পাহাড়ে ফুলবিজুর আনন্দ

সবেমাত্র আকাশে সূর্য উঁকি দিচ্ছে। এরই মধ্যে রাঙ্গামাটির কেরানী পাহাড় এলাকায় কাপ্তাই হ্রদের তীরে হাজির হয়েছেন শত শত পাহাড়ি তরুণ-তরুণী। গঙ্গা মায়ের উদ্দেশে কলার পাতায় ফুল রেখে পানিতে ভাসিয়ে দিচ্ছেন তারা। শুধু কেরানী পাহাড়ে নয়; জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়িরা ফুল ভাসিয়ে দিনটি শুরু করেন। রবিবারের ভোরে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ফুলবিজু উপলক্ষে শহরের রাজবন বিহার ঘাট, গর্জনতলী মধ্যদ্বীপসহ বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে এবং ব্যক্তিগত উদ্যেগে পানিতে ফুল ভাসানো হয়। পানিতে ফুল ভাসিয়ে পুরনো বছরের দুঃখ-বেদনাই যেন ভাসিয়ে দিয়ে নতুন দিনের সম্ভাবনার আলো জ¦ালান পাহাড়ের বাসিন্দারা। এই উৎসবটি চাকমারা ‘ফুলবিজু’, ত্রিপুরারা ‘হারিবসু’ আর মারমারা ‘সূচিকাজ’ নামে অভিহিত করে থাকেন। ঠিক ফুলবিজু নামে অভিহিত না হলেও এ দিন প্রায় সব পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীই পানিতে ফুল ভাসানোর আনুষ্ঠানিকতা পালন করে থাকে।

রাজবন বিহারের পূর্ব ঘাটে বিজু-সাংগ্রাই-বৈসু-বিষু-বিহু-সাংক্রাই-চাংক্রান-পাতা উৎসব উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে কাপ্তাই হ্রদে ফুল নিবেদনের মাধ্যমে তাদের চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠান শেষ করেছে। কাপ্তাই হ্রদে ফুল নিবেদন করে নবনিতা চাকমা বলেন, ফুলবিজুর দিনে গঙ্গাদেবীর উদ্দেশে ফুল নিবেদন আমাদের ঐতিহ্য। পাশাপাশি আজকে থেকেই বর্ষবরণের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। আগামীকাল মূল বিজু এবং পরশু পহেলা বৈশাখ পালন করব। হ্রদে ফুল নিবেদনের পর তরুণ- তরুণীরা বাসায় গিয়ে ফুল, নিমপাতা দিয়ে ঘর সাজিয়ে তুলেন। ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীরা ঘর ও এলাকার মুরব্বিদের স্নান করে নতুন কাপড়ের মাধ্যমে বরণ করে নেন। এ সময় তারা মুরব্বিদের কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। আজ সোমবার বছরের শেষ দিন চৈত্রসংক্রান্তিতে পাজন আতিথেয়তা এবং পরের দিন নববর্ষে বিহারে বিহারে প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া বছরের প্রথম দিন মঙ্গলবার জলকেলির মাধ্যমে মারমারা সাংগ্রাই উৎসব উদযাপন করবেন। পাহাড়ে বর্ষবরণ উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী চলছে মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলাসহ আরও নানা আয়োজন। যা আরও এক সপ্তাহ পর্যন্ত চলবে।

বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, গতকাল সাঙ্গু নদীর বুকে ভেসে উঠেছে রঙিন ফুল। প্রকৃতির এ অনন্য আয়োজনে পুরনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে বান্দরবানে শুরু হয়েছে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের তিন দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী বিষু উৎসব। একই সঙ্গে চাকমা সম্প্রদায়ের বিজু উৎসবেরও সূচনা হয়েছে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে। রবিবার ভোর থেকেই রোয়াংছড়ি বাস স্টেশন-সংলগ্ন সাঙ্গু নদীর তীরে জড়ো হন নানা বয়সী তঞ্চঙ্গ্যা ও চাকমা সম্প্রদায়ের মানুষ। পাহাড়ি তরুণ-তরুণীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে কলাপাতায় সাজানো ফুল নিয়ে গঙ্গাদেবীর উদ্দেশে পূজা অর্চনা করেন। এরপর নদীর জলে ফুল ভাসিয়ে পুরনো বছরের সব গ্লানি ভুলে নতুন বছরের জন্য প্রার্থনা জানান তারা।

আয়োজকরা জানান, সোমবার পালিত হবে মূল বিজু। এদিন সকাল থেকেই ঘরে ঘরে ২০ থেকে ৩০ ধরনের সবজি দিয়ে তৈরি করা হয় ঐতিহ্যবাহী ‘পাজন’। নতুন পোশাক পরে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের বাড়িতে গিয়ে পাজন খাওয়ার মধ্য দিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করেন সবাই। এই বিশেষ রান্নায় কাঁচা কাঁঠাল, মটর, ছোলা, বুনো আলু, চিংড়ি, শিমের বিচি, কচি বেত, বাঁশের ডগাসহ বিভিন্ন গ্রীষ্মকালীন উপাদান ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি পিঠা ও অন্যান্য খাবারের আয়োজনও থাকে।

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, গতকাল খাগড়াছড়িতে চাকমাতে ফুলবিজুর মধ্য দিয়ে শুরু হলো পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় ঐতিবাহী সামাজিক উৎসব বৈসাবি। সোমবার চাকমা সম্প্রদায়ের প্রতিটি ঘরে ঘরে চলবে অতিথি আপ্যায়ন।