মিথ্যার ফুলঝুরি ট্রাম্পের

ইরান যুদ্ধ ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে একের পর এক মিথ্যার ফুলঝুরি ছুটিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই যুদ্ধকে প্রতিষ্ঠিত করতে একের পর এক মিথ্যা বলে গেছেন ট্রাম্প। গত সোমবার ট্রাম্প তার সংবাদ সম্মেলনে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ও পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয় নিয়ে বেশ কিছু মিথ্যা দাবি করেছেন। সিএনএন তার বক্তব্যগুলো যাচাই করে দেখেছে। সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প এমন কয়েকটি দাবিও করেছেন, যেগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি তিনি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু, তেলক্ষেত্র এবং পানি শোধনাগারেও হামলা চালাতে পারেন বলে জানিয়েছেন। ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ করা নিয়ে ‘তিনি মোটেও’ চিন্তিত নন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব বেসামরিক স্থাপনায় হামলা যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী অবৈধ। জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমি এ নিয়ে উদ্বিগ্ন নই।’ তিনি সাংবাদিকদের আরও বলেন, আসল যুদ্ধাপরাধ হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র পেতে দেওয়া।

ট্রাম্প বরাবরই মিথ্যা বলে থাকেন; সোমবারের সংবাদ সম্মেলনেও তার ব্যত্যয় হয়নি। ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন, ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশ কুয়েত ভুলবশত গুলি করে তিনটি বিমান ভূপাতিত করেছিল। তার দাবি, শুধুমাত্র এই বিমানগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ ওই সংবাদ সম্মেলনের মূল আলোচ্য বিষয়ই ছিল ইরানে বিধ্বস্ত যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানের দুই আরোহীকে উদ্ধার করা প্রসঙ্গে। গত সপ্তাহে ইরানের গুলিতে এফ-১৫ই ইগল স্ট্রাইক যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হওয়ার কথা ট্রাম্প নিজেও উল্লেখ করেছিলেন। পাশাপাশি জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করেন, যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ ক্রুকে উদ্ধারে অভিযান চলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের একটি এ-১০ থান্ডারবল্ট-২ বিমানও ধ্বংস হয়েছে। এ ছাড়া সৌদি আরবের একটি ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় ই থ্রি সেনট্রি বিমান ধ্বংস হয়েছে। সবমিলিয়ে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ৮টি বিমান ইরানের আঘাতের মুখে পড়েছে।

ট্রাম্প বরাবরের মতো আবারও মিথ্যা দাবি করেছেন, তিনি আটটি যুদ্ধ থামিয়েছেন। অথচ আটটি যুদ্ধ বলতে তিনি যেসব পরিস্থিতির কথা বলে থাকেন, তার মধ্যে দুটি পরিস্থিতি আসলে যুদ্ধই ছিল না। সেগুলো হলো মিসর ও ইথিওপিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক বিবাদ এবং সার্বিয়া ও কসোভোর মধ্যকার বিরোধ। এ ছাড়া তার উল্লিখিত যুদ্ধগুলোর মধ্যে অন্তত একটি যুদ্ধ বাস্তবে শেষ হয়নি। সেটি হলো রুয়ান্ডা ও কঙ্গো গণপ্রজাতন্ত্রের যুদ্ধ। অতীতে বিভিন্ন সময়ে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাচ্যুত নেতা নিকোলাস মাদুরো তার শাসনকালে কারাগার থেকে হাজার হাজার মানুষকে মুক্তি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দিয়েছেন। যদিও ট্রাম্প ও তার কর্মকর্তাদের কেউ এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি। এমনকি ভেনেজুয়েলা-বিষয়ক বিশেষজ্ঞরাও এ দাবির ভিত্তি খুঁজে পাননি। ট্রাম্প আবারও দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতির সংখ্যাটা অতিরঞ্জিত করে বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ৪৫ হাজার সেনা দক্ষিণ কোরিয়ায় আছে।’ তিনি একই সংখ্যা বারবার উল্লেখ করেন। বাস্তবে ২০২৫ সালের শেষ দিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় মাত্র ২৬ হাজার ৭২২ জন সামরিক কর্মী অবস্থান করছিলেন। এর মধ্যে ২৩ হাজার ৪৯৫ জন সক্রিয় দায়িত্বে ছিলেন।

ট্রাম্প আবারও দাবি করেছেন, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস ‘সীমান্তে সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকার পরও কখনো সীমান্তে যাননি’। ট্রাম্পের এ দাবিও মিথ্যা। দায়িত্ব পালনকালে কমলা হ্যারিস দুইবার সীমান্তে গিয়েছেন ২০২১ এবং ২০২৪ সালে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সময়কার হোয়াইট হাউজ কর্র্তৃপক্ষ বলেছে, কমলা হ্যারিস কখনো সীমান্ত নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন না। ২০০০ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ে তিনি নাকি আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্র্তৃপক্ষের হত্যা করা উচিত বলে মত দিয়েছিলেন। সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে তিনি আবারও সেই মিথ্যা দাবি করেছেন। আদতে ওই বইতে লাদেনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয় তো দূরে থাক, তাকে কীভাবে মোকাবিলা করা যাবে, সে সম্পর্কিত কোনো পরামর্শও ছিল না। বইটিতে বিন লাদেনের নাম একবার মাত্র উল্লেখ করা হয়েছে।