হান্নানের জ্বালানি সাশ্রয়ী জেনারেটর

ফেনী সদর উপজেলার বালিগাঁও ইউনিয়নের ধোনসাদ্দা গ্রামের ছেলে আবদুল হান্নান। ২০০০ সালে এসএসসির পর পড়াশোনা বাদ দিয়ে আয় রোজগারে নেমে পড়েন দরিদ্র পরিবারের সন্তান হান্নান। স্থানীয় বাজারে মিল্লাত কম্পিউটার নামের একটি দোকান খুলে সেখানে জেনারেটর সার্ভিস, ফটোকপি ও কম্পিউটার কম্পোজের কাজ করেন। মাঝে ঘনঘন বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হওয়ায় তার জেনারেটর ব্যবসায় লোকসান দেখা দেয়। ফলে তিনি জ্বালানি-সাশ্রয়ী জেনারেটরের পদ্ধতি খুঁজতে থাকেন। ১৬ বছরের চেষ্টা ও সাধনার পর ২০২৫ সালের শেষের দিকে জেনারেটরে জ্বালানি সাশ্রয়ী পদ্ধতির উদ্ভাবনে সফলতা পান তিনি।

হান্নানের উদ্ভাবিত এ পদ্ধতিতে জেনারেটর চালালে প্রায় ৩০ ভাগ জ্বালানি সাশ্রয় হবে বলে দাবি করেছেন তিনি। ইতিমধ্যে তার উদ্ভাবিত পদ্ধতিটি শিল্প মন্ত্রণালয়ের স্বীকৃতি পেয়েছে এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এ পরীক্ষিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের এ সময়ে তার এ উদ্ভাবনে আশা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

জেনারেটরে প্রচলিত যে পদ্ধতিতে জ্বালানি ব্যবহার করা হচ্ছে তাতে প্রচুর অপচয় হয়ে থাকে। কিন্তু হান্নানের উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে প্রায় ৩০ ভাগ জ্বালানি অপচয় রোধ করা যাচ্ছে। হান্নান দাবি করেন, দেশে ছোট-বড় বিভিন্ন মিল, কারখানায় যে পরিমাণ ডিজেল অয়েল, ফার্নেস অয়েল ও গ্যাসভিত্তিক জেনারেটর ব্যবহার হয় এতে তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে বছরে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব হবে।

তবে উদ্ভাবিত প্রকল্পটি নিয়ে আরও উচ্চতর গবেষণার জন্য যে পরিমাণ অর্থ, যান্ত্রিক সহায়তা, গবেষণাগার, যান্ত্রিকবিদ, পরিবেশ প্রয়োজন তার কোনোটিই নেই হান্নানের কাছে।

গত ৯ মার্চ শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ৪৮ পৃষ্ঠার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ওই প্রজ্ঞাপনের ৪৫ নম্বর পৃষ্ঠায় আবদুল হান্নানের জালানি-সাশ্রয়ী উদ্ভাবনের স্বীকৃতি ঘোষণা করা হয়। ওই ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, আবদুল হান্নানের উদ্ভাবনটি একটি উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন-ব্যবস্থা। সিস্টেমটি পেট্রোল, ডিজেল, গ্যাস এবং স্টিম ইঞ্জিনের জন্য প্রযোজ্য এবং সিনক্রোনাস জেনারেটর, অল্টারনেটর ও পার্মানেন্ট-ম্যাগনেট জেনারেটরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা জেনারেটরের সব কনফিগারেশনে উন্নত দক্ষতা এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী কার্যকারিতা নিশ্চিত করে।

এদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) আবদুল হান্নানের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি যাছাই- বাছাই করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগ থেকে অধ্যাপক ড. ইহসান ও ড. মো. মামুন স্বাক্ষরিত ‘ফারমেন্স কম্পারিজন বিটুইন জেনারেটর ওয়ান অ্যান্ড জেনারেটর টু’ নামে ছয় পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দেয়। ওই প্রতিবেদনের ৫ নম্বর পৃষ্ঠায় আব্দুল হান্নানের জ্বালানি প্রযুক্তির বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রচলিত সিষ্টেমে প্রতি এক ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে খরচ হয় ৪৮৩ গ্রাম জ্বালানি। অপরদিকে আব্দুল হান্নানের উদ্ভাবিত প্রযুক্তিতে প্রতি এক ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে খরচ হয় ৩৫৭ গ্রাম জ্বালানি। অর্থাৎ প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে হান্নানের প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ১২৬ গ্রাম জ্বালানি সাশ্রয় হয়।

আবদুল হান্নান বলেন, ‘শুরুতে আমি জেনারেটরের কিছু অল্টারনেটর তৈরি করি। এগুলো জেনারেটরে বারবার পরীক্ষা করলাম। এটা করতে গিয়ে আমাদের প্রচলিত জেনারেটর পদ্ধতির কয়েকটি ফল্ট আমার নজরে আসে। পরে আমি ছোট ছোট অল্টারনেটরগুলোতে প্রথমে ১০০ ওয়াট, ২০০ ওয়াট ও ৫০০ ওয়াট পর্যন্ত চেক করি। একপর্যায়ে আমি সেগুলো ডিজেল জেনারেটরে প্রয়োগ করি। কয়েকটি সেটআপ রেডি করে দেখি আমি প্রায় ৩০ ভাগ সাশ্রয়ী জ্বালানি পদ্ধতি পেয়ে গেছি। এরপর সেটাকে স্থায়ী রূপ দেওয়া শুরু করি।’

তিনি বলেন, ‘আমার মুরগির খামার ও দোকানে জেনারেটর সার্ভিসের জন্যই জালানি সাশ্রয়ের পদ্ধতি খুঁজতে খুঁজতে এ পদ্ধতিটি নিয়ে কাজ করি। ইলেকট্রিক, ইলেকট্রনিকস ও ইলেকট্র মেকানিকের ওপর অনলাইনে অনেক পড়াশোনা করে এ পদ্ধতিটি সফলতা পর্যন্ত নিয়ে আসি। আমার আত্মবিশ্বাস, নিরলস প্রচেষ্টা ও লেগে থাকার মানসিকতা আমাকে সফল করেছে।’

বর্তমানে প্রকল্পটিকে বড় পরিসরে গবেষণা করার জন্য সরকারি অথবা বেসরকারি পর্যায় থেকে সহায়তা চান এ উদ্যমী যুবক।

ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, ‘ফেনীর যুবকের বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী জেনারেটর আবিষ্কারের বিষয়টি শুনেছি। উদ্ভাবনী যেকোনো কার্যক্রমকে আমরা পৃষ্ঠপোষকতা করতে চাই। বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়ে উদ্ভাবনের যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তা নিরূপণ করে এটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে কাজে লাগানো যায় কি না তা দেখা হবে।’