ট্যাংকির মধ্যে মাছ চাষে সফল পার্বতীপুরের মৎস্যচাষি

দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলায় আধুনিক পদ্ধতিতে বাড়ির আঙিনায় ট্যাংকির মধ্য দেশীয় প্রজাতির মাছ চাষে করে সফল হয়েছেন অনেকে। হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. হারুন-উর-রশিদ বলেন, জেলার পার্বতীপুর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে বাড়ির আঙিনায় ট্যাংকি স্থাপন করে দেশীয় প্রজাতির মাছ চাষে অনেক মৎস্য চাষি সফল হয়েছেন। এক বছর ধরে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে মাছ চাষ করে সফলতা অর্জন করেছেন। মৎস্যচাষিদের আগ্রহ দেখে হাবিপ্রবির মৎস্য অনুষদ বিভাগ থেকে তাদের আধুনিক পদ্ধতিতে পরীক্ষামূলক মাছ চাষ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরামর্শ অনুযায়ী তাদের বাড়ির আঙিনায় ট্যাংকি স্থাপন করে দেশীয় প্রজাতির মাছ চাষের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করা হয়।

প্রথম পর্যায়ে এই পদ্ধতিতে মাছ উৎপাদনে চাষিরা সফল হয়েছেন। পার্বতীপুর উপজেলায় কয়েকটি ইউনিয়নে ১০৫টি ট্যাংকিতে এই পদ্ধতিতে মাছ চাষ করা হচ্ছে। ২০ থেকে ২৫ হাজার লিটার পানি ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিটি ট্যাংকির উচ্চতা প্রায় ৪ থেকে সাড়ে ৪ ফুট। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এ পদ্ধতির নাম ‘খরাপ্রবণ এলাকায় ট্যাংকিতে উচ্চমূল্যের দেশি প্রজাতির মাছ চাষ’। সরেজমিন দেখা যায়, পার্বতীপুর উপজেলার চন্ডীপুর ইউনিয়নের পশ্চিম হাবড়া গ্রামের মো. জাহিদুল ইসলাম (৩৫) বাড়ির আঙিনায় ট্যাংকিতে উচ্চমূল্যের দেশি প্রজাতির মাছ চাষ করছেন। তার এসব ট্যাংকিতে কই, তেলাপিয়া, শিং ও মাগুর মাছ চাষ করা হচ্ছে।

শুধু জাহিদুল ইসলাম নয়, একই পদ্ধতিতে ওই উপজেলার পার্শ্ববর্তী মমিনপুর ইউনিয়নের খামাপাড়া গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক নুরুল ইসলাম পলাশবাড়ী ইউনিয়নের কালুপাড়া গ্রামের আমজাদ আলীসহ অনেকেই এখন ট্যাংকিতে উচ্চমূল্যের দেশি প্রজাতির মাছ চাষ করছেন। এ পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে প্রচুর পরিমাণ লাভ হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে বছরে দুই থেকে তিনবার মাছ উৎপাদন করা সম্ভব। যার ফলে অল্প সময়ে অধিক লাভবান হওয়া যায়।

নারী উদ্যোক্তা মাছচাষি সাহিদা বেগম বলেন, গ্রামে কারও বাড়িতে মেহমান বেড়াতে এলে আমাদের কাছে মাছ কিনতে আসেন প্রতিবেশীরা। ৩ থেকে ৪ মাস পর প্রতিটি ট্যাংকি থেকে ৪শ থেকে ৫শ  গ্রাম ওজনের মাছ উৎপাদন হয়। প্রতি কেজি মাছ বিক্রি করা হয় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। শিং মাছ কেজিতে ১০ থেকে ১২টি হচ্ছে।

জেলার চিরিরবন্দর উপজেলা থেকে ট্যাংকিতে মাছ চাষ দেখতে আসা নারী উদ্যোক্তা রেবেকা বেগম বলেন, সাহিদা আপার পানির ট্যাংকিতে মাছ চাষ দেখার জন্য আমি তেঁতুলিয়া গ্রাম থেকে এসেছি। এতদিন জানতাম পুকুরে মাছ পালন হয়। এখন দেখছি বাড়ির আঙিনায় ট্যাংকিতে মাছ করা হচ্ছে। আমি আগামীতে ট্যাংকিতে এ প্রদ্ধতিতে মাছ চাষ করব।

পার্বতীপুর পৌরসভার ঝিকরপাড়া এলাকার তরুণ উদ্যোক্তা ফারুক আহমেদ (৩২) ভাড়া নেওয়া জমিতে ট্যাংকি পদ্ধতিতে মাছ চাষ শুরু করেছেন। ৪ বছর আগে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এমবিএসকের ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় গড়ে তুলেছেন পার্বতীপুর অ্যাগ্রো ফার্ম ফিশারিজ। তার তিনটি ১০ হাজার লিটার পানি ও তিনটি ৩০ হাজার লিটার পানি ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ট্যাংকি রয়েছে। প্রতিটি ট্যাংকিতে প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার পিস দেশি প্রজাতির মাছ উৎপাদন করছেন। তার এসব ট্যাংকিতে ভিয়েতনাম কই, শিং, তেলাপিয়া ও মাগুর মাছ চাষ করা হচ্ছে।

এমবিএসকের মৎস্য কর্মকর্তা মো. সিরাজুল হক জানান, এ পদ্ধতিতে মাছ চাষে খাদ্য খরচ প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় অনেক কম। মাছের উৎপাদন হার পুকুর বা জলাশয়ের চেয়ে অনেক বেশি। এ পদ্ধতিতে চাষের ফলে মাছ দ্রুত বৃদ্ধির সঙ্গে মাছের গুণগতমান উন্নত ও স্বাস্থ্যসম্মত হয় এবং মাছের মৃত্যুহার নেই বললেই চলে।

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের ম্যানেজার মো. ফয়জুর রহমান বলেন, শুকনো মৌসুমে যেখানে পুকুরে পানি থাকে না, সেসব এলাকার জন্য এ ধরনের মাছ চাষ পদ্ধতি লাভজনক। বিশেষায়িত পদ্ধতিতে পানি বারবার ফিলটার করে সম্পূর্ণরূপে পরিশোধিত করে মাছের ব্যবহারযোগ্য করে তোলা হয়। এ পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হলো, অল্প ঘনত্বে অধিক মাছ উৎপাদন করা। ফলে পানি অপচয়ের সুযোগ নেই। মাছের জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা হয়।

পার্বতীপুর উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. খালেদ মোশাররফ জানান, পার্বতীপুর পৌরসভা ও উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে এখন ট্যাংকিতে উচ্চমূল্যের মাছ চাষ করা হচ্ছে। অনেক মৎস্যচাষির পুকুর নেই। পুকুরে পানিও থাকেও না। কিন্তু এ পদ্ধতিতে ট্যাংকির অল্প পানিতে মাছ চাষ করা যায়। এ পদ্ধতিতে মাছ চাষে পানির গুণাগুণ বৃদ্ধি ও রোগ সৃষ্টিকারী ক্ষতিকর জীবাণু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। পার্বতীপুরে ট্যাংকি পদ্ধতিতে মাছ চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ফায়জুর রহমান জানান, পার্বতীপুর উপজেলায় বেশ কয়েকটি গ্রামে ট্যাংকি পদ্ধতিতে সফল মাছ চাষ দেখেছেন। মৎস্য বিভাগের সহযোগিতায় এ ধরনের মাছ চাষ একটি সফল উদ্যোগ।