 ওরে বিহঙ্গ...

আদুরে পাখি বাবুনাই

বিরল ও দুর্লভ কিছু পাখির জন্য দুদিন ধরে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বিভিন্ন স্পষ্টে অমানুষিক কষ্ট করছি। কিন্তু সে তুলনায় অর্জন খুবই কম। দুদিনে মাত্র একটি লাইফারের (প্রথমবার দেখা পাখি) ছবি তুলতে পেরেছি। আর দুটির শুধু ডাক শুনেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। তবে, চার প্রজাতির পাখির ভালো ছবি তুলতে পেরেছি, যার মধ্যে অন্তত তিনটি পাখির আগে তোলা ছবিগুলো ছাপার উপযোগী ছিল না। যাহোক দুদিনের কষ্টের পর দ্বিতীয় দিন বিকেলে মোড়া পেতে লেবু বাগানের পাশে ছড়ার পাড়ে দলবেঁধে বসলাম পাখিদের গোসলের ছবি তুলতে। এই ছবিগুলো তোলা হয়ে গেলেই আপাতত হাজারিখিলের মিশন শেষ।

বিকেল তখন ৪টা ৭ মিনিট। কালো-সাদা ছোট্ট ক’টি পাখি এসে ছড়ায় পড়ে থাকা শুকনো লেবুর ডালে বসল। চারদিক ভালোভাবে দেখে নিয়ে নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে দু’মিনিট পর পাখিগুলো ছড়ার মাঝখানে নুড়ি পাথর জমে যে ছোট্ট দ্বীপের মতো তৈরি হয়েছে সেখানে নামল। মাত্র তের সেকেন্ড পরে চোখে সাদা বলয়যুক্ত অতি সুন্দর ছোট্ট এক হলুদ পাখি নামল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দু’প্রজাতির পাখিরই আরও সঙ্গীসাথী এসে জুটল। নুড়ি পাথরের ক্ষুদ্র দ্বীপ থেকে চমৎকারভাবে পানিতে নেমে গোসল করতে লাগল। অবশ্য আরও ক’টি হলুদ পাখি পাশে পোতা একটি সরু বাঁকা ডালে বসে ওখান থেকে চমৎকারভাবে অনেকটা ডাইভ মেরে পানিতে নেমে গোসল করতে থাকল।

হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ছোট ও বড় পুকুরে শীতের সময় বিভিন্ন প্রজাতির আবাসিক ও পরিযায়ী পাখির সঙ্গে ছোট্ট হলুদ পাখিগুলো গোসলে নামে। সাতছড়িতে ওদের গোসলের প্রচুর ছবি তুলেছি। তবে সেখানকার টাওয়ারের পাশের মান্দার গাছের টকটকে লাল ফুলের রস পানের সময় তোলা ছবির জুড়ি মেলা ভার। সে তুলনায় পুকুরে গোসলের ছবি একবারেই সাদামাটা। কিন্তু হাজারিখিলের কথা আলাদা। এখানকার ছড়ায় চমৎকার আলো। সেই আলোতে হলুদ পাখিগুলোর গোসলের দৃশ্যও চমৎকার। তবে, বার্ডিংবিডি ট্যুরসের অন্য পক্ষী আলোকচিত্রীরা বহুক্ষণ ধরে ওখানে ছবি তুললেও আমি একটানা দশ মিনিটের বেশি থাকতে পারলাম না। এর মধ্যেই চমৎকার ক’টি ছবি তুলে পাশের উঁচু গাছটাতে ভুতুম প্যাঁচা দেখতে চলে গেলাম। এ বছরের ২৭ মার্চের ঘটনা এটি।

ছোট্ট, সুন্দর আদুরে পাখিটি এদেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক শাখাচারী পাখি বাবুনাই। চোখের চারদিক ঘিরে সাদা বলয় দেখে মনে হয় যেন চশমা পড়ে আছে। তাইতো চশমা পাখি, চশমা টুনি বা শ্বেতাক্ষী নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম ওহফরধহ ডযরঃব ঊুব। জুস্টারোপিডি (তড়ংঃবৎড়ঢ়রফধব) গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম তড়ংঃবৎড়ঢ়ং ঢ়ধষঢ়বনৎড়ংঁং (জুস্টারপস প্যালপ্যাব্রোসাস)। বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশের আবাসিক পাখি এটি।  

বাবুনাই এদেশের অন্যতম ছোট পাখি। সবচেয়ে ছোট পাখি ফুলঝুরির বিভিন্ন প্রজাতির পরই ওর স্থান। মাত্র ৮-৯ সেন্টিমিটার লম্বা ও ৯ গ্রাম ওজন। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথা ও পিঠ হলুদাভ-জলপাই। ডানা ও লেজ কালচে। গলা, বুকের উপরাংশ ও লেজের তলা উজ্জ্বল হলুদ। বুক ও পেট সাদা। চোখের সাদা বলয়ের নিচ ও নেত্রের কোনায় কালচে দাগ। চোখ বাদামি-হলুদ। ঠোঁট কালচে ও নিচের ঠোঁটের গোড়া বাদামি। পা, পায়ের পাতা ও নখ ধূসর-বাদামি। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। ছানাদের চোখে চশমা থাকে না।

 বাবুনাই দেশব্যাপী বিস্তৃত। গ্রাম, শহর, পার্ক, ফুল বাগান, বাদাবনসহ অন্যান্য বন, সবখানেই আছে। সচরাচর জোড়ায় বা দলে বিচরণ করে। এরা পুরোপুরি বৃক্ষচারী, গাছের শাখায়-পাতায়-ফুলে লাফিয়ে লাফিয়ে ও উড়ে উড়ে খাদ্য সংগ্রহ করে। কখনো কখনো উল্টো হয়ে ডালে ঝুলে ফুলের নির্যাস পান করে বা ফল খায়। কীটপতঙ্গ, রসালো পোকা, কুঁড়ি, ফুলের নির্যাস, পাকা ফল, বীজ ইত্যাদি প্রিয় খাদ্য। ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খেয়ে এবং ফুল-ফলের পরাগায়ণ ঘটিয়ে প্রকৃতিকে সজীব রাখে। মূলত প্রজননের সময় গান গায়। ক্ষীণ স্বরে ‘প্রি-উ--প্রি-উ--প্রি-উ--’ শব্দে ডাকে। 

এপ্রিল থেকে মে প্রজননকাল। এ সময় এরা গাছের সরু শাখায় সরু শেকড়, মাকড়সার জাল ইত্যাদি দিয়ে গোলাকার ঝুলন্ত বাসা বানায়। ডিম পাড়ে ২-৩টি, রঙ ফ্যাকাশে নীল যা ফোটে ৯-১১ দিনে। ডিমে তা দেওয়া ও ছানাদের লালন-পালনের কাজ বাবা-মা মিলেমিশে করে। ছানারা প্রায় ১০ দিনে উড়তে শেখে ও বাসা ছাড়ে। আয়ুষ্কাল প্রায় সাত বছর।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়