রুখতে হবে কিশোর গ্যাং

বছর ১২ আগে ঢাকা শহরে ‘কিশোর গ্যাং’ ব্যাপকভাবে চোখে পড়তে থাকে। উত্তরায় ‘ডিসকো বয়েজ’ ও ‘নাইন স্টার’ গ্রুপের দ্বন্দ্ব এবং আদনান হত্যার পর এই গ্যাং কালচার প্রকাশ্যে আসে। মূলত অনিয়ন্ত্রিত আড্ডা, এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং পারিবারিক অনুশাসনের অভাবে এর উত্থান হতে থাকে। বছর দশেক আগে গণমাধ্যমে কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতার খবর নিয়মিত প্রকাশ-প্রচার পেতে থাকলেও সেই সময়ের সরকার ছিল নির্বিকার। এরপর দেশের বিভিন্ন জেলায় গড়ে ওঠে স্থানীয় কিশোর গ্যাং। বর্তমানে তা পরিণত হয়েছে বিষফোঁড়ায়। এদের দাপটে দেশের বিভিন্ন জেলা শহরের মানুষজন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। দেশ রূপান্তরে গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০০ কিশোর গ্যাংয়ের দেড় হাজার সদস্যের কাছে জিম্মি চট্টগ্রাম মহানগরীর ১৬টি থানার অধিবাসী। তারা জড়িয়ে পড়েছে খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জমি দখলসহ নানা অপরাধে। এদের নেতৃত্বে রয়েছে ৬৪ জন বদ্দা অর্থাৎ ‘বড় ভাই’। পুলিশ জানিয়েছে, গত ৬ বছরে ৫৫৮টি অপরাধ করেছে এই কিশোররা। এদের হাতে সর্বশেষ প্রাণ দিয়েছে কিশোর আশফাক কবির সাজিদ। অন্যদিকে, রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুরে সর্বক্ষণ রাস্তা বা বাসাবাড়ির সামনে রামদা, আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে সর্বস্ব লুট করে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। গত চার দিনের ব্যবধানে সেখানে খুন হয়েছে কিশোর গ্যাংয়েরই দুই সদস্য। প্রশাসনের তৎপরতা বাড়লে গ্যাংকেন্দ্রিক অপরাধ কমে যায়, প্রশাসন কিছুটা ঢিলেঢালা হলেই এই গ্যাংকেন্দ্রিক অপরাধ বেড়ে যায়।

রাজধানীসহ দেশব্যাপী এই উচ্ছৃঙ্খল কিশোর দলকে যেভাবেই হোক নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। তার জন্য মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে সবগুলো রাজনৈতিক দলকে। বিশেষ করে, এলাকাভিত্তিক কমিটির নেতারা যদি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ থাকেন, যদি তারা আইনশৃঙ্খলার প্রতি সামান্য শ্রদ্ধা রাখেন, তাহলে সমাজের মানুষদের নিরাপত্তার প্রতি তাদের কর্তব্যই হবে প্রধান। এছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্যকে এ বিষয়ে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। দলীয় স্বার্থ নয়, সমাজের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতাই যেন আমরা দেখতে পারি। সর্বশেষ মূল ভূমিকা রাখবেন আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা কর্তাব্যক্তিরা। এর মানে, কিশোর গ্যাংকে নিয়ন্ত্রণ এবং দমন করতে হলে সব শ্রেণির দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এটি ভাবার কোনো কারণ নেই যে, এই ‘গ্যাং’ অপশক্তির আশ্রয় না পেয়েই নিজস্ব শক্তিতে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্তাব্যক্তিরা যখন অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন, তখন বুঝে নিতে হবে মূল সমস্যা কোথায়? ঠিক সেদিকেই আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য প্রধান হয়ে ওঠে। এটি হঠাৎ গজানো কোনো সমস্যা নয়। দীর্ঘসময়ে যাকে লালন করা হয়েছে, চরমমাত্রায় তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এখন তাদের নিয়ন্ত্রণ এবং দমন করাই হবে মূল কাজ।

যদি আমরা সেটি করতে ব্যর্থ হই, তাহলে নিকট ভবিষ্যতে বড় ধরনের খেসারত দিতে হতে পারে। তখন আফসোস করে লাভ হবে না। সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলাই আনতে পারে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। না হলে কোনো পক্ষের সুবিধা হবে না। এই মুহূর্তে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যর্থ হলে, পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে বাধ্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্তদের প্রতি আহ্বান থাকল দেশব্যাপী কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনুন।