আমাদের ঐক্যের সূত্র

পহেলা বৈশাখ আমাদের চিরায়ত আত্মানুসন্ধানের উপলক্ষ। আত্মপরিচয়ের পুনরাবৃত্তি এবং পুনর্জাগরণ। এইদিনে আমাদের পরম্পরাগত অভ্যাস, অনুভব, বিশ^াস, সামাজিকতা ও সম্প্রীতি তথা সার্বিক সংস্কৃতির ঘনীভূত প্রকাশ ঘটে। আরে নির্দিষ্ট করে বলা যায় যে আপন জীবনধারার সৌন্দর্য প্রকাশ করার অনন্য পরিসর হয়ে ওঠে বৈশাখী মেলা। এই মেলায় আবহমান বাংলার বৈচিত্র্য, বিনোদন, প্রয়োজন ও সৌন্দর্যের সমন্বিত দৃশ্যায়ন ঘটে। ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক-অর্থনৈতিক শ্রেণি ইত্যাদির ঊর্ধ্বে এক গভীর ঐকতান উপলব্ধি করা যায়। আমাদের জীবনধারার বহুমাত্রা একসঙ্গে মিলে এক সামষ্টিক চেতনার প্রতিফলন ঘটায় পহেলা বৈশাখ। যেন সমগ্র সমাজ এক দিনের জন্য হলেও নিজেকে নতুন করে চিনে নেয়, নিজের সঙ্গে নিজের সম্পর্কটি আবারও যাচাই করে, আত্মস্বাতন্ত্র্য উদ্যাপন করে।

চৈত্র থেকেই দানা বাঁধতে থাকা প্রস্তুতি ও প্রত্যাশা পহেলা বৈশাখে এসে প্রস্ফুটিত হয়। কামার-কুমার-স্বর্ণকারসহ সব কারিগর তাদের পণ্য বানায়, পরিবেশনা শিল্পী ও তাদের দলগুলোর মহড়া চলতে থাকে,  কৃষক বছরকার ভালো-মন্দের হিসাব মেলায়, শিশুরা নতুন কিছুর অপেক্ষা করে। অন্যদিকে, পহেলা বৈশাখের নগরীয় দৃশ্য ভিন্নই—শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন, বিশেষ পোশাক ও খাবার আয়োজনের ঐতিহ্যগত সাংস্কৃতিক উপদানগুলো নগরে নবায়িত হয়। সবকিছু মিলেমিশে সম্পূর্ণ বাংলাদেশে যে ছবিটা তৈরি হয়, সেটিই আসলে পহেলা বৈশাখের প্রাণ।

পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী উপাদান। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিসহ এ ভূখণ্ডের সব জাতিগোষ্ঠী পহেলা বৈশাখকে ঘিরে চৈত্র ও বৈশাখ দুইমাসব্যাপী পরম্পরাগতভাবে নানা প্রকার সংগীত, কৃত্যানুষ্ঠান, আচার উদ্যাপন করে থাকে। কৃষিভিত্তিক গ্রামবাংলার জীবনধারার যে দিকগুলো যেকোনো পরিস্থিতিতে জনসাধারণকে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা প্রদান করে, পহেলা বৈশাখ সে দিকগুলোয় নবপ্রাণ সঞ্চার করে। বাংলাদেশে এমন কোনো অঞ্চল খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয় যেখানে নিকট অতীত ও বর্তমানে বৈশাখী মেলাসহ নানা প্রকার দেশি সাংস্কৃতিক আয়োজন হয় না।

সম্প্রতি বগুড়া জেলার হিন্দু-মুসলিম চিরায়ত সম্প্রীতিপূর্ণ কয়েকটি গ্রাম পরিদর্শনকালে লক্ষ করেছি ঐতিহ্যঘনিষ্ঠ মানুষদের মনে দ্বিধা—এবারের পহেলা বৈশাখে কী করা যাবে এবং কী করা যাবে না তা নিয়ে। লক্ষ করলাম কামারপাড়া, কুমোরপাড়া, তেলিপাড়া, জোলাপাড়া, মাছুয়াপড়া, পালপাড়া নামের পুরনো গ্রামগুলো অকল্পনীয় রূপান্তর লাভ করেছে। কোনো কোনো গ্রামের নামই পাল্টে গেছে! মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাৎক্ষণিক যা উপলব্ধি করলাম, তা হলো এই যে রূপান্তর কেবল ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতার ফলাফল নয়। সমাজকাঠামো ভেঙে এক প্রকার ভার্চুয়াল সমাজে পরিণত হয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে কেবলই অর্থনীতি-নির্ভর বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন চিন্তা কৃষি ব্যবস্থার রূপান্তর, যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিবর্তন, প্রযুক্তি-নির্ভরতা, অপরিকল্পিত ও অনুপযুক্ত ক্রমাবনতির শিকার আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক এবং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রেক্ষাপট, মানুষের ব্যাপক স্থানান্তর—গ্রাম ছেড়ে যেমন অনেকেই বিদেশে গমন করেছে বা নগরে স্থানান্তরিত হয়েছে, তেমনি প্রায় প্রত্যেক গ্রামেই অন্য এলাকার (বিশেষ করে নদীভাঙন এলাকার) মানুষ স্থানান্তরিত হয়ে এসেছে, পাশাপাশি গ্রামে প্রবেশ করেছে বিবিধ নগরীয় উপাদান। এসবের প্রভাবে সার্বিক জীবনধারায় রূপান্তর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এরপরও, ঐতিহ্যনিষ্ঠতার ছবি অমলিন রয়েছে। যা উপলব্ধি করা যায় বৈশাখী মেলা নিয়ে সবারই অন্তর্গত উত্তেজনা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে।

চৈত্র আসার শুরু থেকেই মানুষ অপেক্ষা করছে পণ্য বিক্রয় বা ক্রয়ের—শখের কিংবা প্রয়োজনের পণ্য। অপেক্ষা করছে সার্কাস পার্টির, যাত্রাপালার, পালাগানের, জাদুকরের ভেলকিবাজির, এমনকি ক্যানভাসারের পরিবশনা উপভোগ করার জন্য, অথবা বিশেষ খাবার ভাগ করে খাওয়ার জন্য। সুতরাং, পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটেও পহেলা বৈশাখ বাংলার মানুষ লালন এবং পালন করে গভীর আত্মিক অনুপ্রেরণা থেকে। এবং, প্রায় সব বয়সের, সব ধর্মের, নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের, আর্থ-সামাজিক অবস্থানের প্রত্যেক নাগরিকের আত্মপরিচয় ভাবনা ও চর্চার বিরাট ও সর্বজনীন পরিসর হয়ে উঠেছে বৈশাখী মেলাসহ সব রকম গ্রামীণ ও নগরীয় আয়োজন। এদেশে, সুতরাং, স্বাধীনতার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদ প্রশ্নে যে বিতর্ক চলমান রয়েছে, তার সমাধান পহেলা বৈশাখ দিতে পারে, কেননা পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্যঘনিষ্ঠ সব আয়োজন বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সংস্কৃতির প্রায় সব মাত্রারই সমাবেশ ঘটে।

পহেলা বৈশাখের ধর্মনিরপেক্ষ, জাতিনিরপেক্ষ, শ্রেণিনিরপেক্ষ যে চেহারা আমরা দেখতে পাই, সেটাই আমাদের সংস্কৃতির স্বরূপ। এর অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র ধর্ম, জাতি, শ্রেণি এসব বিভাজন কার্যত অকার্যকর করে দেয়। একই মেলায়, একই রাস্তায়, একই পরিসরে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ের মানুষ একত্র হয়। কেউ তার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আসে না, বরং নিয়ে আসে তার জাতিগত তথা সংস্কৃতিগত পরিচয়, তার মানবিক সত্তা। এই জায়গাটিই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে মানুষ নিজেকে একটি বৃহত্তর সমষ্টির অংশ হিসেবে উপলব্ধি করে। এই উপলব্ধিকেই আমাদের প্রত্যাশিত ঐক্যের ভিত্তি বিবেচনা করতে হবে।

অথচ, দুঃখজনকভাবে এই অপরিমেয় পরম্পরাগত চর্চার ওপর বিশেষ রাজনৈতিক পক্ষপাত চেপে বসেছে; চেপে বসেছে তথাকথিত ধর্মানুভূতি। বিভিন্নভাবে এই উৎসবকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা, এর গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, এর বিপুল বিস্তৃতিতে সংকুচিত করার প্রয়াস—এসব বিষয় মানুষের মনে দ্বিধা তৈরি করছে। এই দ্বিধা আসলে সংস্কৃতির স্বাভাবিক প্রবাহে একটি বাধা। এই অযাচিত চাপ তৈরি করার পেছনে যা আছে তাকে সমাজে ছড়িয়ে পড়া প্রতিক্রিয়াশীলতা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। মনে রাখতে হবে, পহেলা বৈশাখের স্বতঃস্ফূর্ততা ব্যাহত হয় এমন যেকোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ ইতিহাসে সমগ্র জনসংস্কৃতি ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র হিসেবেই চিহ্নিত হবে।

বিশ^ব্যাপী বাঙালিসহ বাংলাদেশের সব জনজাতির বিশিষ্ট্যসূচক সাংস্কৃতিক উপাদান হিসেবে পহেলা বৈশাখ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। পহেলা বৈশাখের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ইউনেস্কোর মাধ্যমে বিশ^ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত হওয়া এরই প্রমাণ। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক স্টেট সিনেটর লুইস সেপুলভেদা ১৪ এপ্রিলকে নিউ ইয়র্কে বাংলা নববর্ষের স্বীকৃতিদানের প্রস্তাব করেন যা ২০২৫ সালের ২২ জানুয়ারি সিনেটে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়, যা নিঃসন্দেহে বাঙালির জন্য গৌরবের। তবে শুধু বৈশি^ক পরিসরে বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই কেবল নয়, সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি বজায় রাখতে হলে সামাজিক জীবনধারায় ভিন্নতার প্রতি সহিষ্ণুতা, অন্তর্ভুক্তির অবাধ পরিসর ও স্বতঃস্ফূর্ততা নিশ্চিত করতে হবে আমাদেরই। জাতির পরিচয়চিহ্ন সমুন্নত রাখার প্রশ্নে কোনো বিভেদ চলতে পারে না। সংস্কৃতি নিজের মতো প্রবাহিত হতে পারলেই সমৃদ্ধ হয়। এর পথে বাধা তৈরি করে যা কিছুই করার চেষ্টা করা হয় তাকে আত্মবিধ্বংসী অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করার বিকল্প নেই, কেননা শেকড় বিচ্ছিন্ন হয়ে ভিত্তিহীনতার ওপর জাতিগত পরিচয় দাঁড়াতে পারে না। নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে—বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ বলে যদি কিছু থাকেই তার ভিত্তি কী। পহেলা বৈশাখ যেহেতু সব ভিন্নতাকে সংস্কৃতিগত সম্প্রীতির বন্ধনে একীভূত করতে পারে, যেহেতু এদেশের বাঙালিসহ সব জনজাতি নিজেদের মতো করে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করে, তাই পহেলা বৈশাখকে আমাদের জাতীয় ঐক্যের সূত্র বা প্রতীক হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে। এই দিনের সব আয়োজনে সব শ্রেণি, পেশা, ধর্মের মানুষ আত্মপ্রেরণাতেই একীভূত হয়। পহেলা বৈশাখের এই অনন্য ঐকতান কোনো কৃত্রিম চাপিয়ে দেওয়া প্রক্রিয়ার ফল নয়; দীর্ঘকালের চর্চা, অভ্যাস ও সামাজিকতার মাধ্যমে গড়ে ওঠা একটি জৈবিক প্রক্রিয়া। মানুষ যখন বারবার একই রীতি পালন করে, একই উৎসবে অংশ নেয়, তখন তার ভেতরে একটি নির্দিষ্ট মানসিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামো পরিস্ফুট হয়। এই কাঠামো প্রত্যেককে অন্যদের সঙ্গে সংযুক্ত করে, তাকে শেখায় কীভাবে একসঙ্গে, একক পরিচয়ে বাঁচতে হয়। পহেলা বৈশাখ সেই শিক্ষার একটি বৃহত্তর আলয়।

মানুষ যখন একত্র হয়, তখন তারা কেবল আনন্দ করতে আসে না; তারা প্রকৃতিগতভাবে নিজেদের পরিচয় পুনর্গঠন করে। কোনো একটি গান, কোনো একটি রঙ, কোনো একটি খাবার বা আচার—এ সবের ভেতর দিয়ে তারা নিজেদের অতীতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। এই সংযোগের সব সূত্র সবসময় সরাসরি দৃশ্যমান (ট্যানজিবল) নয়, এর অদৃশ্য (ইনট্যানজিবল) অথচ অনিবার্য উপাদানগুলো গভীরতর অনুভবে অনুরণিত হয়, পরস্পরের অন্তরে সঞ্চারিত হয়। যেমন, বৈশাখী মেলায় গিয়ে শিশুদের মেতে ওঠার দৃশ্যই সব নয়, ঐতিহ্যের সঙ্গে বেড়ে ওঠার মাধ্যমে এই শিশুদের পরম্পরাগত চেতনা বহন করে চলার প্রক্রিয়াকেই আমাদের সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। বুঝতে হবে যে ঐতিহ্যিক আয়োজনে যুক্ত হয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম অজান্তেই একটি বৃহত্তর কালস্রোতে প্রবহমান সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে ওঠে। এভাবেই  সামষ্টিক স্মৃতি, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়, গড়ে তোলে জাতিগত সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির ভবিষ্যৎ ভিত্তি।

এই উৎসবের সঙ্গে কৃষিভিত্তিক জীবনের সম্পর্ক আজও গভীর। ঋতুচক্রের পরিবর্তন, ফসল তোলা, স্থানীয় সাংস্কৃতিক পণ্য বিপণন, জীবনের নতুন হিসাব শুরু করা এ সবের সঙ্গে নববর্ষের সংযোগ বাস্তবভিত্তিক ও ওতপ্রোত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়ে থাকে। কৃষিভিত্তিক সমাজের জায়গায় বাংলাদেশে প্রতিস্থাপিত হচ্ছে ব্যবসা, শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ, মানুষের জীবনযাত্রা বদলাচ্ছে দ্রুত, স্থানান্তর দ্রুত বর্ধমান। তবুও পহেলা বৈশাখ অমলিন। বরং এটি নতুন রূপে, নতুন প্রেক্ষাপটে নিজেকে পুনর্গঠন করেছে, বিকশিত করেছে, অভিযোজিত হয়েছে। এই রূপান্তর প্রক্রিয়াটি অনিবার্য। সংস্কৃতি স্থির নয়; সবসময় পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে এগোয়। কিন্তু তা মূলের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা তৈরি না করে বরং পরম্পরার সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে বিবর্তিত হয়। পহেলা বৈশাখের ক্ষেত্রেও আমরা সেটাই দেখি। দ্রুত সম্প্রসারণশীল শহরাঞ্চলের শোভাযাত্রা, মঞ্চের অনুষ্ঠান, গণউৎসব এসব সাম্প্রতিক সংযোজন হলেও বর্ষবরণ উৎসবের অন্তর্গত চেতনা অপরিবর্তিত রয়েছে সম্মিলন, পুনর্নির্মাণ, বিনিময় ও সৌহার্দ্য।

গ্রামবাংলার বৈশাখীঢ মেলায় অর্থনীতি, সংস্কৃতি, বিনোদন, সামাজিক সম্পর্ক সবকিছু একসঙ্গে ব্যক্ত হয়। একজন পরম্পরাজাত কারিগরের জন্য এটি বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, একজন ঐতিহ্যসঞ্জাত সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি নির্মাতার জন্য এটি সৃজনশীলতা প্রকাশের সর্ববৃহৎ ক্ষেত্র। এমনকি মৃৎশিল্প, বাঁশ-বেতের শিল্প, লাঠিখেলা, ঐতিহ্যবাহী খাবার ইত্যাদির মতো বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা ঐতিহ্য ফিরে ফিরে আসে পহেলা বৈশাখে। আমরা বিলুপ্ত ও বিলুপ্তপ্রায় পালকি, হুক্কা, শিকা, সরা ইত্যাদির রেপ্লিকা পাই বৈশাখী মেলায়। প্রত্যেক নাগরিকের জন্য পহেলা বৈশাখ আনন্দের উৎস হয়ে ওঠে। এখানে মানুষ একটি সামষ্টিক অভিজ্ঞতা বিনিময় করে এবং নতুন অভিজ্ঞতায় পুষ্ট হয়।

সংস্কৃতি কখনো জোর করে প্রতিষ্ঠা করা যায় না, আবার জোর করে দমনও করা যায় না। এটি মানুষের অভ্যাস, বিশ^াস ও আনন্দের ভেতর দিয়ে নিজস্ব গতিতে প্রবাহিত হয়। যখন এর ওপর বাহ্যিক চাপ সৃষ্টি করা হয়, তখন তা বিকৃত হয়, তবে বিলুপ্ত হয় না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বড়জোর অবদমিত রূপে রয়ে যায়—পুনরায় জেগে ওঠার জন্য। পহেলা বৈশাখের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, সব ধরনের চাপের মধ্যেও মানুষ এই উৎসবকে জীবন্ত রেখেছে।

এই আঁকড়ে ধরা নিছক আবেগের বিষয় নয়, আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। এর ওপর যখন আঘাত আসে তা কেবল একটি উৎসবের স্বাভাবিকতা নষ্ট করে না, বরং সমষ্টির পরিচয় বিকৃত করতে চায়। বর্তমান বাস্তবতায় বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে বহু জাতিগোষ্ঠী, ভাষা ও অপরাপর সাংস্কৃতিক উপাদান সহাবস্থান করছে। এই বহুত্বই আমাদের শক্তি, আবার একইসঙ্গে চ্যালেঞ্জ। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো তৈরি না হলে এই বৈচিত্র্য সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যার লক্ষণ প্রায়শই প্রকট হয়ে উঠতে দেখি আমরা। পহেলা বৈশাখ এই জায়গায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, কারণ এই উৎসবে এমন এক বৃহৎ ক্ষেত্র তৈরি হয়, যেখানে ভিন্নতাপূর্ণ মানুষ অভিন্ন অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে। এই অভিন্নতা আসলে ভিন্নতার মধ্যকার সংযোগ। এই প্রক্রিয়াতেই একটি সমন্বিত সামাজিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা পেতে পারে, যেখানে ভিন্নতা স্বীকৃত হয়, কিন্তু বিদ্বেষ, বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় না।

এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কীভাবে এই উৎসবকে ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাব। এর জন্য প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। একদিকে আমাদের ঐতিহ্যকে সম্মান করতে হবে, অন্যদিকে পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু এই দুইয়ের মধ্যে কোনো সংঘাত অনুমোদন করা যাবে না। বরং এমন একটি পথ খুঁজে নিতে হবে, যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতা সহাবস্থান করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনের রীতিকে স্বাভাবিক গতিতে চলতে দেওয়া। মানুষের অংশগ্রহণ, আনন্দ, সৃজনশীলতা—এ সবই এই উৎসবের প্রাণ। এগুলোর ওপর কোনো ধরনের অযাচিত নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিপরীতে প্রয়োজন একটি উন্মুক্ত পরিবেশ, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে, নির্দ্বিধায় আত্মবিশ্লেষণ এবং আপন সংস্কৃতি পুনর্নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠা করতে পারে। পহেলা বৈশাখ আমাদের শেখায়, একটি সমাজের শক্তি তার বৈচিত্র্যে, তার সম্মিলনে, তার সামষ্টিক চেতনায়।

শেষ পর্যন্ত, পহেলা বৈশাখ আমাদের একটিই কথা বলে—মানুষ হিসেবে একসঙ্গে বাঁচতে হলে আমাদের একটি অভিন্ন অনুভব দরকার, একটি অভিন্ন মঞ্চ দরকার। পহেলা বৈশাখ সেই মঞ্চ, সেই অনুভব।

লেখক: গল্পকার, অনুবাদক ও ফোকলোর বিশ্লেষক