হকারের জন্য ‘নাইট মার্কেট’

২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের উত্তাল দিনগুলো আমাদের কেবল একটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন উপহার দেয়নি, বরং দেখিয়েছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের স্বপ্ন। সেই আন্দোলনের প্রতিটি স্লোগানে ছিল বৈষম্যহীনতার অঙ্গীকার। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সেই সংস্কারের জোয়ারে ভাসে দেশ নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বসন্তে। এখন বিএনপি সরকারের শাসন। নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরিবর্তনের হাওয়া বইছে সর্বত্র।  ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে রাষ্ট্র হাঁটছে ‘স্মার্ট’ রূপান্তরের পথে। ২০২৬-এর শুরু থেকেই সরকার পরিচালনার ধরনে আধুনিকতার ছাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকার ইতোমধ্যে চালু করেছে বহুল আলোচিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের প্রায় কোটি নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীর হাতে পৌঁছে যাচ্ছে ভাতার টাকা। এটি শুধু একটি প্লাস্টিক কার্ড নয়, বরং নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক নিরাপত্তার এক নতুন হাতিয়ার। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব ভিশন ‘আমার ভাবনায় বাংলাদেশ’-এর অংশ হিসেবে কৃষকদের জন্য আসছে ‘স্মার্ট কৃষক কার্ড’। সার থেকে বীজ, সবকিছুর ন্যায্যমূল্য আর সরাসরি ভর্তুকি নিশ্চিত করতে এই কার্ড যেন এক আধুনিক রক্ষাকবচ।

জানালার কাঁচ যখন ঝকঝকে হয়, তখন পেছন দেয়ালের ফাটলগুলো প্রকট হয়ে ওঠে। ঢাকা শহরের ফুটপাথ দখলমুক্ত করার যে ক্রুসেড চলছে, তার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে বীভৎস আর্তনাদ। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা যখন ফুটপাথ মুক্ত হওয়ার ড্রোন শট বা ভিডিও দেখে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছি, তখন শহরের কোনো অন্ধকার গলিতে বসে তিনবেলা না খেয়ে থাকার দিন গুনছে, হাজার হাজার হকার পরিবার। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও যখন আমরা দেখি বুলডোজার দিয়ে হকারের ঝুপড়িগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন মনে হয়, আমাদের প্রশাসনিক চিন্তাভাবনা এখনো ৫ বা ১০ বছর আগের ‘শাস্তিমূলক’ সংস্কৃতিতে আটকে আছে। প্রশ্ন হলো, সংস্কার কি কেবল শহরকে সুন্দর দেখানোর জন্য, নাকি শহরের মানুষের জীবন সুন্দর করার জন্য? স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে মানুষকে যখন আমরা সামাজিক অধিকার দিচ্ছি, তখন ‘উচ্ছেদ’-এর মাধ্যমে আবার মৌলিক জীবিকা কেড়ে নেওয়া কি চরম স্ববিরোধী নয়? এই উচ্ছেদের ফলে একদল মানুষ যেমন রাতারাতি সর্বস্বান্ত হচ্ছে, তেমনি গ্রাহক হিসেবে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ তাদের সাশ্রয়ী বাজার হারাচ্ছে। ঢাকা শহরে হকাররা কেবল বিক্রেতা নন, তারা একটি বিশাল অর্থনৈতিক চেইন, যা সস্তা পণ্যের জোগান দিয়ে শহরের জীবনযাত্রার খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখে। একটি আধুনিক ও মানবিক রাষ্ট্রে ‘উচ্ছেদ’ আর ‘পুনর্বাসন’ শব্দ দুটি একে অপরের পরিপূরক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে, উচ্ছেদ হয় উৎসবের আমেজ আর ক্যামেরার ঝলকানি ও প্রশাসনিক দাপটে। অথচ মানুষগুলোর পুনর্বাসনের ফাইলটি অবহেলায় থাকে, লাল ফিতার অন্ধকার স্তূপে।

২০২৬ সালের আকাশছোঁয়া প্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়েও কেন আমরা থ্রিফট মার্কেট বা ভেন্ডিং জোনের মতো মানবিক ধারণাগুলোর বাস্তবায়ন করতে পারছি না? ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর বা সিঙ্গাপুরের মতো শহরগুলো যেখানে হকারদের পরম মমতায় আগলে রেখে পর্যটন আকর্ষণে রূপান্তর করেছে, সেখানে আমরা এই মানুষগুলোকে স্রেফ শহরের ‘বোঝা’ কিংবা ‘জঞ্জাল’ মনে করছি। স্মার্ট বাংলাদেশের যে স্বপ্ন আমরা দেখি, সেই রূপরেখায় যদি হকারদের মতো প্রান্তিক মানুষের দুমুঠো ভাতের সংস্থান না থাকে, তবে সেই শহরটি দেখতে ওপর থেকে ঝকঝকে মনে হলেও, এর ভেতরটা হবে ভীষণ যান্ত্রিক আর প্রাণহীন। যে বাবা ফুটপাতের এক কোণে কয়েকটা জামা কিংবা রঙিন প্লাস্টিকের খেলনা সাজিয়ে, তার সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন তাকে কোনো বিকল্প ছাড়া পথে বসিয়ে দেওয়া আর যাই হোক, ‘স্মার্ট’ সমাধান হতে পারে না। আধুনিক বাংলাদেশে অভাবী মানুষের চোখের জলের ওপর দাঁড়িয়ে, আমরা উন্নয়নের আড়ম্বরপূর্ণ সৌধ গড়তে চাই না। এখনই সময় উচ্ছেদের ওই নিষ্ঠুর বুলডোজারগুলোকে থামানো। আমাদের ভাবতে হবে, উচ্ছেদ সমাধান নয়, বরং সঠিক ব্যবস্থাপনাই পারে এক নতুন প্রাণের স্পন্দন জোগাতে। ঢাকার চিরচেনা ট্রাফিক জ্যাম আর ফুটপাতে পথচারীদের জীবনযুদ্ধÑ এ যেন প্রাত্যহিক এক বিষাদময় নিয়তি। কিন্তু একটু সদিচ্ছা আর আধুনিক চিন্তার সমন্বয় ঘটালে, এই বিশৃঙ্খলাকে একটি শক্তিশালী ও মানবিক অর্থনৈতিক মডেলে রূপান্তর করা সম্ভব। পর্যবেক্ষণ বলে, হকারদের শহরের শত্রু না ভেবে তাদের একটি সুশৃঙ্খল অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করাই হবে, ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় ও সাহসী স্মার্ট পদক্ষেপ। ঢাকার সব ধমনি চব্বিশ ঘণ্টা সচল থাকে না। দিনের যে রাস্তাটি ব্যস্ততায় হাঁপিয়ে ওঠে, রাত নামলে সেটিই আবার নিস্তব্ধতায় ডুবে যায়। আগারগাঁওয়ের প্রশস্ত রাস্তা, শেরেবাংলানগর কিংবা মতিঝিলের ব্যাংকপাড়া রাত ৯টার পর প্রায় জনশূন্য জনপদে পরিণত হয়। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কের প্রশস্ত এলাকার সড়কগুলোকে ‘নাইট মার্কেট’-এর মর্যাদা দেওয়া যেতে পারে। রাত ৭টা বা ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত এসব এলাকায় হকারদের ব্যবসার অনুমতি দেওয়া হোক। এতে দিনের বেলা রাস্তা থাকবে সম্পূর্ণ পরিষ্কার আর রাতে সচল হবে লাখো মানুষের ব্যবসা। এটি বিশ্বের অনেক উন্নত শহরে চলছে। সরকার যেখানে অন্যান্য খাতে কার্ড চালু করেছে, হকারদের জন্যও একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে। প্রতিটি হকারের জন্য একটি স্মার্ট আইডি কার্ড থাকবে, যা তাদের ট্রেড লাইসেন্স হিসেবে কাজ করবে। সিটি করপোরেশন নির্দিষ্ট মাপের এবং দৃষ্টিনন্দন নকশার কিছু ভেন্ডিং কার্ট অনুমোদন করবে। প্রতিটি কার্ডে থাকবে নিজস্ব ‘নম্বর’। এতে কেউ হুটহাট রাস্তার আয়তন বাড়িয়ে দখলদারিত্বের সুযোগ পাবে না। প্রতিটি হকারের কাছে থাকবে কিউআর কোড সংবলিত কার্ড। যদি কোনো হকার নির্ধারিত এলাকার বাইরে গিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে বা অবৈধভাবে রাস্তা দখল করে, তবে তার কিউআর কোড স্ক্যান করে তাৎক্ষণিক জরিমানা এবং দ্বিতীয়বার একই ভুলের জন্য স্থায়ীভাবে কার্ড বাতিলের কঠোর নিয়ম থাকবে। একটি আধুনিক শহর গড়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দূরদর্শিতার পাশাপাশি প্রয়োজন কারিগরি মেধার সমন্বয়। এই নীতিনির্ধারণী আলোচনায় আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যন্ত্রকৌশল বিভাগের প্রাক্তনী ও মেধাবী তরুণ প্রকৌশলী তানভীর আরাফাত ধ্রুব। হকার ব্যবস্থাপনার চিরাচরিত সমস্যার সমাধানে তিনি যে যান্ত্রিক ও প্রযুক্তিগত মডেলের প্রস্তাব করেছেন, তা ২০২৬ সালের স্মার্ট বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য মাইলফলক হতে পারে।

প্রকৌশলী ধ্রুবর চিন্তাশীল উদ্ভাবন কেবল একটি যন্ত্র নয়, বরং এটি মানবিকতা ও প্রযুক্তির এক চমৎকার মেলবন্ধন। তার প্রস্তাবিত ‘কম্প্যাক্ট ফোল্ডেবল স্মার্ট কার্ট’ ডিজাইনটি আমাদের নগর জীবনের বিশৃঙ্খলা দূর করতে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখতে সক্ষম। ধ্রুবর এই সৃজনশীল পরিকল্পনায় তিনটি বিশেষ কারিগরি দিক উঠে এসেছে, যা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। উত্তরা, বনানী কিংবা ডিওএইচএসের মতো পরিকল্পিত আবাসিক এলাকাগুলোতে ডিভাইডার যুক্ত অনেক বড় রাস্তা রয়েছে। এসব রাস্তার একপাশে যান চলাচল স্বাভাবিক রেখে অন্য পাশে নির্দিষ্ট দূরত্ব মেনে হকারদের বসার সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা করা সম্ভব। এই ব্যবস্থার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে স্থানীয় বিল্ডিং মালিক সমিতি বা কমিউনিটির সঙ্গে রাজস্বর একটি অংশ শেয়ার করা যেতে পারে। এতে নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে স্থানীয়রা উৎসাহী হবে এবং হকাররা সামাজিক অবজ্ঞার বদলে সামাজিক মর্যাদা পাবে। বর্তমানে হকারদের কাছ থেকে যে বিপুল পরিমাণ টাকা স্থানীয় মাস্তান বা প্রভাবশালীরা আদায় করে, তার কানাকড়িও সরকারি কোষাগারে যায় না। সিটি করপোরেশন যদি এই চিহ্নিত রাস্তাগুলো নির্দিষ্ট শর্তে লিজ দেয়, তবে হকারদের মাথার ওপর থেকে চাঁদাবাজদের কালো ছায়া সরবে। একটি নির্ভরযোগ্য জরিপ অনুযায়ী, ঢাকা শহরে প্রায় ৩ লাখ হকার রয়েছে। যদি প্রত্যেকের কাছ থেকে দৈনিক মাত্র ৫০ টাকাও নামমাত্র সরকারি ফি হিসেবে নেওয়া হয়, তবে বছর শেষে সরকারের রাজস্ব আয় দাঁড়াবে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা! এই বিপুল অর্থ দিয়ে কি হকারদের জন্য আধুনিক স্টল, পাবলিক টয়লেট এবং নির্দিষ্ট ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম তৈরি করা সম্ভব নয়? অবশ্যই সম্ভব।

২০২৬ সালের নতুন বাংলাদেশে আমাদের স্বপ্ন হওয়া উচিত দ্বিমুখী যেখানে পথচারী ফুটপাতে স্বচ্ছন্দে বুকভরে নিঃশ্বাস নিয়ে হাঁটবে। আবার একজন হকারও রাস্তার এক কোণে দাঁড়িয়ে আত্মসম্মানের সঙ্গে তার পরিবারের অন্নসংস্থান করতে পারবে। ফুটপাত থেকে হকার সরিয়ে দিলেই কি শহর জাদুকরীভাবে বদলে যাবে? উচ্ছেদ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; বরং এটি একটি সাময়িক প্রলেপ। প্রকৃত আধুনিকতা বুলডোজারের চাকায় নয়, লুকিয়ে থাকে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায়। ঢাকাকে একটি সত্যিকারের  বৈশি^ক মেগাসিটি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে, ‘উচ্ছেদ’ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ২০২৪-এর বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছে, সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করে বা তাদের পেটে লাথি মেরে কোনো গ্ল্যামারাস কাঠামোই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত সরকার যদি হকারদের ‘সিস্টেমেটিক পুনর্বাসন’ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই ঢাকা হবে বিশ্বের বুকে একটি মানবিক ও আধুনিক মেগাসিটির রোল মডেল। হকাররা শহরের শত্রু নয়, বরং তারা অর্থনীতির সচল চাকা। তাদের উচ্ছেদ করে নয়, বরং নিয়মের নিগড়ে বেঁধে মূলধারার অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনাই হোক মূল লক্ষ্য। উন্নয়নের মিছিলে কাউকে পেছনে ফেলে রাখা কি খুব জরুরি? মানবিক ঢাকা গড়ার লড়াইয়ে জয়ী হোক সঠিক ব্যবস্থাপনা, থেমে যাক বুলডোজারের শব্দ। ২০২৬ হোক অন্তর্ভুক্তিমূলক সমৃদ্ধির বছর।

লেখক: সিইও, ইটিসি ইভেন্টস লিমিটেড

antora00111@gmail.com