মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটে পড়ে বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও নিত্যদিনের অর্থনৈতিক সমস্যা দিন দিনই প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ শিল্প। উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ায় পরিবারে আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। চারদিকে দুশ্চিন্তার ছায়া। সব উৎপাদন সেক্টর চাপে পড়ে প্রায় নাস্তানাবুদ। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শিল্প উৎপাদন হতাশ করছে। গার্মেন্ট সেক্টরে রপ্তানি-সংকট। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রে হতাশা নেমে আসতে পারে যেকোনো সময়। এসব চ্যালেঞ্জের মুখে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার। যেসব প্রণোদনামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার, তা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ ড. আনু মুহাম্মদ বলেছেন, মূলত অতীতের সরকারের ভুল নীতি, জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকা- এবং কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার জন্য, দেশের জ্বালানি খাত অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভর ও বিদেশি ঋণনির্ভর হওয়ায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে চাপ আরও বেড়েছে। সরকারকে সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।
আমরা তার মতের পক্ষে এটা বলতে চাই যে, জ্বালানি সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে তেল সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। সেই পদক্ষেপে জ্বালানি ব্যবহারে ব্যক্তিগত পরিবহনে রেশনিং করা জরুরি। এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকে সীমিত করতে হলে, নাগরিকদের সংকট উপলব্ধি করতে হবে। পরিবহন বাসগুলোকে সাশ্রয়ী মনোভাব নিতে হবে। শিল্প সেক্টরে ব্যবহৃত ট্রাক, লরি ও কাভার্ড ভ্যানগুলোর অতিজরুরি না হলে, তার জন্য জ্বালানি সংগ্রহ বাদ রাখতে হবে। আর যারা তেল চোরাইপথে পাচার করে, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। আমরা লক্ষ করেছি, দেশের বিভিন্ন এলাকায় তেল মজুদ রেখে সংকটকে ঘনীভূত করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের তৎপরতায় অনেক তেল মজুদকারীর হাতে থাকা ড্রাম উদ্ধার করেছে। এতদিন ডিজেলের তেমন কোনো সংকট ছিল না। সংকট তৈরি হয়েছিল অকটেন ও পেট্রোলে। কিন্তু এখন ডিজেল নেওয়ার প্রতিযোগিতায় মোটরবাইক ও কারগুলোর নাভিশ্বাস লক্ষ করলেই বোঝা যাবে, তারা নিত্যদিনের প্রয়োজনের চেয়ে অধিকমাত্রায় তেল সংগ্রহ করে রেখে দিচ্ছেন। এই প্রবণতাই মূলত তেল সংকটকে ঘনীভূত করেছে। গাড়ি মালিক ও চালকদের মধ্যে সবুর বিষয়টি নেই। প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল নিয়ে তারা সংরক্ষণ করে পরিস্থিতিকে নাজুক করেছে। তাদের মধ্যে সচেতনতা, দায় ও ন্যায়বোধের উন্মেষ না হলে, কোনোভাবেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না।
সরকারি ও বেসরকারি সব রকম গাড়ির জন্য এখনই রেশনিং চালু করা উচিত। যে পর্য়ন্ত মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ-সংঘাত বন্ধ না হবে, যে পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পরিপূর্ণভাবে খুলে দেওয়া না হবে, ততদিন পর্যন্ত রেশনিং চলবে। ততদিন পর্যন্ত সাশ্রয়ী হতে হবে সাধারণ মানুষকে। অগ্রগণ্য হিসেবে তেল পাবে কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ খাত। এই তিনটিই উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। আর উৎপাদন ঠিক রাখতে না পারলে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঠিক রাখা যাবে না। শিল্প সেক্টরে বিনিয়োগ না হলে যেমন কর্মসংস্থান হবে না, তেমনি রপ্তানি পণ্যের চালান ঠিক সময়ে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। সরকার কীভাবে এই কাজগুলো দক্ষতার সঙ্গে করবে, তা বিশেষজ্ঞরা ভালো বলতে পারবেন। আমরা বলতে চাই, এসব সেক্টরের বিশেষজ্ঞদের একই ছাতার নিচে এনে, জরুরি ভিত্তিতে পরামর্শ করা যেতে পারে। সরকারের পাশাপাশি তাদেরও দায়দায়িত্ব রয়েছে এ বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসার জন্য। সরকার সেই পথ ধরে, পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।