ওসির শিডিউলে নেই বিশ্রাম

পুলিশ বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ পদ ‘পরিদর্শক’। পদটি বাহিনীতে প্রথম শ্রেণির হলেও ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার হয়। জীবনে একটি মাত্র পদোন্নতির স্বাদ পেলেও ওই কর্মকর্তারা পান না ঝুঁকিভাতা বা সোর্স মানি। তবে পুলিশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পদে আসীন থাকেন তারা। এই পদমর্যাদার অফিসারদের মধ্যে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) ডিউটি শিডিউলে নেই কোনো বিশ্রাম। একজন ওসি থানায় যোগদানের পর থেকে চলে যাওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত চাকরিবিধিতে কোনো বিশ্রামের সুযোগ রাখা হচ্ছে না। এমনকি খাতা-কলমে থানা এলাকার বাইরে যাওয়ারও সুযোগ নেই তার। বেশির ভাগ সময়ই থাকতে হয় ‘জনসেবায়’।

পরিদর্শক পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, সাধারণত চাকরি জীবনে উপ-পরিদর্শক (এসআই) থেকে একটা পদোন্নতি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাদের। কপালগুণে তাদের মধ্যে দু-একজন পদোন্নতি লাভ করেন। কিন্তু ঘুরপাক খেতে হয় একই গ্রেডের চক্করে।

পুলিশসংশ্লিষ্টরা জানান, পুলিশে বিসিএসের মাধ্যমে সরাসরি সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে ৭০ শতাংশ নিয়োগ দেয় সরকার। আর বাকি ৩০ শতাংশ নেওয়া হয় পরিদর্শক পদমর্যাদার অফিসার থেকে। তার মধ্যে আবার পরিদর্শক টিআইদের ১২ দশমিক ৬৫ শতাংশ, পরিদর্শক সশস্ত্রদের ১৭ দশমিক ২০ শতাংশ এবং বাকি ৭০ দশমিক ১৫ শতাংশ পরিদর্শক নিরস্ত্র কর্মকর্তাদের থেকে নেওয়া হয়। তারপরও একজন পরিদর্শক নিরস্ত্র থেকে এএসপি হতে ১৫-১৬ বছর লেগে যায়। যেখানে টিআই ও সশস্ত্রদের লাগে ৩-৪ বছর। সশস্ত্র ও টিআইদের মঞ্জুরি পদ অনুযায়ী এএসপি পদে পদোন্নতির দাবি নিরস্ত্র পরিদর্শকদের।

পুলিশের নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও পরিদর্শক কামরুল হাসান তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশ পরিদর্শক ও এসআই (নিরস্ত্র) বাহিনীর মেরুদ-। তাদের দ্বারা আইনের প্রয়োগ করা হয়। তাদের মধ্যে পরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তারা সবদিক থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এসব কর্মকর্তার মধ্যে যারা থানায় দায়িত্ব পালন করেন, তাদের কোনো শিডিউল বিশ্রাম নেই। পুলিশে সব শ্রেণির কর্মকর্তা ও সদস্য ঝুঁকিভাতা ও সোর্স মানির মতো সুযোগ-সুবিধা পেলেও পরিদর্শকরা পান না। একটি বাহিনীতে দুই রকম পরিবেশ থাকা ঠিক নয়।

সারা দেশে পরিদর্শকের সংখ্যা : পুলিশ সদরদপ্তর সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বাহিনীতে ৪ হাজার ৯৮২টি পরিদর্শক (নিরস্ত্র), ৯৬১টি পরিদর্শক (সশস্ত্র) ও ৯৮৫টি পরিদর্শক (শহর ও যান/টিআই) মঞ্জুরি পদ রয়েছে। এর মধ্যে পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মামলা তদন্ত করার ক্ষমতা রয়েছে। এ ছাড়া বাকি দুটি পরিদর্শকের এই ক্ষমতা নেই। পরিদর্শক (সশস্ত্র) পুলিশ লাইনস ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে কাজ করেন। এ ছাড়া পরিদর্শক (টিআই) পুলিশের ট্রাফিক বিভাগেই নিয়োজিত। দেশে বর্তমানে ৬৩৯টি থানা রয়েছে। এরমধ্যে মহানগর এলাকার আওতাধীন ১১০টি থানা এবং জেলা পর্যায়ে ৫২৯টি থানা। রেলওয়ে পুলিশের অধীনে আছে ২৪টি থানা। একটি থানায় ওসিসহ দুজন পরিদর্শক আবার তিন ও তার বেশি পরিদর্শক পদ রয়েছে। তাদের পুলিশ সুপার বা মহানগর কমিশনার নিজস্ব খাত থেকে সোর্স মানি দিয়ে থাকেন। এই প্রসঙ্গে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিয়মিত সোর্স মানি পান। তবে ক্রাইম বিভাগের সঙ্গে অন্যান্য বিভাগ তুলনামূলক কম সোর্স মানি পাচ্ছে। এ ছাড়া একই নিয়মে কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত কর্মকর্তা ও সদস্যরা নিয়মিত ঝুঁকিভাতা পান। তবে থানায় কর্মরত পরিদর্শক ছাড়া এই পদমর্যাদার কর্মকর্তারা কোনো বাড়তি ভাতা পান না।

থানার কর্মবণ্টন : ডিএমপির প্রতিটি থানায় পরিদর্শক, একাধিক উপ-পরিদর্শক (এসআই) ও সহকারী উপ-পরিদর্শকসহ (এএসআই) বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্য কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে তিনজন পরিদর্শক থানায় যোগদানের পর আর দায়িত্ব হস্তান্তরের আগপর্যন্ত বিশ্রামের কোনো শিডিউল নেই। তাদের ছুটি ও অসুস্থতার কারণ ছাড়া বিশ্রামের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। থানা এলাকার বাইরে গেলেও অন ডিউটি হিসেবে ধরা হয়। এ ছাড়া যেকোনো মুুহূর্তে থানায় হাজির হওয়ার শর্তে তারা থানা থেকে বের হতে পারেন। এসআই থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত ১২ ঘণ্টা ডিউটি ১২ ঘণ্টা বিশ্রাম। এরমধ্যে আবার নতুন করে বিভিন্ন ডিউটি করতে হয় তাদের। এসআই পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সকাল ৮টায় যার ডিউটি শুরু হয়ে শেষ হয় রাত ৮টায়। ওই কর্মকর্তার আবার পরের দিন রাত ৮টায় ডিউটি শুরু হয়। কিন্তু তার আগে থানার বিভিন্ন শর্ট ডিউটি করতে হয় তাদের। এ ছাড়া বিশ্রামের সময় মামলার তদন্ত কাজ শেষ করতে হয় এসআইদের।

তদন্তই শেষ করে দিচ্ছে কর্মঘণ্টা : ডিএমপির একটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিউটি চলাকালীন থানা থেকে বের হওয়ার সময় প্রত্যেক সদস্যকে জিডি করতে হয়। তিনি বেলা ১১টার দিকে একবার থানা এলাকা পরিদর্শনের জন্য বের হন। এই সময় তিনি পরিদর্শক তদন্তের ওপর দায়িত্ব হস্তান্তর করে যান। এরপর সন্ধ্যায় ডিসি কার্যালয়ে কাজের জন্য বের হন। রাত ১০টায় অভিযানে বের হয়েছেন। অভিযান শেষে ভোর রাতে থানায় ফেরেন। সকাল ৭টার দিকে ফোন পেয়ে আরেকটি দুর্ঘটনাস্থলে গেছেন। থানার রুটিন কাজ শেষে বেলা ১১টার দিকে আবার থানা এলাকা পরিদর্শনের জন্য বের হন। থানার তিনজন পরিদর্শকের একজন সব সময় থানায় উপস্থিত থাকতে হয়। যার ওপরে ওসি দায়িত্ব ন্যস্ত করে যান। তবে ওসি ছাড়া বাকি দুজন পরিদর্শককে বাইরের বিভিন্ন ডিউটি করতে হয়। এর জন্য তাদের ওভারটাইম ভাতাও দেওয়া হয় না। দিনের ২৪ ঘণ্টায় কর্মরত থাকেন তারা। একমাত্র অসুস্থতা ও ছুটি ছাড়া বাসায় অবস্থানের কোনো জিডি করতে পারেন না তারা। জিডিতে বিশ্রামের কথা উল্লেখ করলে- সেটাকে অসদাচারণ বা কর্তব্যে অবহেলা হিসেবে গণ্য করা হয়। এই জন্য একজন অফিসারকে তিরস্কারের মুখোমুখিও হতে হয়।

১০ বছর ধরে একই পদে চক্কর : পরিদর্শক পদমর্যাদার অপর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘২০০৫ সালে পুলিশে এসআই পদে ভর্তি হন তিনি। ওই বছরই নিয়োগ পান বিসিএস ২৪ ব্যাচের কর্মকর্তারা। এসআই থেকে ২০১৬ সালে পরিদর্শক হিসেবে পদোন্নতি পাই।’ তিনি আরও এরপর ১০ বছর শেষ এই পদেই চক্কর খাচ্ছি। আর ২৪ ব্যাচের কর্মকর্তারা চারটি পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে অতিরিক্ত ডিআইজি হয়েছেন। পরিদর্শকদের ব্যাচ ধরে পদোন্নতির চক্করে জীবনে হয়তো শেষ সম্মান পাওয়া হবে না। ২০০৫ এসআই ব্যাচের আগে এখনো আরও তিনটি ব্যাচের পদোন্নতি বাকি রয়েছে। এসবিতে কর্মরত এক পরিদর্শক বলেন, এখানে ৯টা ৪টা অফিস করতে হয়। কিন্তু কোনো ধরনের অতিরিক্ত ভাতা পান না তারা। পুলিশে এটা বড় ধরনের ‘বৈষম্য’। একই পদমর্যাদা হয়েও থানার পরিদর্শকরা সোর্স মানি পাচ্ছেন অথচ অন্য ইউনিটে দায়িত্বরতরা তা পাচ্ছেন না। আশ্চর্যের বিষয় হলো পরিদর্শক ও এএসপি একই গ্রেডের অফিসার হওয়ার পরও বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, পেশাদারিত্বের জায়গায় থেকে পুলিশের এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিদর্শক ও এসআই যারা কাজ করেন, তাদের জন্য যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকা দরকার তা নেই। এ ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো দেশে পুলিশের ২৪ ঘণ্টা কাজ করবে এই নিয়ম নেই। তারা যেই ধরনের শারীরিক ও মানসিক চাপ যায় এতে এই কর্মকর্তারা ট্রমার মধ্যে থাকেন। তারা সব সময় উদ্বিগ্নœœ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকেন। এতে জনগণের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে না। তিনি বলেন, একজন মানুষ হিসেবে এসব কর্মকর্তার মৌলিক প্রয়োজনীয়তা (বিশ্রাম ও খাদ্য) পূরণ করতে পারে না। এর প্রভাবে একজন কর্মকর্তার পেশাদারিত্বের সঙ্গে থানায় তার প্রত্যাশিক সেবা দিতে পারে না। পুলিশে এই সিস্টেম একটা অপেশাদারিত্ব ব্যবস্থাপনা। প্রতিটি মানুষের জন্য যেমন নির্দিষ্ট ৮ ঘণ্টা ডিউটি। এটা পুলিশের ক্ষেত্রেও নিশ্চিত করতে হবে। এখনই যদি এটা ঢেলে সাজানো না হয়, তাহলে তার কাছ থেকে জনগণ প্রত্যাশিত সেবা পাওয়া সম্ভব হবে না।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাহিনীতে একটি নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসা দরকার। পুলিশ আইনে (পিআরবি-২২ ধারা) বলা আছে, পুলিশ কতটুকু দায়িত্ব পালন করবে, কীভাবে করবে। বাহিনীর নিয়ন্ত্রক যারা আছেন তাদের এটা কঠোরভাবে পালন করতে হবে। যারা একজন পুলিশ সদস্যকে এভাবে কাজ করায়, তারা নিয়মবহির্ভূত কাজ করছে।