হাওরে অচল ৪৫৫ কম্বাইন হার্ভেস্টার

নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে হাওরে শুরু হতে যাচ্ছে ধান কাটার উৎসব। এরই মধ্যে কোথাও কোথাও শুরু হয়েছে। তবে ধান কাটার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক কম্বাইন হার্ভেস্টারের (ফসল কাটার যন্ত্র) যোগানে ঘাটতি রয়েছে, যা এ সময়ে হাওরে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আবার যেসব যন্ত্র মাঠপর্যায়ে রয়েছে তার মধ্যেও প্রায় ৪৫৫টি হার্ভেস্টার মেরামতের অভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে। ফলে কৃষকদের মধ্যে দ্রুত ধান ঘরে তোলা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ডিএই সূত্রে জানা গেছে, হাওরভুক্ত ৭টি জেলার আবাদকৃত জমির পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার ১৮৩ হেক্টর। যেখানে শুধু হাওরগুলোতেই সাড়ে চার লাখ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। জেলার সব ধান দ্রুত কাটতে অন্তত ৭ হাজার ৪০৮টি কম্বাইন হার্ভেস্টর প্রয়োজন। যেখানে এসব এলাকায় সচল যন্ত্র আছে মাত্র ২ হাজার ৯৩০টি এবং মেরামতের অভাবে অচল অবস্থায় রয়েছে ৪৪৫টি। কৃষকরা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে অচল হার্ভেস্টার সচলের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে দ্রুত সময়ে ফসল ঘরে তোলা যেত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টায় ৪ থেকে ৫ হেক্টর জমির ধান কাটতে পারে একেকটি হার্ভেস্টার। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। একদিকে যেমন হার্ভেস্টার নস্ট হয়ে পড়ে আছে, অন্যদিকে বিভিন্ন জেলা থেকে হাওরে হার্ভেস্টার আসবে কি না তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। কারণ সারা দেশে যন্ত্র চালানোর তেল পাওয়া নিয়েও এক ধরনের অস্থিরতা রয়েছে। ফলে হাওরভুক্ত উপজেলাগুলোতে এবারের হার্ভেস্টারের ঘাটতি মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।

নেত্রকোনা খালিয়াজুরীর কৃষক রুস্তুম আলী জানান, তার একটি এমএম ওয়ার্ল্ড কম্বাইন হার্ভেস্টার রয়েছে। সেটির মেরামত চলছে তবে মেরামত করতে গিয়ে দেখেন অনেক খুচরা যন্ত্রাংশ ক্রয় করে হার্ভেস্টারটি সচল করতে হবে। খুচরা যন্ত্রাংশ পাওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যন্ত্রটির মেরামতের খরচ নিয়েও তার মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। শেষ পর্যন্ত এটি এই মৌসুমে চলবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় তিনি। 

হাওরগুলোতে এ ধরনের বহু কম্বাইন হার্ভেস্টার রয়েছে যারা দ্রুত কিছু খুচরা যন্ত্রাংশের সাপোর্ট পেলেই অচল যন্ত্র থেকে সচল করতে পারে। সুনামগুঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার আব্দুল হান্নান বলছেন সাপ্তহের ব্যবধানে এখানে ধান কাটা শুরু হবে। তবে আমার হার্ভেস্টারটি এখন নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। কিছু যন্ত্রাংশের সাপোর্ট পেলে অচল থেকে সচল করা সম্ভব হবে। শুধু আমার নয়, অনেকের যন্ত্রই এভাবে পড়ে আছে। কিন্তু এগুলো দ্রুত সারানোর মতো অবস্থা আমাদের এখানে নেই।

কৃষি বিভাগ বলছে, গত ২ বছর সরকার কম্বাইন হার্ভেস্টারসহ বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রে কোনো ভর্তুকি প্রদান করেনি। যার কারণে নতুন কোনো কম্বাইন হার্ভেস্টার যন্ত্র কৃষকের হাতে পৌঁছায়নি। পুরনো যে সব যন্ত্র রয়েছে তার মধ্যে বহু যন্ত্র মেরামতের অভাবে পড়ে আছে।

জানা গেছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ে গত ৫ তারিখ একটি সভা হয়। সেখানে বলা হয়, হাওরভুক্ত মোট ৭টি জেলায় এবারে ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। এর মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জের হাওরে ইতিমধ্যেই অল্প পরিসরে ধান কাটা শুরু হয়েছে। কিশোরগঞ্জের হাওরভুক্ত ১১টি উপজেলায় ১২ তারিখ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে ধান কাটা শুরু হবে। যেখানে কোন অঞ্চলে কতটি হার্ভেস্টর প্রয়োজন তার একটি তালিকা উপস্থাপন করা হলেও এর মধ্যে অকেজো হার্ভেস্টরের সংখ্যা তুলে ধরা হয়নি। 

সে সময় কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ হাওর অঞ্চলের আবহাওয়া পরিস্থিতি নজরে রাখার পাশাপাশি যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ধান কাটার কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রস্তুত রাখা হয় এবং যেগুলো অচল সেগুলো দ্রুত সচল করতে হবে। একইসঙ্গে হার্ভেস্টার চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় তেলের কোনো সংকট যাতে না হয় সেটাও সমন্বয় করার নির্দেশনা দেন।

কিন্তু এখন পর্যন্ত ডিএইয়ের পক্ষ থেকে অচল যন্ত্রগুলো সচল করা, অন্য জেলা থেকে হার্ভেস্টার নিয়ে আসা কৃষকরা কীভাবে তেল সংগ্রহ করবেন সেসব বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে জানা গেছে। সম্প্রতি ডিএই ও হাওরভুক্ত জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে একটি সভা করে। তবে সেখানে যন্ত্রের ব্যবহার, অন্য জেলা থেকে যন্ত্র সরবরাহ করা, অকেজো যন্ত্র মেরামত, পর্যাপ্ত তেলের সরবরাহ কীভাবে হবে তা নিয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাওরে যেকোনো সময়ে পাহাড়ি ঢল, বন্যা, বা অতিবৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। এজন্য পাকা ধান ঘরে তোলার তোড়জোর থাকে প্রতি বছরই। কারণ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাওরগুলোতে দেশের বোরো ধানের প্রায় ২০ শতাংশ আবাদ হয়। এবারে ইতিমধ্যেই শিলাবৃষ্টির কারণে সুনামগঞ্জে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল। যা উৎপাদনকেও ক্ষতির মুখে ফেলেছে।