জাতীয় রাজনীতিতে একসময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন করা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির সম্প্রতি দেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মুখোমুখি অবস্থান ও সহিংসতার ঘটনায় সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) প্রশ্ন উঠেছে, ক্যাম্পাসের বর্তমান রাজনৈতিক দৃশ্যপট কি সত্যিই একটি সুস্থ সহাবস্থানের মডেল, নাকি ওপরের শান্ত ভাবমূর্তির আড়ালে চলছে প্রভাব বিস্তার ও আধিপত্যের সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক লড়াই? চব্বিশের ৫ আগস্টের পর শাবিপ্রবিতে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্র ইউনিয়ন ও নতুন আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় ছাত্রশক্তিসহ একাধিক সংগঠনের উপস্থিতি রয়েছে। তবে ক্যাম্পাসের সার্বিক পরিস্থিতি অনুসন্ধানে উঠে এসেছে পারস্পরিক অবিশ্বাস, সাইবার স্পেসে প্রোপাগান্ডা, ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ পরিচয়ের আড়ালে রাজনীতি এবং কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) ঘিরে দ্বিমুখী অভিযোগের জটিল সমীকরণ।
শাকসু স্থগিত ও হলের সিট : ক্যাম্পাসের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচন। ছাত্রশিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির অভিযোগ, ছাত্রদলের প্রত্যক্ষ মদদে শাকসু নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তবে এই অভিযোগ কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন শাবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাঈম সরকার। তার পাল্টা দাবি, ‘শাকসু স্থগিত করার সব প্রেক্ষাপট ইসলামী ছাত্রশিবির এবং তাদের সহযোগী প্রশাসনই রচনা করেছিল।’
অন্যদিকে, হলের নিয়ন্ত্রণ ও সিট বরাদ্দ নিয়েও রয়েছে পুরনো ক্ষোভ। গত বছরের ২৬ আগস্ট সাধারণ শিক্ষার্থীদের ‘ছাত্রলীগ’ ট্যাগ দিয়ে হল থেকে বের করে দেওয়ার পেছনে ছাত্রশিবিরের ক্যাডাররা ছিল বলে অভিযোগ এনে গত ৭ মে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে তদন্ত দাবি করে ছাত্রদল। শিবিরের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতিবাদ জানানো হলেও, হলে সিট বরাদ্দের স্বচ্ছতা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও প্রশ্ন রয়েছে।
সাধারণ শিক্ষার্থী বনাম দলীয় পদবি : জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসে লেজুড়ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবিতে যারা মিছিল মানববন্ধন করেছিলেন, তাদের একটি অংশ পরবর্তীতে জাতীয় ছাত্রশক্তির কমিটিতে পদ পাওয়ায় নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ছাত্রদলের সভাপতি রাহাত জামান বিষয়টিকে ‘একপ্রকার ভ-ামি’ উল্লেখ করে বলেন, ‘ছাত্রশক্তির বর্তমান নেতৃত্বের অনেকেই অতীতে রাজনীতির বিরোধিতা করেছিলেন, এখন তারাই পদ নিয়ে রাজনীতি করছেন।’
অভিযোগের জবাবে জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক রাশিদ আবরার বলেন, ‘৫ আগস্টের পর তৎকালীন প্রশাসন দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিল। তখন শুধু ছাত্রশক্তি নয়, ছাত্রদল-শিবিরের অনেকে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরাও লেজুড়বৃত্তির বাইরে এসে শিক্ষার্থীদের কল্যাণের রাজনীতি চেয়েছিল। পরে প্রশাসন সব সংগঠনের সঙ্গে বসে রাজনীতি উন্মুক্ত করেছে।’
সাইবার স্পেসে বট বাহিনী ও বুলিং : ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক লড়াই এখন শুধু মাঠে নয়, ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। শাবিপ্রবি ছাত্র ইউনিয়নের সংগঠক নাজনীন লিজার মতে, ছাত্রদল রাজনৈতিক যুক্তিতে কথা বলতে চাইলেও, ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির একটি অংশ উগ্র আচরণ করে। লিজা অভিযোগ করেন, ‘আমরা কোনো ইস্যুতে কথা বললে ছাত্রশিবির তাদের ‘বট বাহিনী’ দিয়ে সাইবার আক্রমণ চালায়।’
শাবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি মাসুদ রানা তুহিনের বক্তব্য, ‘অন্যের পেছনে লেগে থাকার মতো সময় আমাদের নেই। শিবিরের ছাত্রকল্যাণমূলক কাজের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়েই তারা এসব বলছে।’
শিক্ষার্থীরা জানান, প্রকাশ্যে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে এখনো পুরোপুরি ভয়মুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়নি। ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী আল আমিন বলেন, ‘কোনো মতামত নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিপক্ষে গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে অশ্লীল ভাষায় আক্রমণ করা হয়। ফলে ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত সুরক্ষার কথা ভেবে অনেকেই চুপ থাকেন।’
রাজনৈতিক কৌশল : সমাজসেবা ও অধিকার ইস্যু
ক্যাম্পাসে প্রভাব বজায় রাখতে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নিয়েছে সংগঠনগুলো। শাকসু ও হলকেন্দ্রিক কাজ থমকে গেলেও ছাত্রশিবির ১ লাখ ও ২ লাখ টাকার শিক্ষাবৃত্তিসহ বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। ছাত্রদল প্রোপাগান্ডার রাজনীতি এড়িয়ে হলের অধিকার ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ইস্যু নিয়ে কাজ করে গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের চেষ্টা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, জাতীয় ছাত্রশক্তি মাঠে সরব থাকলেও তাদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসে সহনশীলতা নেই এবং একটি বিশেষ গোষ্ঠী ক্ষমতার বলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বিনষ্ট করছে। আর ছাত্র ইউনিয়ন একাডেমিক চাপ এবং নতুন প্রশাসনের ‘ডানপন্থি ব্যাকগ্রাউন্ডের প্রতি পক্ষপাতিত্বের’ অভিযোগ তুলে আপাতত মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মসূচির চেয়ে বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ রয়েছে।
সাধারণ শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের ভাবনা
তেল ও জ্বালানি প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী মুহয়ী শারদ বর্তমান পরিস্থিতির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই দিকই তুলে ধরে বলেন, ‘ক্যাম্পাসে এখন কথা বলার জায়গা তৈরি হয়েছে, যা গুণগত পরিবর্তন। তবে তিন বিষয়ে উদ্বেগ আছে কোনো একক স্বৈরাচারী শক্তির উত্থান, বেনামে রাজনীতি এবং বাকস্বাধীনতা হরণ।’
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে ক্যাম্পাসে কোনো দৃশ্যমান সহিংসতা নেই। তবে ছাত্রসংগঠনগুলোকে হল দখল বা আধিপত্য বিস্তারের পুরনো চর্চা থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীবান্ধব সংগঠনে রূপান্তরিত হতে হবে। আবাসন, পরিবহন ও খাবারের মতো মৌলিক সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করাই তাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।’