প্রতিবন্ধকতা যত গভীর হোক নিরসন করা হবে

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৬ এএম

বাণিজ্য ও বিনিয়োগে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা যত গভীরেই থাকুক না কেন, সেগুলো নিরসন করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তার মতে, বিদ্যমান সমস্যা সমাধান না হলে স্থানীয় বিনিয়োগ সম্প্রসারণ হবে না। আর স্থানীয় বিনিয়োগ সম্প্রসারিত না হলে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব নয়। গতকাল শনিবার রাজধানীর মতিঝিল ঢাকা চেম্বার আয়োজিত ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বিবার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি; প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দেশে একটি ব্যবসা-সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিতের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা ডিরেগুলোশনের কথা বলছি। কিন্তু এটি বলা যতটা সহজ, বাস্তবায়ন ততটা কঠিন, তবে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, এখানে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। ব্যবসায়ী সমাজের সমস্যা সম্পর্কে অবগত হয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার একটি ওয়েবসাইট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি জানান, বিদ্যমান বিদ্যুৎ, গ্যাসের সমস্যা সমাধান একদিনে হবে না, এর জন্য সময় প্রয়োজন এবং জ্বালানি খাতে তিন মাসের রিজার্ভ নিশ্চিত করার জন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ইতিমধ্যে সরকার ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যারা উল্লেখিত শর্ত পূরণ করতে পারবে, তারা ঋণসহায়তা পাবে, কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য হবে না। মন্ত্রী বলেন, বিশেষ করে দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ নামে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, যেখানে উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রাপ্তি, দক্ষতা বাড়ানো, উৎপাদিত পণ্যের ডিজাইন এবং পণ্যের বাজারজাতকরণ প্রভৃতি সেবা প্রদান করা হবে। পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি হতে গণতান্ত্রিক অর্থনীতির দিক দেশকে ধাবিত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ট্যাক্স জিডিপির অনুপাত বাড়ানো না গেলে সরকারের কোনো উদ্যোগই সফল হবে না বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে অটোমেশনের কোনো বিকল্প নেই। এ ছাড়া অর্থায়নের জন্য প্রচলিত উৎসের বাইরে বিকল্প ফাইন্যান্সিং বাড়াতে দেশের পুঁজিবাজারকে শক্তিশালীকরণে ইতিমধ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, শিগগিরই এর সুফল দেশবাসী পাবে, সেই সঙ্গে বেশকিছু বন্ড প্রবর্তনের বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে। চলমান মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে সরকারের জ্বালানির বিল পরিশোধে অতিরিক্ত ৪-৫ বিলিয়ন খরচ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সব ধরনের জ্বালানি উৎসের মধ্যে সমন্বয় সাধন করাই সরকার অন্যতম অগ্রাধিকার, তবে প্রাথমিকভাবে সৌরশক্তির ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে এবং বাজেটে এ লক্ষ্যে নানাবিধ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে, যেগুলো গ্রহণ করে এ খাতে বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।   

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও  ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ। মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, ২০২৬ সালের জন্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ দশমিক ১ শতাংশ, যার প্রধান কারণগুলো হলো: বাণিজ্য বাধা, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এবং সাপ্লাইন চেইন প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, পণ্য পরিবহনের খরচ দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাওয়া এবং এর ফলে সামগ্রিক বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নিম্নমুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, চলতি অর্থবছরের বাজেটে কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া ডিজিটালাইশেনের মাধ্যমে ৪৮ ঘণ্টায় সম্পন্নকরণ, চামড়া, পাকুদা ও হোম টেক্সটাইল খাতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা তিন বছর বৃদ্ধি করা, রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে ১০টি নতুন খাতের জন্য নতুন শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান, কর ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন কার্যক্রম বৃদ্ধি ও কাস্টমস প্রক্রিয়া দ্রুতকরণ এবং এলডিসির প্রস্তুতি হিসেবে রপ্তানির সম্ভাবনাময় দেশগুলোর সঙ্গে পিটিএ ও এফটিএ স্বাক্ষর দ্রুতকরণ প্রভৃতি বেশকিছু সংস্কারমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যেগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশে ব্যবসা পরিচালনা প্রক্রিয়া আরও সহজতর হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। দীর্ঘ সময়ের জন্য বজায় থাকা উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ হয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ, যা বিনিয়োগের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয় বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে ঋণ থেকে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমাতে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হবে, সেই সঙ্গে রপ্তানিতে লিডটাইম হ্রাসে শিল্পাঞ্চলগুলোয় সব ধরনের সেবার নিরবচ্ছিন্ন প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমরা একটি যুগসন্ধিক্ষণে রয়েছি, এখানে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে কাক্সিক্ষত গতি পরিলক্ষিত হবে না, বরং পিছিয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হবে। তিনি উল্লেখ করেন, অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে হয়রানি বিষয়টি একটি নেতিবাচক কাঠমোতে পরিণত হয়েছে। ফলে সংস্কার কার্যক্রম কাজে আসছে না, এটার ওপর সরকারের নজর দিতে হবে এবং করজাল সম্প্রসারণে এ ধরনের হয়রানি কমানোর কোনো বিকল্প নেই।   

পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার বলেন, আমাদের নীতিমালা এবং বাস্তবায়নের মধে বেশ ফারাক রয়েছে। ফলে কাক্সিক্ষত সুফল পরিলক্ষিত হচ্ছে না। রপ্তানি পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণে আমরা যতটা উদার, পণ্য আমদানিতে যতটাই কঠিন নীতিমালা, উচ্চ শুল্কহার থাকায় স্থানীয়ভাবে মূল্যস্ফীতি ও পণ্যের মূল্য বাড়ছে বলে তিনি অভিমত জ্ঞাপন করেন। এ ছাড়া এলডিসি উত্তরণের জন্য যে সময়সীমা রয়েছে, তার মধ্যে যথাযথ কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তায়নের আহ্বান জানান তিনি।  

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এডিপি বাস্তবায়ন করতে হলে কর আহরণে বিপ্লব ঘটাতে হবে এবং বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ার সম্ভব খুবই কম। তিনি বলেন, বাজেটের ভালো উদ্যোগ থাকলেও মুদ্রানীতিতে সেটার প্রতিফলন নেই। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় মুদ্রানীতির সংস্কার জরুরি। এ ছাড়া জনগণ যে পরিমাণ কর দিচ্ছেন, সেটাও কোষাগারে জমা হচ্ছে না, বিষয়টি বেশ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ ছাড়া বিদেশি ঋণ গ্রহণ ও ঋণ পরিশোধে আরও সতকর্ত হতে হবে বলে তিনি পরামর্শ প্রদান করেন।

অনুষ্ঠানের নির্ধারিত আলোচনায়, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক, ট্রান্সকম লিমিটেডের গ্রুপ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সীমিন রহমান এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন।

সেমিনারের মুক্ত আলোচনায় ঢাকা চেম্বারের প্রাক্তন সভাপতি হোসেন খালেদ বলেন, রিয়েল এস্টেট খাতকে বাংলাদেশে কখনই শিল্প হিসেবে গণ্য করা হয়নি, যদিও এর মাধ্যমে অসংখ্য লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আহরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। তাই এ খাতটি শিল্প হিসেবে স্বীকৃতির আহ্বান জানান। প্রাক্তন সভাপতি আবুল কাসেম খান জানান, আমাদের প্রায় ৭৫ বছরের কয়লার মজুদ রয়েছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে এ মজুদকৃত কয়লা ব্যবহার করা গেলে শিল্প খাতে গ্যাস ব্যবহার বাড়ানো যাবে, যা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। দেশের লজিস্টিক খাতের উন্নয়নের জন্য সরকারের একটি একক সংস্থা স্থাপন এবং সব করদাতার জন্য ট্যাক্স কার্ড প্রদানে উদ্যোগী হওয়ার জন্য তিনি সরকারের আহ্বান জানান। এলডিসি উল্টরণ-পরবর্তী সময়ের জন্য অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রস্তুতির ওপর জোরারোপ করেন প্রাক্তন সভাপতি বেনজীর আহমেদ। প্রাক্তন সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, সরকারের মোট রাজস্বের ৯৬ শতাংশই আসে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে। তাই বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে করজালের আরও সম্প্রসারণ এবং এক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। দেশের এসএমএমইদের জন্য পৃথক বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বরাদ্দেরও প্রস্তাব করেন তিনি।         

এ সময় ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহসভাপতি মো. সালিম সোলায়মান এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্যসহ সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত