্নবহালের তাগিদ দেন।
বিমানের লন্ডন অফিসের তৎকালীন কান্ট্রি ম্যানেজার ২০২০ সালের ৩ আগস্ট জেএমজির চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত জানান। একই সঙ্গে তৎকালীন ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার আবু সাইদ মো. মঞ্জুর ইমাম ২০২০ সালে ঢাকা থেকে লন্ডনে যাওয়া দুই সদস্যের তদন্ত দলের নেতৃত্ব দেন। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ওই কর্মকর্তা লন্ডনে গেলেও জেএমজি কার্গোর সঙ্গে যোগাযোগ না করে ঢাকা ফিরে মনগড়া প্রতিবেদন দাখিল করেন। অসাধু চক্রটি ওই প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিমান বাংলাদেশের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করে। চক্রটি এখনো সক্রিয় রয়েছে এবং বর্তমান সরকারের আমলেও তাদের প্রভাব রাখার চেষ্টা করছে।
জেএমজি কার্গোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনির আহমেদ এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমরা প্রবাসীদের কাছে বিমানের সেবা পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করেছি। আমাদের বাদ দেওয়ার পর লন্ডন-ঢাকা রুটে পণ্য পাঠাতে প্রবাসীরা বিদেশি এয়ারলাইন্স বেছে নিচ্ছেন, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। আমরা চাই, বিমান বাংলাদেশ আমাদের পুনর্বহাল করে এ রুটের কার্গো আয় আগের মতো করুক।’ তিনি বলেন, ‘জেএমজিকে বাদ দেওয়ার পর গত পাঁচ বছরে বিমান কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করলেও সুবিচার পাইনি। এখন নির্বাচিত সরকার আসায় সুবিচার পাব বলে আশা করছি।’
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, ১৯৭২ সাল থেকে দেশের সবকটি বিমানবন্দরে এককভাবে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজ করছে বিমান। নিজেদের ফ্লাইটের পাশাপাশি ৩২টি ফ্লাইটের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের করছে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি। বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো নিজস্বভাবে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং করে। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এবং কার্গো পরিষেবার মাধ্যমে বিমান প্রতি বছর ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা আয় করে। থার্ড টার্মিনালের দায়িত্ব পেলে আয় ৪ হাজার কোটিতে দাঁড়াবে। কিন্তু সংস্থাটির কর্মকা- নিয়ে বেবিচক ও মন্ত্রণালয়ের একটি অংশ নাখোশ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তৃতীয় টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব বিমানকে না দিয়ে জাপানি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল, যদিও সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। এখন যুক্তরাজ্য চেষ্টা চালাচ্ছে এ কাজ পেতে। তবে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার সরঞ্জামাদি কিনেছে বিমান।’ তিনি বলেন, ‘বিমানের রাজস্ব আয়ের বড় একটি অংশ আসে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং থেকে। বিমান বছরে আয় করছে ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা। সংস্থাটির সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন আছে যদিও। আরব আমিরাতের একটি সংস্থাও গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের দায়িত্ব পাওয়ার চেষ্টা করছে।’