মার্লিন বাই বোলা: শেন ওয়ার্নকে রুখতে তৈরি যন্ত্র এখন মিরপুরে

উপমহাদেশের কন্ডিশন মানেই স্পিনারদের রাজত্ব। এখানকার ব্যাটাররা সাধারণত নেটে পেস বোলিং মেশিনের বিপক্ষে অনুশীলন করতেই বেশি অভ্যস্ত।বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের চাকরি ছেড়ে যাওয়ার আগে 'স্পিন বোলিং মেশিনের' গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছিলেন নিক পোথাস। তার বিদায়ের পর তাৎক্ষণিকভাবে না হলেও, অবশেষে সেই স্পিন বোলিং মেশিন এনেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। যার নাম মার্লিন বাই বোলা।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সাদা বলের দুই সিরিজ শুরুর আগে চলমান অনুশীলন ক্যাম্পে সোমবার প্রথম এই স্পিন বোলিং মেশিন ব্যবহার করা হয়। যা দিয়ে নিজেদের পছন্দমতো অফ স্পিন, লেগ স্পিন বা স্ট্রেইট ডেলিভারির অনুশীলন করতে পেরেছেন ব্যাটাররা।

এই মেশিনটির জন্মই হয়েছিল ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্পিনার শেন ওয়ার্নকে রুখে দেওয়ার জন্য। ২০০৫ অ্যাশেজের আগে ইংল্যান্ড দল যখন ওয়ার্নের লেগ-ব্রেক আর গুগলিতে দিশেহারা, তখন তার বলের ঘূর্ণন, গতি ও অ্যাঙ্গেল হুবহু নকল করার লক্ষ্যেই এই ‘মার্লিন’ তৈরি করা হয়। ইংলিশ ব্যাটাররা এটি ব্যবহার করে সেবার দারুণ সুফল পেলেও খোদ শেন ওয়ার্ন ছিলেন এর কট্টর সমালোচক। ওয়ার্ন ও তার মেন্টর টেরি জেনার এই যান্ত্রিক অনুশীলনকে হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। জেনার তো মন্তব্য করেছিলেন যে, এই মেশিনে অনুশীলন করা আর ‘মূর্তির সাথে প্রেম করা’ একই কথা; কারণ যন্ত্র কখনোই একজন বোলারের আঙুলের কারসাজি বা বল ছাড়ার মুহূর্তের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের বিকল্প হতে পারে না। তবে ওয়ার্নের সেই তাচ্ছিল্য সত্ত্বেও অ্যাশেজ জয়ে মার্লিন যে ইংল্যান্ডকে একটি বাড়তি সুবিধা দিয়েছিল, তা আজ অনস্বীকার্য।

প্রায় ১৬ লাখ টাকা মূল্যের এই যন্ত্রটি ইংল্যান্ড থেকে জাহাজে করে আনা হয়েছে। মেশিনটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিসিবির ক্রিকেট অপারেশন্স ইনচার্জ ও জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার শাহরিয়ার নাফীস জানান, "আমাদের ব্যাটাররা অনেক সময় কোয়ালিটি স্পিন, বিশেষ করে রিস্ট স্পিনারদের ডেলিভারি রিড করতে সমস্যায় পড়ে। উপমহাদেশে সাধারণত স্পিনার অনেক থাকলেও, মানসম্মত লেগ স্পিনারদের বিপক্ষে একটানা এক জায়গায় বল খেলে যাওয়ার সুযোগ সবসময় থাকে না। এই মেশিন সেই অভাব পূরণ করবে।"

মিরপুরে হেড কোচ ফিল সিমন্স ঠিক করে নিচ্ছেন মার্লিন বাই বোলা

তিনি আরও যোগ করেন, সাধারণত পেস বোলিং মেশিনগুলো বল সুইং বা বাউন্স করানোর জন্য ব্যবহৃত হয়, কিন্তু মার্লিনের মেকানিজম সম্পূর্ণ আলাদা। নাফীস জানান, "এটা দিয়ে অফ-স্পিন, লেগ-স্পিন এবং সোজা বল করা যায়। ডানহাতি বোলারের অফ-স্পিন যেমন পাওয়া যাবে, তেমনি বাঁহাতি বোলারের জন্য চায়নাম্যান ডেলিভারিও সেট করা সম্ভব। এখানে লেন্থ চেঞ্জ করা যায় এবং বলের গতিও পুরোপুরি কন্ট্রোল করা যায়। আপনি চাইলে নির্দিষ্ট একটি অ্যাঙ্গেলে সেট করে দিলে সেটি টানা ২৫-৩০টি বল একই জায়গায় নির্ভুলভাবে করবে। এটি দুইভাবে অপারেট করা যায়। ম্যানুয়ালি যেমন চালানো সম্ভব, তেমনি কোচ বা সাপোর্টিং স্টাফ না থাকলেও অটো টাইমার সেট করে একা একা অনুশীলন করা যায়।"

প্রথমবার বোলা মেশিন দিয়ে স্পিন বোলিং অনুশীলন করেন ক্রিকেটাররা

সাধারণত ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের মতো দেশে এই মেশিনের প্রচলন বেশি, কারণ সেখানে নেটে ভালো মানের স্পিনার পাওয়া কঠিন। বাংলাদেশে স্পিনার অনেক থাকলেও শাহরিয়ার নাফীস মনে করেন, নির্দিষ্ট লাইন-লেন্থে টানা অনুশীলন করে স্কিল বাড়ানোর জন্য এই আধুনিক প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে বিদেশের মাটিতে বড় টুর্নামেন্টের আগে মানসম্মত রিস্ট স্পিনারদের মোকাবিলার প্রস্তুতিতে এই ‘মার্লিন’ টাইগারদের বড় শক্তি হয়ে উঠবে বলে আশা করছে বিসিবি।

মোহাম্মদ রফিককে স্পিন বোলিং কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে বিসিবি। নাফীস জানালেন, রফিক জাতীয় দলের পাশাপাশি দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটেও কাজ করবেন। আজ সংবাদমাধ্যমকে বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের ইনচার্জ বলেন, ‘আমাদের রফিক ভাই বাংলাদেশের কিংবদন্তি বাঁহাতি স্পিনার। তাঁকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) স্পিন বোলিং কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। তিনি মূলত বিসিবির স্পিন বোলিং কোচ হিসেবে কাজ করবেন। তার বিশেষ কোনো দল নাই। এ ব্যাপারে আসলে সবার একটু ভুল ধারণা আছে। তিনি হয়তো শুধুমাত্র জাতীয় দলের জন্য কাজ করবেন, ব্যাপারটা এরকম না। তাঁর কাজ হচ্ছে মেন্টর হিসেবে তিনি বিভিন্ন দলের সঙ্গে কাজ করবেন। জাতীয় দল, অনূর্ধ্ব-১৯, এইচপি, টাইগার্সও হতে পারে।’