চলনবিলে বোরো আবাদ নিয়ে দিশেহারা কৃষক

পাবনার চাটমোহর উপজেলার মাঠের পর মাঠ এখন বোরো ধানের সবুজে ছেয়ে আছে। কোথাও থোড় এসেছে, কোথাও উঁকি দিচ্ছে কচি শিষ। কৃষি পঞ্জিকা অনুযায়ী এখন ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু এই শেষ মুহূর্তের সেচ নিয়ে চাটমোহরের কৃষকদের চোখেমুখে এখন ঘোর অন্ধকার। একদিকে তীব্র ডিজেল সংকট, অন্যদিকে অস্বাভাবিক হারে নেমে যাওয়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে প- হতে বসেছে হাজারো কৃষকের স্বপ্ন।

উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের হিসাব বলছে, চাটমোহরে প্রতিদিন ডিজেলের চাহিদা প্রায় ২০ হাজার লিটার। কিন্তু সপ্তাহজুড়ে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১০ হাজার লিটার। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় জোগান অর্ধেক। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে তীব্র লোডশেডিং। ফলে ডিজেলচালিত পাম্পই ছিল একমাত্র ভরসা, সেখানেও এখন তেলের জন্য হাহাকার।

তেলের জন্য হাহাকার

উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের ভাদড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পাম্পের সামনে তেলের ড্রাম ও বোতল নিয়ে কৃষকদের দীর্ঘ সারি। তিন দিন ঘুরেও তেল পাননি কৃষক উজ্জ্বল হোসেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ধানের এখন শিষ বের হওয়ার সময়। এ সময় মাটি ফেটে চৌচির হয়ে আছে। তেল না পাওয়ায় পাম্প ছাড়তে পারছি না। বাইরের দোকান থেকে ১৪০ টাকা দরে কিছু তেল কিনলাম, কিন্তু তাতে কুলাচ্ছে না। এভাবে চললে ধান সব চিটা হয়ে যাবে।’

একই চিত্র ডিবিগ্রাম ইউনিয়নের বালুদিয়ার গ্রামেও। সেখানে কৃষক জিয়ারুল হক জিয়া জানান, ১২০ ফুট গভীরেও এখন পাইপে পানি উঠছে না। মাটির নিচে পানির স্তর অনেক নেমে যাওয়ায় অনেক কৃষক জমি খুঁড়ে গর্ত করে নিচে পাম্প বসাচ্ছেন। জিয়ারুল বলেন, ‘তেলও নাই, পানিও নাই। আমরা এখন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায় পড়েছি।’

খরচের চাপে পিষ্ট কৃষক

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের তুলনায় সারের দাম বস্তাপ্রতি হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর ওপর ডিজেলের এই কৃত্রিম সংকটে খোলাবাজারে বাড়তি দাম দিতে গিয়ে উৎপাদন খরচ আকাশ ছুঁয়েছে। এক বিঘা জমিতে ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে প্রায় ২০ হাজার টাকা। বর্তমান বাজারদরে সমপরিমাণ ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তোলাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। চর সদিরাজপুরের কৃষক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘মাঠে খাটুনি আর রোদে পোড়া ছাড়া দিন শেষে আমাদের আর কিছু থাকে না।’

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

চাটমোহর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ কুন্তলা ঘোষ বলেন, ‘বোরো আবাদ রক্ষায় আমরা সাধ্যমতো কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি। ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ চলছে। “তবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন প্রামাণিক পরিস্থিতিকে ‘সাময়িক ভোগান্তি’ হিসেবে দেখছেন। তিনি দাবি করেন, পাম্পগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাতে কৃষক সঠিক দামে তেল পায়। তবে মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা; ট্যাগ অফিসার থাকলেও পাম্পে তেলের সরবরাহ না থাকায় কৃষকদের ভোগান্তি কমেনি। চলনবিল অঞ্চলের কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে এবং সেচ সংকট না কাটলে এবার জেলায় বোরোর ফলনে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। যার প্রভাব সরাসরি পড়বে চালের বাজারে।