ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির মৃত্যুর ৭ বছর পূর্ণ হয়েছে গতকাল শুক্রবার। সোনাগাজী ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করায় ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল তার গায়ে আগুন লাগানো হয়। ১০ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নুসরাত।
ওই বছর ২৪ অক্টোবর ফেনীতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ বহুল আলোচিত এ মামলায় অভিযুক্ত ১৬ আসামির মৃতু্যুদন্ড ও এক লাখ টাকা করে জরিমানার আদেশ দেন। মামলার রায় ঘোষণার ৭ বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত তা কার্যকর না হওয়ায় পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে চলছে অসন্তোষ।
নুসরাতের সপ্তম মৃতু্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। কবর জিয়ারতসহ স্থানীয় মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর তার মৃতু্যুর দিনে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কবরস্থানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানিয়েছিল। তবে এবার তাদের দেখা যায়নি।
আলোচিত এই হত্যাকান্ডের বিচার এখনো শেষ হয়নি। উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্সের শুনানি আটকে থাকায় বিচারপ্রক্রিয়া ঝুলে আছে। এতে হতাশা আর শঙ্কা কাটছে নুসরাতের পরিবারের। তাদের প্রশ্ন বিচার শেষ হতে আর কত অপেক্ষা করতে হবে? তবে এখনো পুলিশি পাহারায় দিন কাটে নুসরাতের পরিবারের। প্রতিদিন শিফট করে দুইজন পুলিশ তাদের বাড়ির সামনে পাহারায় থাকেন।
নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, ‘নুসরাতের মৃত্যু এখন স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছে আমাদের পরিবার। আমরা জানি আর ফিরে আসবে না নুসরাত। রায় কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছি।’ তার মা শিরিন আক্তারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি এখন মিডিয়ার সামনে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। নোমান বলেন, ‘সামাজিক মাধ্যমে আমাদের হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য আসামিদের স্বজনরা বিভিন্ন অপপ্রচার চালাচ্ছে। এতে আমরা শঙ্কিত।’
জানা যায়, সোনাগাজী ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ প্রত্যাহার না করায় ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে নুসরাতকে হত্যার চেষ্টা করে তার সহপাঠীরা। এতে তার শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তার মৃতু্যু হয়। এ ঘটনায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। ফেনী জেলা কারাগারের জেলার আফজল হোসেন বলেন, দন্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে একজন ফেনী জেলা কারাগারে আছেন। তাদের একজন মাকসুদ আলম, অন্য মামলায় হাজিরা থাকায় তাকে সেখানেই রাখা হয়েছে। বাকি আসামিরা কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন কারাগারে আছেন।
পিপি মেজবাহ উদ্দিন খাঁন বলেন, রায় ঘোষণার পর তা বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে অপরাধীদের মধ্যে উল্টো উৎসাহ তৈরি হতে পারে। তাই নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্সের শুনানি দ্রুত শেষ করে রায় কার্যকর করা জরুরি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত এ মামলার রায় কার্যকর হবে।
উল্লেখ্য, নুসরাত হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ-দৌলা, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, হাফেজ আব্দুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি ও মাদ্রাসার সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল আমিন, মহিউদ্দিন শাকিল ও মোহাম্মদ শামীম ।