জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের ১৫ বিশিষ্ট ব্যক্তি ও পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬’ পদক তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আয়োজনে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এই পদক তুলে দেন তিনি। পদক বিতরণ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে নিজ দপ্তর থেকে হেঁটে ওসমানী মিলনায়তনে যান। এ সময় রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানান।
পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার পদক গ্রহণ করেন তার নাতনি জাইমা রহমান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে দাদির পদকটি নেন তিনি। ‘স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও নারী শিক্ষাসহ দেশ গঠনে’ সার্বিক অবদানের জন্য পুরস্কারটি পেয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এবার খালেদা জিয়াসহ মরণোত্তর এ সম্মাননা পেয়েছেন সাত জন। বাকিরা হলেন মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য মেজর মোহাম্মদ আবদুল জলিল, সাহিত্যে ড. আশরাফ সিদ্দিকী, সমাজসেবায় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও মাহেরীন চৌধুরী, সংস্কৃতিতে বশির আহমেদ এবং জনপ্রশাসনে কাজী ফজলুর রহমান। পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ, চিকিৎসাবিদ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ, পল্লী উন্নয়নে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ), জনসেবায় এসওএস শিশুপল্লী ও গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র পাচ্ছে স্বাধীনতা পুরস্কার। পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে আরও আছেন বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে অধ্যাপক ড. জহুরুল করিম, সংস্কৃতিতে এ কে এম হানিফ (হানিফ সংকেত), ক্রীড়ায় জোবেরা রহমান (লিনু), সমাজ সেবায় সাইদুল হক, গবেষণা ও প্রশিক্ষণে মোহাম্মদ আবদুল বাকী, অধ্যাপক ড. এম এ রহিম, অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া এবং পরিবেশ সংরক্ষণে আবদুল মুকিত মজুমদার (মুকিত মজুমদার বাবু)।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বক্তব্যে বলেন, প্রতিশোধ প্রতিহিংসা কিংবা আর অযথা বিতর্ক নয়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বলতেন, ‘জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা’। সেই কথা স্মরণ রেখেই বলতে চাই, আমাদের মত পথ ভিন্ন হতে পারে, আমাদের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্ক বিরোধ থাকতে পারে, তবে আমাদের মধ্যকার বিতর্ক বিরোধ যেন শত্রুতায় রূপ না নেয় দেশের স্বার্থে সে ব্যাপারে আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী চক্র কিন্তু এখনো সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘শুরুতেই আমি বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধে বীর শহীদদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে চাই, যাদের আত্মত্যাগে আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধে যারা আহত হয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন, সেসব আহত পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধার প্রতি আমাদের গভীর ভালোবাসা। তাদের উদ্দেশে বলতে চাই, আপনাদের সাহসী ভূমিকা এখনো বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষের জন্য প্রেরণা।১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালে দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ/এভাবে দেশের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে যারা জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।’ তিনি আরো বলেন, আজকের এই অনুষ্ঠানে আমি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানসহ স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সব জাতীয় নেতার ভূমিকা এবং অবদানকে শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসায় স্মরণ করছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্নীতি দুঃশাসনে পর্যুদস্ত একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল শাসন কাঠামো আর অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনজীবনে শান্তি নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে আমাদের সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। বাংলাদেশের বর্তমানে এক বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী রয়েছে। কর্মক্ষম এই জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করাই এই মুহূর্তের বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু অর্থনীতিই নয়, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়ও বিপর্যয় নেমে এসেছিল। ’
তিনি বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যেই জনগণের সামনে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি। আমরা দলীয় ইশতেহার এবং স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের প্রতিটি দফা প্রতি অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করব ইনশাআল্লাহ। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থির মধ্যেও আমরা সব কিছু স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি। বিশ্বের সব দেশে তেল ডিজেলের দাম বাড়ানো হলেও আমরা জনদুর্ভোগ বর্তমান সরকার দাম বাড়ায়নি। এই খাতে প্রতিদিন শত কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে হলেও সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। জনগণের সুবিধা নিশ্চিত রাখতে সরকার সম্ভাব্য সব প্রকার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। কারণ, বর্তমান সরকার জনগণের সরকার। জনগণের কাছে দায়বদ্ধ সরকার।’
তিনি বলেন, ‘ইন্টেরিম সরকারের সময়েও শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরেনি দুঃখজনকভাবে । বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে দেশে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক এবং কর্মমুখী করতেই হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী করার কাজটিও আমরা ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছি। দেশে অর্ধেকের বেশি নারী। নারীদের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে না পারলে আমাদের কোনো উদ্যোগই সহজে সফল হবে না। এভাবে প্রতি সেক্টরকে চিহ্নিত করে সরকার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে।
অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। এতে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান ও খালেদা জিয়ার বোন সেলিমা ইসলাম। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, বিচারপতি, তিন বাহিনী প্রধান ও ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা। গত ৫ মার্চ চলতি বছরের স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীতদের নাম ঘোষণা করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
স্বাধীনতা পুরস্কার দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সরকার এ পুরস্কার দিয়ে আসছে ১৯৭৭ সাল থেকে। পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় ১৮ ক্যারেট মানের ৫০ গ্রাম স্বর্ণের পদক, পদকের একটি রেপ্লিকা, ৩ লাখ টাকা ও একটি সম্মাননাপত্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ প্রবর্তন করেছিলেন।