সুন্দরবনের নীলাম্বরী

বিরল সুন্দরী হাঁস, বেলাই ভুতুম প্যাঁচা, বড় গেছে প্যাঁচা ও বাদাবন শিসমারসহ বেশকিছু পাখির সন্ধানে সুন্দরবনের কালাবগী, শেখেরটেক, কোকিলমণি, পক্ষীরখাল হয়ে চতুর্থ দিন বিকেলে করমজল ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের পন্টুনে এসে ছোট্ট লঞ্চ ‘আলোর কোল’ থামল। ২০১৭ সাল থেকে এই লঞ্চটিতে করে সুন্দরবনের পাখি-প্রাণী পর্যবেক্ষণ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। ঘন কুয়াশার কারণে করমজল পৌঁছতে বেশ দেরি হয়ে গেছে। হাতে সময় মাত্র এক ঘণ্টা। এই সময়ের মধ্যে যতটুকু দেখা যায়। কাজেই হরিণ ও কুমির প্রজননকেন্দ্র পার হয়ে দ্রুত কাঠের রাস্তায় উঠে গেলাম।

 রাস্তায় উঠে প্রথমেই দেখা হলো অল্পবয়সী সাপখেকো খোঁপাবাজের সঙ্গে। যদিও সুন্দরবনের প্রতিটি অভিযানেই বয়স্ক খোঁপাবাজের সঙ্গে বহুবার দেখা হয়েছে। কিন্তু অল্পবয়সী পাখির সঙ্গে এই নিয়ে মাত্র দুবার দেখা হলো। তবে এবার ওর বেশ কিছু সুন্দর ছবি তুললাম। দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে চললাম। হঠাৎ কোত্থেকে একগুচ্ছ নীল যেন একটি গাছের ঘনপাতার ভেতরে ঢুকে গেল! গাছের ঘনপাতার আলো-ছায়ায় খেলা করতে থাকায় প্রথমে ক্যামেরার ফ্রেমে ওকে ধরতে পারছিলাম না। কিন্তু খানিকটা সময় যেতেই ও ঘনপাতার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে ডালে বসল। আর তখনই অতি সুন্দর নীলচে পাখিটিকে চিনতে পারলাম। তবে সূর্যের আলোর বিপরীতে বসায় ওর ভালো ফ্রেম পাওয়া যাচ্ছিল না। চঞ্চল পাখিটি সম্ভবত পোকা ধরার জন্য এখানে এসেছে। ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে ক্লিক করে চললাম। খানিক পরে আলোর দিকে আসতেই দ্রুত কয়েকটা শট নিলাম। এরপর ও বনের গহিনে হারিয়ে গেল। ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে ৫টার ঘটনা এটি। অতি সুন্দর পাখিটিকে জীবনের প্রথম দেখেছিলাম ২০১১ সালের জানুয়ারিতে আমার কর্মস্থল গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ev r| gvmwmK¨vwcwW () †Mv‡Îi cvwLwUi ˆeÁvwbK bvg 

নীলচে-সবুজ পালকে আচ্ছাদিত অতি সুন্দর যে পাখিটির কথা এতক্ষণ বললাম সে এদেশের সচরাচর দৃশ্যমান পরিযায়ী পাখি নীলাম্বরী। নীল-কটকটিয়া, নীল চটক, আকাশি চটক বা অম্বর চটক নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম erditer Flycatcher বা Asian Verditer Flycatche। মাসসিক্যাপিডি (Muscicapidae) গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Eumyias thalassin (ইউমিয়াস থ্যালসিনা)। মূলত হিমালয়ের বাসিন্দা হলেও ভারতের অন্যান্য অংশ, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ দক্ষিণ, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিভিন্ন দেশে পাখিটি বিস্তৃত।

নীলাম্বরীর দেহের দৈর্ঘ্য ১৫-১৭ সেন্টিমিটার। ওজন মাত্র ১৫-২০ গ্রাম। পুরুষ পাখির পুরো দেহ নীল-সবুজ বা ফিরোজা-নীল। মাথা ও গলা উজ্জ্বল নীল। ডানা ও লেজ গাঢ় নীল। লেজ লম্বা। চোখে কাজল দেওয়া ও চোখের সামনের অংশ কালচে। লেজের তলা ধূসর। স্ত্রী পাখিটি পুরুষের তুলনায় বেশ মলিন। তবে উভয়েরই চোখ কালচে-বাদামি এবং ঠোঁট, পা, পায়ের পাতা ও নখ কুচকুচে কালো। মুখের চামড়া হলদে-গোলাপি। অল্পবয়সী পাখির পিঠ বাদামি-ধূসর ও বুক-পেট বাদামি তিলযুক্ত।

শীতে পাখিটিকে এদেশের প্রায় সব বিভাগেই দেখা যায়। মুক্ত বন, বনের ধার, বাগান, চষাজমি, গরাণ বন, জলাধারের পাশের ঝোপ ইত্যাদিতে বিচরণ করে। এরা বেশ আমুদে পাখি। সচরাচর একাকী ও প্রজনন মৌসুমে জোড়ায় থাকে। পতঙ্গভোজী পাখিটি মূলত উড়ে উড়ে কীটপতঙ্গ শিকার করে। তবে অন্যান্য অমেরুদ-ি প্রাণী এবং ছোট ছোট ফলও খায়। সচরাচর ‘টিঝি-জু-জুই’ স্বরে ডাকে ও গাছের মগডালে বসে ‘পিটিটিটি-ওউ-পিটিটি-ওইউ..’ স্বরে গান গায়।

এপ্রিল থেকে আগস্ট প্রজননকাল। এ সময় এদের মূল আবাসস্থানের কোনো গাছের ফাঁক-ফোকর, দেয়ালের ফাটল বা পুরনো গাছের মধ্যে গজানো শৈবাল-ফার্নের ঝাড়ে পেয়ালা আকারের বাসা বানায়। বাসার ভেতরটায় ক্ষুদ্র শিকড় ও শুকনো ঘাস দিয়ে গদি বানায়। স্ত্রী পাখি ৩-৫টি হালকা গোলাপি বা দুধের সররঙা ডিম পাড়ে। বাসা বানানো, ডিমে তা দেওয়া ও বাচ্চা লালন-পালন স্ত্রী-পুরুষ দুজনে মিলেই করে। ডিম থেকে ছানা ফুটে বের হতে ১২-১৪ দিন সময় লাগে। আয়ুষ্কাল প্রায় চার বছর।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়