বগুড়ার শেরপুর উপজেলার গাড়িদহ ইউনিয়নের মহিপুর কলোনি এলাকার মৃত আবসার আলীর মেয়ে আঞ্জুমানারা। প্রায় চার দশক আগে দারিদ্র্যের কষাঘাতে প্রতিবেশীর হাত ধরে কাজের জন্য পাড়ি জমান রাজধানী ঢাকায়। সেখানে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ শুরু হয় আঞ্জুমানারার। কয়েকদিন পরই শুরু হয় নির্যাতন। চুন থেকে পান খসলেই তাকে সহ্য করতে হয় শারীরিক নির্যাতন। ছোট্ট শরীর এতটা নির্যাতন সইতে না পেরে অভিমান আর কষ্ট নিয়ে সেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন অজানার উদ্দেশ্যে।
পথে এক সহৃদয়বান নারীর সহায়তায় আশ্রয় পান একটি এতিমখানায়। পরে জীবিকার তাগিদে যোগ দেন এক গার্মেন্টস কারখানায়। সেসময় মোবাইল ফোন সেবা না থাকায় এবং টেলিফোন সহজলভ্য না হওয়ায় পরিবার জানত মেয়ে ভাল আছে। দীর্ঘদিন পর পরিবার যখন জানতে পারেন যে আঞ্জুমানারা সেই বাড়ি থেকে অনেক আগেই চলে গেছে তখন শুধু চোখের পানি ফেলা ছাড়া যেন তাদের আর কিছুই করার ছিলনা। পরিবারের সদস্যরা একসময় ভেবেই নিয়েছে আঞ্জুমানারা আর বেঁচে নেই।
এদিকে, গার্মেন্টসে কাজ করার সুবাদে আঞ্জুমানারার সাথে পরিচয় হয় মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাইফুল ইসলামের। এক দুর্ঘটনায় সাইফুল আহত হলে তার খোঁজ খবর নেওয়া ও সেবা করায় সুস্থ হয়ে ওঠেন সাইফুল। সেই যত্ন থেকেই জন্ম নেয় ভালোবাসার, যা একসময় গড়ায় বিবাহবন্ধনে। বিয়ের পর দুজনে কিছুদিন চাকরি করে স্বামীর বাড়ি শ্রীমঙ্গলে বসবাস শুরু করেন। সংসারের হাল ধরতে স্বামী বিদেশে পাড়ি জমান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সংসার বড় হয় এক মেয়ে ও তিন ছেলের জননী হন আঞ্জুমানারা। এখন নাতির মুখও দেখেছেন তিনি।
সবকিছু থাকার পরও একটা শূন্যতা যেন তাকে তাড়া করে ফিরত নিজের জন্মভিটা, আপন মানুষদের কাছে ফিরে যাওয়ার আকুতি। প্রায় ৩০ বছর আগে সেই খোঁজে বের হলেও (শেরপুর) নামের বিভ্রাটে ভুল করে চলে যান ময়মনসিংহ জেলার শেরপুরে। ভুল ঠিকানার এই বিভ্রান্তি তাকে আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য বিচ্ছিন্ন করে রাখে শেকড় থেকে।অবশেষে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় ফেসবুকের মাধ্যমে খুঁজে পান নিজের প্রকৃত ঠিকানা বগুড়ার শেরপুরের মহিপুর কলোনি। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হওয়ার পর আর দেরি করেননি। স্বামী সন্তানদের নিয়ে ছুটে আসেন নাড়ির টানে।
একদিন, দুইদিন নয়, পুরো ৪০ বছর ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা শেকড়ের টান, হারিয়ে যাওয়া ঠিকানার হাহাকার আর স্বজনদের জন্য না পাওয়া ভালোবাসার শূন্যতা সবকিছু নিয়েই বেঁচে ছিলেন আঞ্জুমানারা। অবশেষে প্রযুক্তির ছোঁয়ায়, ফেসবুকের মাধ্যমে ফিরে পেলেন তার সেই হারিয়ে যাওয়া আপন ঠিকানা।বগুড়ার শেরপুর উপজেলার গাড়িদহ ইউনিয়নের মহিপুর কলোনি এলাকায় এখন উৎসবের আমেজ। হারিয়ে যাওয়া মেয়ের ফিরে আসা যেন এক সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। তাকে এক নজর দেখতে ভিড় করছেন শত শত মানুষ আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী আর উৎসুক জনতা।
দীর্ঘদিন পর বাড়ির মাটিতে পা রেখেই আবেগে আ ফেটে পড়েন আঞ্জুমানারা। বাড়ির প্রতিটি কোণ, কোথায় ছিল তাল গাছ? পেয়ারা গাছ? আত্মীয়দের নাম সবকিছু যেন তার স্মৃতিতে অমলিন। তার মুখে সেই স্মৃতিচারণ শুনে স্বজনরা নিশ্চিত হন এই তাদের হারিয়ে যাওয়া আপনজন। শুরু হয় কান্না আর আলিঙ্গনের এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য। আশপাশের গ্রাম থেকেও মানুষ ভিড় করেন এই বিরল মিলনমেলা দেখতে। বড় বোন আলোয়া খাতুন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, আমরা অনেক খোঁজ করেছি, পাইনি। একসময় ভেবেছিলাম আর বেঁচে নেই। আজ তাকে ফিরে পেয়ে মনে হচ্ছে আল্লাহ আমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন।
আঞ্জুমানারা বলেন, এই ৪০ বছরে আত্মীয়দের ভালোবাসা পাইনি। আজ নিজের বাড়িতে ফিরে মনে হচ্ছে বুকের পাথর নেমে গেছে। তবে কষ্ট একটাই, অনেক প্রিয় মানুষকে আর দেখতে পারলাম না। হারিয়ে যাওয়া এক নারীর ফিরে আসার এই গল্প এখন বগুড়ার শেরপুরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। স্থানীয়দের মতে, সময় যতই পেরিয়ে যাক, শেকড়ের টান কখনও মুছে যায় না। আপনকে খুঁজে ফেরে বারবার। আঞ্জুমানারা তারই জীবন্ত উদাহরণ।