মব-সহিংসতা নির্মূলে হামলাকারীদের বিচারের দাবি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের

দেশে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা মব-সহিংসতা ও উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া সহিংস ঘটনাগুলোর প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৮ জন শিক্ষকের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। শিক্ষকদের মতে, নবনির্বাচিত সরকার মব কালচার বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তারা মব-সন্ত্রাসীদের দমনে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। তবে এই মব-সহিংসতা চিরতরে নির্মূলে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচার করতে হবে বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়। 

বিবৃতিতে বলা হয়, বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ‘মব কালচার শেষ।’ আমরা আশ্বস্ত হয়েছিলাম। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের মব-সহিংসতা প্রতিহত করতে না পারা এবং ক্ষেত্র বিশেষে নিশ্চুপ থেকে রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার দুরভিসন্ধিতে জনগণের মধ্যে নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছিল। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বার্তা জনমনে স্বস্ত্বি দিয়েছিল। কিন্তু, হতাশার সঙ্গে আমরা দেখতে পাচ্ছি, মব-সহিংসতা দমনে বিএনপি সরকারও চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।

কুষ্টিয়ার দরগার প্রধান সাধক বা পীর শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীরকে হত্যাকে বর্বোরচিত ঘটনাকে উল্লেখ করে বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ধর্মকে কৌশলে ব্যবহার করে কাউকে হত্যাযজ্ঞ করা কিংবা হত্যা করার এক ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত হয়েছে সমগ্র বাংলাদেশ। আক্রান্ত হচ্ছে মাজার-দরগাসহ বাউল-পীরদের আস্তানাগুলো। এরই সর্বশেষ নজির শামীম রেজার এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ড আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজবাড়ির গোয়ালন্দে দরবার শরীফে সদ্যসমাহিত সাধক নুরুল হক মোল্লার লাশ কবর থেকে উঠিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটিকে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক এসব হামলা ও মব-সন্ত্রাসের তীব্র উদ্বেগ প্রকাশসহ নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে এবং অবিলম্বে মব-সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই এই উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোকে ‘প্রেসার গ্রুপ’ হিসেবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। সে সময় ধানমণ্ডি-৩২ নম্বর ভাঙচুর, শিক্ষকদের ওপর হেনস্তা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগের বিচার না হওয়ায় আজ মব-সন্ত্রাসীরা আরও সাহসী হয়ে উঠেছে।

বর্তমানে নির্বাচিত সরকারের আমলেও যদি এই অপশক্তিকে কঠোর হাতে দমন করা না হয়, তবে বাংলাদেশ একটি অসহিষ্ণু রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক স্পষ্ট করে বলেছে, গত নির্বাচনে সাধারণ মানুষ ভোটাধিকারের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছে তারা দেশকে আফগানিস্তানের পথে দেখতে চায় না। তাই মুক্তিযুদ্ধের স্পিরিট সমুন্নত রাখতে সরকারকে অবশ্যই মব-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।

বিবৃতিতে শিক্ষক নেটওয়ার্ক চারটি সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করেছে। 

দাবিগুলো হলো- 
১। শাহবাগ, রংপুর ও কুষ্টিয়ার ফিলিপনগরে হামলাকারী ও হত্যাকারী মব-সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

২। অবিলম্বে শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিকে বিনাশর্তে মুক্তি ও সাহারা চৌধুরী রেবিলের ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দিতে হবে।  

৩। সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে। 

৪। সহিষ্ণু সমাজ নির্মাণে কাজ করতে হবে, অসহিষ্ণু শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ ও নিরস্ত্র করতে আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিবৃতিটি অনলাইনে স্বাক্ষর করেছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৮ জন শিক্ষক
১. মাইদুল ইসলাম, পিএইচডি গবেষক, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়
২. কামাল চৌধুরী, অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
৩. কাজলী সেহরীন ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
৪. সৌভিক রেজা, অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
৫. মারিয়া ভূঁইয়া, সহকারী অধ্যাপক, মানবিক ও ব্যবসায় বিভাগ, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
৬. ইসমাইল সাদী, সহকারী অধ্যাপক, স্কুল অব জেনারেল এডুকেশন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
৭. শেখ নাহিদ নিয়াজী, সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
৮. গোলাম সারওয়ার, সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
৯. শর্মি হোসেন, শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
১০. হাসান তৌফিক ইমাম, সহকারী অধ্যাপক শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
১১. ফাহমিদুল হক, অধ্যাপক (সাবেক) , গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১২. তাহমিনা খানম, সহযোগী অধ্যাপক, ব‍্যব্যবস্থাপনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৩. রায়হান রাইন, অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
১৪. মাহবুবুল হক ভূঁইয়া, সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
১৫. কামরুল হাসান মামুন, অধ্যাপক, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৬. অভী চৌধুরী, অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
১৭. হাসান তৌফিক ইমাম, সহকারী অধ্যাপক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
১৮. আসিফ মোহাম্মদ শাহান, অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৯. তাসনীম সিরাজ মাহবুব, সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
২০. শাশ্বতী মজুমদার, সহযোগী অধ্যাপক, চারুকলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
২১. কাজী ফরিদ, অধ্যাপক, গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
২২. অলিউর সান, প্রভাষক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ
২৩. কাজী মামুন হায়দার, সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
২৪. মার্জিয়া রহমান, সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
২৫. খাদিজা মিতু, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
২৬. আ-আল মামুন, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
২৭. রুশাদ ফরিদী, সহকারী শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
২৮. সামজীর আহমেদ, প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়
২৯. শর্মি বড়ুয়া, প্রভাষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
৩০. মিম আরাফাত মানব, প্রভাষক, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
৩১. রাইয়ান রাজী, শিক্ষক, স্কুল অব জেনারেল এডুকেশন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
৩২. সৈয়দ নিজার, সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
৩৩. লায়েকা বশীর, প্রাক্তন শিক্ষক, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়
৩৪. আরাফাত রহমান, সহকারী অধ্যপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
৩৫. গীতি আরা নাসরীন, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
৩৬. কাব্য কৃত্তিকা, প্রভাষক, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়
৩৭. শেহরীন আতাউর খান, সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
৩৮. আইনুন নাহার, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
৩৯. কাজী শুসমিন আফসানা , সহযোগী অধ্যাপক, নাট‍্যকলা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
৪০. মো ইমদাদুল হক খান, ক্যান্সার গবেষক, যুক্তরাষ্ট্র
৪১. তীব্র আলী, প্রফেসর, ব্র‍্যাক বিশ্ববিদ‍্যালয়
৪২. সিউতি সবুর, নৃবিজ্ঞানী, সহযোগী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় 
৪৩. সিরাজাম মুনিরা, সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
৪৪. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী, অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
৪৫. নাইরা খান, সহযোগী অধ্যাপক, ভাষাতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
৪৬. সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
৪৭. সৌমিত জয়দ্বীপ, সহকারী অধ্যাপক, স্কুল অব জেনারেল এডুকেশন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
৪৮. মাহমুদুল সুমন, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
৪৯. মোশাহিদা সুলতানা, সহযোগী অধ্যাপক, একাউন্টটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
৫০. হাসান তালুকদার, জ্যেষ্ঠ প্রভাষক, স্কুল অফ জেনারেল এডুকেশন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
৫১. আলি আহসান, সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
৫২. প্রাপ্তি তাপসী, প্রভাষক, নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়
৫৩. সৌম‍্য সরকার, সহকারী অধ‍্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় 
৫৪. নাসির আহমেদ, অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
৫৫. ফাতেমা শুভ্রা, সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
৫৬. নাসরিন সিরাজ, সহকারী অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
৫৭. মির্জা তাসলিমা সুলতানা, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
৫৮. আনু মুহাম্মদ, প্রাক্তন অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়