উচ্ছ্বাসমুখর আয়োজনে নতুন বছর ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে স্বাগত জানাল বাংলাদেশ। গত মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখ এক সর্বজনীন উৎসবে শরিক হন ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সব জনগোষ্ঠীর মানুষ। রাজধানী ঢাকায় বর্ণিল আয়োজনের পাশাপাশি সারা দেশে ছিল নানামাত্রিক অনুষ্ঠানমালা। শুধু বাংলাদেশ নয়, নিউইয়র্কের প্রাণকেন্দ্র টাইমস স্কয়ার ও জ্যাকসন হাইটসসহ বিশ্বের দেশে দেশে যেখানে ছড়িয়ে আছে বাঙালিরা, সেখানেই উচ্ছলতায় আনন্দে স্বাগত জানানো হয়েছে নতুন বছরকে। দেশের পার্বত্যাঞ্চল ও সমতলে বসবাসকারী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষও নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নববর্ষ উদযাপন করেছে।
বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নিতে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
বর্ণিল আয়োজনে ঘোষিত হয়েছে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়। অশুভ শক্তি প্রতিহত করে ভয়মুক্ত পরিবেশে দেশজ সংস্কৃতি লালনের লক্ষ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয় অনুষ্ঠানগুলো থেকে।
ভোরের আলো ফোটার আগেই রমনার বটমূলে ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বৈশাখী আয়োজন। রাজধানীবাসীর বর্ষবরণের আরেক অন্যতম অনুষঙ্গ ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ বের হয় সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে। অন্যদিকে রাজধানীর ধানমন্ডির ২৭ নম্বরে বর্ষবরণ পর্ষদ আয়োজন করে বর্ণিল ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। রবীন্দ্র সরোবরে আয়োজন করা হয় ‘হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ’ অনুষ্ঠান। এ রকম রাজধানীজুড়ে ছিল বহুমাত্রিক আয়োজন। রাজধানী ঢাকা উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছিল। রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ, হাতিরঝিল, ধানমন্ডি-গুলশান-বনানী লেকপার বিকালের দিকে বর্ণিল পোশাক পরা মানুষের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে।
ভেপসা গরমে অস্বস্তি নিয়েই মানুষ অনুষ্ঠানমালায় অংশ নেয়। তবে সূর্যের তাপ কিছুটা কমে এলে মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে ঘুরে-বেরিয়ে দিনটি উপভোগ করেন। যদিও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসারে সন্ধ্যার পরই অনুষ্ঠানমালা বন্ধ হয়ে যায়।
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বর্ষবরণের নানা আয়োজনের মধ্যে জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক দল, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের আয়োজন ছিল উল্লেখযোগ্য।
বিকেলে শোভাযাত্রা করে জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। ‘দেশীয় সাংস্কৃতিক সংসদ’র ব্যানারে রাজধানীতে বৈশাখী শোভাযাত্রা করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
ঢাবি চারুকলার ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ : ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ প্রতিপাদ্যে সকালে বর্ণিল ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ বের হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদ থেকে। এটি শাহবাগ ঘুরে টিএসসি-দোয়েল চত্বর হয়ে ফিরে আসে। ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম ও সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এতে নেতৃত্ব দেন।
এবারের শোভাযাত্রার প্রধান মোটিফ ছিল পাঁচটি। এর মধ্যে নতুনের সূচনা ও অন্ধকার বিনাশের প্রতীক হিসেবে ছিল ‘মোরগ’; যা গণতান্ত্রিক ভোরের প্রতীক। লোকজ ঐতিহ্য ও শক্তির প্রতীক হিসেবে ‘হাতি’, গ্রামীণ স্মৃতি জাগানিয়া টেপা পুতুলের আকৃতির ‘ঘোড়া’, শান্তি ও সহাবস্থানের বারতার প্রতীক ‘পায়রা’ এবং বাউল সংস্কৃতির সংহতি ও তাদের ওপর হামলার প্রতিবাদ স্বরূপ ‘দোতারা’। আরও ছিল পাঁচটি পটচিত্র। যেসব পটচিত্রে সুন্দরবনের ‘দেবী বনবিবি’, সম্রাট আকবর, বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গাজীর পট এবং মনসামঙ্গলের ‘বেহুলা’র চরিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়।
এ ছাড়া ১৫০ ফুট দীর্ঘ স্ক্রল পেইন্টিং এবং বাঘ, মাছ, ময়ূর ও হরিণ শাবকের প্রতিকৃতির পাশাপাশি ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু বলাৎকারের বিরুদ্ধে সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলো’, ‘বাঁচাও সুন্দরবন’, ‘ফসলের লাভজনক মূল্য দাও’, ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’, ‘গণহত্যাকারীদের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করো’, ‘মুক্ত করো ভয়’ ও ‘মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করো’সহ নানা সেøাগান সংবলিত প্ল্যাকার্ড এবারের শোভাযাত্রাকে বৈচিত্র্যময় করে তোলে।
শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের হাতে নানা ধরনের প্ল্যাকার্ড ও রঙিন মুখোশ, শোভাযাত্রাকে প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর করে তোলে। ঢাকের তালে তালে এগিয়ে চলা এই শোভাযাত্রা বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির বহুমাত্রিক প্রকাশ ঘটায়।
আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্য, কৃষক, জেলে ও ঢোলবাদকদের অংশগ্রহণ শোভাযাত্রায় ভিন্নমাত্রা যোগ করে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্য ছাড়াও সাধারণ মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে শোভাযাত্রায় অংশ নেন।
শোভাযাত্রা ঘিরে ছিল কয়েক স্তরের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। শুরুতে ছিল পুলিশের অশ্বারোহী দল। এরপর পর্যায়ক্রমে ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, জাতীয় পতাকা হাতে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী, রোভার স্কাউটসহ প্রক্টরিয়াল টিম।
রবীন্দ্র সরোবরে ‘হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ’: ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সুরের ধারা ও চ্যানেল আই। খ্যাতিমান রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার নেতৃত্ব আয়োজিত অনুষ্ঠানে গান করেন রফিকুল আলম, ফাহিম হোসেন চৌধুরী, কিরণ চন্দ্র রায়, স্বাতী সরকার প্রমুখ। শিল্পী কোনাল পরিবেশন করেন শাহ আবদুল করিমের গান। আবৃত্তি পরিবেশন করেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম।
মঙ্গল শোভাযাত্রা : ‘জাগাও পথিকে, ও সে ঘুমে অচেতন’ এই প্রতিপাদ্য নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা ও দিনব্যাপী উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বর্ষবরণ পর্ষদ। ধানমন্ডি-২৭ নম্বর সড়কে সকালে বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। এতে অংশ নেন খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী, অধ্যাপক আবুল বারক আলভী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ-ডাকসু’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুব জামান, শিল্পী মুনিরুজ্জামান, শিল্পী কামাল পাশা চৌধুরী প্রমুখ। মিনা বাজারের সামনে স্থাপিত মঞ্চে দিনব্যাপী পরিবেশিত হয় গান, আবৃত্তি, নৃত্য, মূকাভিনয় প্রভৃতি।
শিল্পকলা একাডেমির পাঁচ দিনের আয়োজন শুরু : পাঁচ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার অংশ হিসেবে বিকালে শিক্ষা ভবনের সামনে থেকে বের হয় বর্ণিল শোভাযাত্রা। এতে অংশ নেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা, একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন, সচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন প্রমুখ। সন্ধ্যায় জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে শতকণ্ঠে জাতীয় সংগীত এবং বৈশাখ আবাহনের গান পরিবেশিত হয়। আরও ছিল তারকা শিল্পীদের ব্যান্ড সংগীত পরিবেশনা। একাডেমির মাঠে ছিল বৈশাখী মেলা। বৈশাখী অনুষ্ঠানমালা এবং গ্রামীণ খাবার ও লোকজ পণ্যের মেলা ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে।
বাংলা একাডেমিতে মেলা, বইয়ের আড়ং ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী : একাডেমি প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে সাত দিনের বইয়ের আড়ং এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের বৈশাখী মেলা। উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
আলোকচিত্রি শিল্পী নাসির আলী মামুনের ৬৭তম একক প্রদর্শনী ‘ফটোজিয়াম : স্মৃতি-বিস্মৃতির মুখচ্ছবি’ উদ্বোধন হয়েছে একাডেমির বর্ধমান হাউসে। উদ্বোধন করেন চিত্রশিল্পী মনিরুল ইসলাম। চলবে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত।
সকালে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে নববর্ষ বক্তৃতা করেন ড. ওয়াকিল আহমদ। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে জারি গান পরিবেশন করেন শিল্পী সাইদুর রহমান বয়াতি ও তার দল।