জানুয়ারি নয়, মার্চে আগামী এসএসসি পরীক্ষা

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫০ এএম

পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতরের কারণে ২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত হতে পারে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী বছরের এসএসসি জানুয়ারিতে অনুষ্ঠানের যে সিদ্ধান্ত সম্প্রতি নেওয়া হয়েছিল তা থেকে সরে আসার বিষয়ে গত কয়েকদিন ধরে আলাপ চলছে। তিনি বলেন, আগামী মার্চ বা এপ্রিলের শুরুতে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হতে পারে। পবিত্র রমজান ও অভিভাবকদের মতামত বিবেচনায় নিয়ে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক বুধবার রাতে দেশ রূপান্তরকে জানান, এখনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি, তবে এসএসসি পরীক্ষা জানুয়ারিতে হচ্ছে না, তারিখ পরিবর্তন হবে।

দীর্ঘদিন ধরে পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি নিয়ে একধরনের অনিশ্চয়তা চলে আসছে। নির্ধারিত সময়ে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা না নেওয়া ও ঘন ঘন তারিখ পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীদের মনোজগতে চাপ পড়ে, অভিভাবকরাও চাপে পড়েন। তারা মনে করেন, সরকার যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয় তখন তা ভালো করে চিন্তাভাবনা করে নেওয়া উচিত। হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত জানানো এবং তা পরিবর্তন করার মানসিকতা পরিহার করা উচিত।

নটর ডেম কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও শিক্ষাবিদ এএনকে রাশেদা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সরকার শিক্ষার্থীদের নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবে না। যে কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে ক্রেডিট নেওয়া শুরু করে। গত মে মাসে শিক্ষামন্ত্রী যখন এসএসসি পরীক্ষা জানুয়ারিতে নেওয়ার ঘোষণা দেন তখনো এর সমালোচনা হয়। এখন তিন মাস পর মন্ত্রণালয় আবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করছে। সরকার যদি দায়িত্বশীল জায়গা থেকে এমন সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে তা হতাশাজনক। সরকারের এই সিদ্ধান্ত প্রচার হওয়ার পর আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মনোজগতে প্রভাব পড়বে।’

তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করে পরীক্ষা এগিয়ে আনা কিংবা পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ২০ লাখ শিক্ষার্থীর মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আগামী বছর যারা এসএসসি পরীক্ষায় বসবে তারা ইতিমধ্যে দশম শ্রেণিতে পড়ছে, তাদের জন্য বারবার সময়সূচি পরিবর্তনের খবর মানসিক ধাক্কা হিসেবে কাজ করতে পারে। এবার যারা অষ্টম শ্রেণিতে আছে তারা কখন এসএসসি পরীক্ষা দেবে তা নিয়ে সরকারের চিন্তা করা উচিত। এ নিয়ে গবেষণা করে তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলে ইতিবাচক হবে।’

এর আগে গত মে মাসে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন আগামী বছরের এসএসসি ও এইচএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ দুটি পাবলিক পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেছিলেন। এর পর সম্ভাব্য সময়সূচিও সাংবাদিকদের দেওয়া হয়। তাতে ২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ওই বছরের ৭ জানুয়ারি শুরু হয়ে ৬ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার কথা বলা হয়েছিল। আর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ৬ জুন শুরু হয়ে ১৩ জুলাই পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে রমজান মাস শুরু হতে পারে। সে হিসাবে রমজান শেষে ঈদুল ফিতর উদযাপন হবে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে। তাই ৭ জানুয়ারি এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরুর সিদ্ধান্তে পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, একসময় ফেব্রুয়ারিতে এসএসসি ও সমমান ও এপ্রিলে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা আয়োজন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু কোভিডের সময় পরীক্ষা নিয়ে নানা অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। কোভিডের পর কখনো ফেব্রুয়ারি, কখনো বা মার্চ-এপ্রিলে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। কিছুদিন আগে শিক্ষামন্ত্রী বললেন, পরীক্ষা জানুয়ারিতে হবে, এখন আবার বলছেন মার্চে হবে। এভাবে সিদ্ধান্ত বদলালে শিক্ষার্থীরা দ্বিধায় পড়ে যায়। তাছাড়া শিক্ষকরা একটা চিন্তাভাবনা থেকে পাঠ দান করেন। শিক্ষকদের পাঠদান পরিকল্পনায় সরকারের সিদ্ধান্ত প্রভাব ফেলছে।

আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষা দেবেন সোহেল ইসলাম হিমেল। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি এক ধরনের শিক্ষাক্রমে। এরপর নবম শ্রেণিতে উঠে আবার পুরনো ২০১০ সালের শিক্ষাক্রমে পড়তে হয়। আবার নবম শ্রেণিতে উঠে বই পেতে পেতে মার্চ মাস চলে আসছিল। একটা ব্যাচের শিক্ষার্থীদের যদি এত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় তাহলে তা আমাদের দ্বিধায় ফেলে দেয়, প্রস্তুতিতে ঘাটতি হয়। জানুয়ারিতে পরীক্ষার ঘোষণা শুনে আব্বু বাড়তি টিউটরের ব্যবস্থা করেছিলেন।’

অনেকদিন ধরেই এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা এগিয়ে নিয়ে আসার কথা বলছেন শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, এতে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার সমন্বয় করা সহজ হতো এবং শিক্ষার্থীরা এসএসসি, এইচএসসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে মাঝখানে যে লম্বা গ্যাপ তৈরি হচ্ছিল, তা কিছুটা হলেও কমানো যেত। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে পাবলিক পরীক্ষা নেওয়া গেলে তা শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক হবে। এ অবস্থায় আগামী বছরের পরীক্ষা এগিয়ে আনার উদ্যোগ নেয় শিক্ষা বিভাগ। এর আগে ২০২৭ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা ডিসেম্বরে নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরে অংশীজনদের নিয়ে আয়োজিত সভায়ও ডিসেম্বরে পরীক্ষা না নেওয়ার পক্ষে মত আসে। এরপর আগামী বছরের এসএসসি পরীক্ষা জানুয়ারিতে এবং এইচএসসি জুনে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

অভিভাবক হাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘সবার প্রস্তুতি নিয়ে একটা পরিকল্পনা থাকে। অভিভাবক হিসেবে আমাদের চিন্তা করতে হয় কীভাবে নির্দিষ্ট সময়ে সিলেবাস শেষ করা যায়। সরকারের উচিত যেকোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সময় নিয়ে পরিকল্পনা করা।’

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতামত বিবেচনায় নিয়ে এসএসসি পরীক্ষা মার্চ মাসে শুরুর বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আবার পূর্ব ঘোষিত তারিখেও পরীক্ষা হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কোনোটাই এখনো ফাইনাল হয়নি। শিগগিরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে।’

বারবার সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হলে শিক্ষার্থীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সময় এগিয়ে নিয়ে এলে তারা চাপে পড়বে। ফলে খারাপ প্রভাব তৈরি হতে পারে। কিন্তু যখন সময় পেছানো হয় তখন তারা বাড়তি সময় পায় প্রস্তুতি নিতে। পরীক্ষার সময় আগানো বা পেছানো যাই হোক তা শিক্ষার্থীদের দাবির ভিত্তিতে যেটা ভালো হয় সরকার সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত