দুই মেরুর দুই দলের একটাই লক্ষ্য

শীর্ষ ক্রিকেটাররা ভারত ও পাকিস্তানে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলতে ব্যস্ত, তাই পরের স্তরের ক্রিকেটারদের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশে পাঠিয়েছে নিউজিল্যান্ড।  ২০২৭ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলতে হলে থাকতে হবে ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষ ৯ দলের ভেতর, তাই তো পাকিস্তান সুপার লিগে সুযোগ পাওয়া ক্রিকেটারদের দেশে ফিরিয়ে এনেছে বাংলাদেশ। এই দুটো সিদ্ধান্তই বলে দেয়, দুই দলের ভেতর কতখানি পার্থক্য। বাংলাদেশ দলে বেশিরভাগ ক্রিকেটারেরই অভিজ্ঞতার ঝুলি উপচে পড়ছে, নিউজিল্যান্ড দলের বেশিরভাগ ক্রিকেটার খেলেছেন দুই থেকে তিনটা আন্তর্জাতিক ম্যাচ। এমন বিপরীতমুখী দুই দলের দুই অধিনায়ক, মেহেদী হাসান মিরাজ এবং টম ল্যাথাম দুজনেই সিরিজ জয়ের ব্যাপারে সমান আশাবাদী, এই একটা জায়গাতেই তাদের মিল খুঁজে পাওয়া গেল। শুক্রবার মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড ওয়ানডে সিরিজ, ৩ ম্যাচের সিরিজের প্রথমটি আজ। খেলা শুরু হবে সকাল ১১টায়, সরকারের জ্বালানি সাশ্রয় নীতির কারণে ফ্লাডলাইটে ম্যাচ আয়োজনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।

মিরাজ অফস্পিন করেন, ব্যাটিংটাও মন্দ করেন না। কখনো ইনিংসের সূচনায় নেমেছেন, কখনো শেষভাগে। ব্যাট ও বল হাতে মিরাজ যতটা সাবলীল, ততটাই নিষ্প্রভ মাইক্রোফোনের সামনে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেন একই কথা, যার দাঁড়ায় না স্পষ্ট কোনো অর্থ। থাকে না কোনো বার্তা। মিরাজই কিছুদিন আগে গণমাধ্যমে বলেছেন যে মুশফিকুর রহিমকে ওয়ানডে দলে ফিরে পেলে ভালো হবে। বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে তাকে এই প্রশ্ন করলে যে উত্তরটা তিনি দিয়েছেন, তাতে হ্যাঁ কিংবা না কিছুই স্পষ্ট নয়। সাকিব আল হাসানকে বাংলাদেশ দলে ফেরানোর চেষ্টা করছে বিসিবি, অধিনায়ক হিসেবে এ ব্যাপারে তার অবস্থানটা কী সেটাও মিরাজ পরিষ্কার করতে পারেননি। প্রায় মিনিট বিশেক চলা সংবাদ সম্মেলনে অনেক প্রশ্নেরই উত্তর দিয়েছেন মিরাজ, কিন্তু কোনো উত্তরেই ‘বাইট’ নেই। সবই ভালো খেলব, ভালো খেলেছি, আরও ভালো খেলতে হবে গোছের কথাবার্তা। বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল কিছুদিন আগেও ছিলেন মিরাজের সতীর্থ, এই ব্যাপারে তার উত্তরটা অবশ্য বেশ গোছানো, ‘যেহেতু আমরা একসঙ্গে ক্রিকেট খেলেছি, তিনি আমাদের সম্পর্কে বেশি ভালো জানবেন। উনি যেহেতু সাম্প্রতিক সময়ে খেলা ছেড়েছেন, আমাদের কী চাহিদা আছে, আমরা কী পছন্দ করি তা জানেন। এটা খেলোয়াড়দের জন্য একটা ইতিবাচক দিক। সভাপতির সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছিল যে আমাদের দল ভালো করছে। আমাদের প্রেরণা দিয়েছেন। বলেছেন আমরা যেভাবে খেলছি, এভাবে ভালো ক্রিকেট খেলতে হবে।’ সাবেক সভাপতি নাজমুল হোসেন পাপনের সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো ছিল মিরাজের, ফোন না ধরায় মনে কষ্টও পেয়েছিলেন আওয়ামী লিগ সরকারের প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী।

পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে ৩ ম্যাচেই একই একাদশ মাঠে নেমেছিল, স্কোয়াডে থাকা অন্যদের এই সিরিজে সুযোগ মিলবে কি না এমন প্রশ্নে মিরাজ বলেছেন, ‘অধিনায়ক হিসেবে আমি চাই একজন ব্যাটসম্যান যেন তার জায়গায় পর্যাপ্ত সুযোগ পায়। সে যেন নিজের বিষয়টা বুঝতে পারে। অধিনায়ক হিসেবে আমার পরিকল্পনা হচ্ছে প্রতিটি ব্যাটসম্যান যেন একই সুযোগ পায়।’ ঐ সিরিজে স্কোয়াডে থাকা ২ জন ব্যাটসম্যান সুযোগ পাননি, একজন সৌম্য সরকার ও অন্যজন উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন। বিসিবি সভাপতি যখন ওয়ানডে অধিনায়ক ছিলেন, তখন সৌম্যকে সাত নম্বরে অলরাউন্ডার হিসেবে খেলানোর চেষ্টা করেছিলেন। একেক সময়ে একেক কোচ তাকে একেক সংস্করণে উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান, ওয়ানডাউনসহ নানান ব্যাটিং পজিশনে সুযোগ দিয়েছেন। ৭৯টা ওয়ানডে ও ৮৭টা টি-টোয়েন্টি খেলা একজন ক্রিকেটারকে যদি তার চেয়েও পরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখা ক্রিকেটারদের কাছে জায়গা হারাতে হয় সেটা নিজের দোষেই। তানজিদ তামিম ও সাইফ হাসান মিলে খেলেছেন মোট ৪০ ওয়ানডে (৩১+৯) যেটা সৌম্যর ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রায় অর্ধেক, বিপিএল এবং বিসিএলে চূড়ান্ত ফ্লপ সৌম্য জাতীয় দলে টিকে আছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৯১ রানের ইনিংসের স্মৃতিতে ভর করে। অঙ্কন স্কোয়াডে আছেন মূলত বিকল্প উইকেটরক্ষক হিসেবে, লিটন দাস চোট পেয়ে স্কোয়াডের বাইরে না গেলে তার খেলার সুযোগ কম। সবাইকে সুযোগ দেওয়া, ভালো খেলার সঙ্গে সিরিজ জিতে র‌্যাংকিংয়ে উন্নতি করাটাও মিরাজের লক্ষ্য, কারণ সেটাই যে প্রশস্ত করবে বিশ্বকাপে যাওয়ার রাস্তা।

২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ পর্যন্ত নেতৃত্বের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে মিরাজের। যদিও বাংলাদেশের সরাসরি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ এখনো অনিশ্চিত। অন্যদিকে বাংলাদেশ সফরে আসা অধিনায়ক ল্যাথামের জন্য পরের সিরিজে দলে থাকাটাই অনিশ্চয়তার। শীর্ষ ক্রিকেটাররা ফিরলে উইকেটের পেছনে দাঁড়াবেন ডেভন কনওয়ে বা টিম সেইফার্ট, নেতৃত্বে আসবেন মিচেল স্যান্টনার। বাংলাদেশ সফর হলেই যেন বারবার ডাক পড়ে ল্যাথামের, এটাকে তিনি মনে করেন নিউজিল্যান্ডকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ হিসেবেই। অনভিজ্ঞদের নিয়ে গড়া দল নিয়ে বাংলাদেশে আসায় নিজের ওপর বাড়তি দায়িত্ব দেখছেন ল্যাথাম, ‘আমাদের দলে এমন খেলোয়াড় আছে যাদের অভিজ্ঞতা একটু কম, বিশেষ করে এই ধরনের কন্ডিশনে খেলার অভিজ্ঞতা কম। তারা যত বেশি বাংলাদেশের মতো জায়গায় সুযোগ পাবে, আমাদের জন্য তত ভালো হবে। আমরা যদি ম্যাচ ধরে ধরে উন্নতি করতে পারি, শেখার প্রক্রিয়াটা চালিয়ে যেতে পারি, সিরিজের শেষ দিকে গিয়ে ভালো সুযোগ তৈরি করতে পারব। যখন দলে অভিজ্ঞতা কম থাকে, তখন আমার মতো যারা একটু বেশি খেলেছি, আর যারা এই কন্ডিশনে আগে খেলেছে, তাদের দায়িত্ব হলো নতুনদের যতটা সম্ভব অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান ভাগ করে দেওয়া। আমরা অবশ্যই পরিকল্পনা, অনুশীলন আর প্রস্তুতির সব কিছুই ঠিকভাবে করতে চাই। তবে ম্যাচে নামার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সামনে যা আসবে, সেটার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে নিজের সেরাটা দেওয়া।’

অভিজ্ঞতা অর্জন, নেতৃত্বের সম্মান সবই থাকবে প্রাপ্তির খাতায়, তবে একই সঙ্গে সিরিজটা জেতারও আশাবাদ ল্যাথামের, ‘আমাদের লক্ষ্যটা তো পরিষ্কার, আমরা এখানে এসেছি সিরিজ জিততে। সবার দৃষ্টিকোণ থেকেই, এটাই মূল লক্ষ্য।’