পেঁপে চাষে বদলে গেছে দূরছড়ি গ্রাম

খাগড়াছড়ি জেলায় পেঁপে চাষ করে সফল হয়েছেন রেম্রাচাই মারমা। তার অনুপ্রেরণায় বদলে গেছে খাগড়াছড়ির মানিকছর দূরছড়ি গ্রাম। রেম্রাচাই মারমার অনুপ্রেরণায় গ্রামের সবাই এখন পেঁপে চাষি। পেঁপে চাষ করে স্বাবলম্বী গ্রামের প্রায় ৫০টি পরিবার।

মানিকছড়ি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে  দুর্গম দূরছড়ি গ্রাম। ৫ বছর আগেও গ্রামের বাসিন্দাদের জীবন ছিল অভাব-অনটনে। কিন্তু রেম্রাচাই মারমার কারণে গ্রামবাসী এখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। রেম্রাচাই মারমা ২০২১ সালে স্কুলে পড়া অবস্থায় কৃষির প্রতি আগ্রহী হয়। সে সময় তার ২শ পেঁপে গাছের  বাগান ছিল। রেম্রাচাই মারমা জানান, ২০২৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর শিক্ষাজীবন বাদ দিয়ে পুরোদমে কৃষিতে নেমে পড়েন। এখন ১০ একর জমিতে ৩ হাজার পেঁপের গাছ রয়েছে। এ বছর তিনি ২০ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রি করেছেন। গাছে আরও প্রায় ৫ লাখ টাকা পেঁপে ঝুলছে। সামনে আরও ৩ হাজার পেঁপে গাছের  চারা রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে তার। তিনি জানান, এক সময় তিনি মানিকছড়ি বাজারে গিয়ে পেঁপে বিক্রি করতেন। তিনি তার পেঁপে বাগানের ছবি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করার পর ঢাকা থেকে যোগাযোগ করা হয়। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। 

এদিকে পেঁপে চাষে শুধু রেম্রাচাই মারমার ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি, হয়েছে পুরো দূরছড়ি গ্রামবাসীর। এক সময় ওই গ্রামের অধিকাংশ পরিবার ছিল জুম চাষি। তাদের পরিবারে ছিল অভাব-অনটন।  পেঁপে চাষ করে গ্রামবাসী এখন স্বাবলম্বী। প্রতি শুক্রবার গাছ থেকে পেঁপে সংগ্রহ করা হয়। ঢাকার ব্যবসায়ীরা ৬০ টাকা কেজি দরে পেঁপে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। কাক্সিক্ষত দাম পেয়ে খুশি দূরছড়ি গ্রামের পেঁপে চাষিরা। শুধু তাই নয়, এ পেঁপে চাষকে কেন্দ্র করে আরও অন্তত ৫০টি পরিবারের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে।

রেম্রাচাই মারমার মতো গ্রিন লেডি হাইব্রিড জাতের পেঁপে চাষ করেছেন একই এলাকার নারী চাষি রাবাই মারমা। ১ একর জমিতে ৪০ হাজার টাকা খরচ গুনতে হয়েছে তার। বসত ঘরের পাশে অনাবাদি জমিতে পেঁপে চাষ করেছেন তিনি। অনুকূল পরিবেশ আর ভালো দাম পেলে রাবাই মারমাও লক্ষাধিক টাকার পেঁপে বিক্রি করতে পারবেন। প্রতি কেজি পেঁপের বাজার দর এখন ৩০ থেকে ৪০ টাকা। তবে পাকা পেঁপের দাম বেশি। প্রতি কেজি ৮০ থেকে ৯০ টাকা।

বর্তমানে মানিকছড়ি উপজেলার দূরছড়ি গ্রামের ৫০ পরিবারের ভাগ্য বদলে গেছে দেখে এখন খাগড়াছড়ির অনেক বেকার মানুষও পেঁপে চাষ করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। এর মধ্যে পেঁপে বিক্রি করে স্বাবলম্বী হয়েছেন জেলার সদর উপজেলার ভাইবোনছড়া এলাকার বাসিন্দা জয়রাম চাকমা ও কল্পরঞ্জন চাকমা। তারা দুই বন্ধু মিলে সাড়ে চার একর পতিত জমিতে পেঁপে চাষ করছেন। জমির আগাছা পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে পেঁপের চারা লাগানো পর্যন্ত প্রায় ১৫ লাখ টাকা খরচ করেছেন। ইতিমধ্যে তারা ৬৫ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রি করেছেন। এসব পেঁপে স্থানীয়ভাবে বিক্রি করার পাশাপাশি যাচ্ছে চট্টগ্রাম, ফেনী ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। এদিকে চাষিদের দাবি, খাগড়াছড়িতে তাদের বাগানটি সবচেয়ে বড় পেঁপে বাগান। জেলায় মূলত রেডলেডি, রাজশাহী পেঁপে, দেশি জাত ও কিছু অন্যান্য হাইব্রিড চাষ হয়। তবে অধিকাংশ কৃষক রেডলেডি জাতের পেঁপে বেশি চাষ করেন। এদিকে তাদের বাগান দেখতে বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন আসেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাছির উদ্দিন চৌধুরী জানান, রেম্রাচাই মারমার সফলতা দেখে দূরছড়ি গ্রামে এখন আর কেউ বেকার নেই। অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে রেম্রাচাই মারমা হতে পারে মডেল। ভাগ্য পরিবর্তন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এ ছাড়া পাহাড়ের মাটি ও আবহাওয়া ফল চাষের উপযোগী হওয়ায় পেঁপে চাষের ভালো ফলন পাচ্ছেন কৃষকরা। কৃষি বিভাগ পাহাড়ের ফল চাষের জন্য কৃষকদের পরামর্শ ও উৎসাহিত করছেন। ফল ও সবজি হিসেবে পেঁপে পছন্দ করে সবাই। বাণিজ্যিক আবাদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী ফসল। সাধারণত রোপণের ছয় মাসের মধ্যে ফল সংগ্রহ করা যায়। সঠিকভাবে যতœ নিলে দুই বছর পর্যন্ত একটি পেঁপে বাগান থেকে টানা ফসল সংগ্রহ করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, ‘বসতবাড়ির আশপাশে কিংবা ছাদবাগানে একটি অথবা দুটি পেঁপে গাছ রোপণ করলে আমরা সারা বছর ফল ও সবজি খেতে পারি।’