অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা স্থবিরতার কারণ

একটি জাতির শক্তি কেবল সামরিক সক্ষমতা বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না।  বরং সেই জাতি কতটা স্বাধীনভাবে সংকট মুহূর্তে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারে, সেটিই প্রকৃত সামর্থ্যরে পরিমাপ। ইতিহাসের প্রতিটি যুগে এ সত্য নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে উন্নয়নের গল্পের ভেতরের দুর্বলতাগুলো হঠাৎ করে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যখন হরমুজ প্রণালির ওপারে যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত, তখন দেশের ভেতরে জ্বালানি সংকটে থমকে গেছে উৎপাদনের চাকা। শিল্পাঞ্চলে অচলাবস্থা, শহরের পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন আর গ্রাম থেকে নগর সর্বত্র বিদ্যুৎহীনতার ক্লান্তিকর অন্ধকার। চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের নিভে যাওয়া চুল্লি যেন নিঃশব্দে ঘোষণা করছে এটি দুর্ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের কৌশলগত নির্ভরতার অনিবার্য পরিণতি। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি বরাবর বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। বিশেষ করে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা গত এক দশকে এমন এক জটিলতায় পৌঁছেছে, যা কেবল আঞ্চলিক সীমায় আবদ্ধ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায়  বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে দীর্ঘদিন ধরে অস্থিতিশীল করে রেখেছে। পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে বিরোধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা সব মিলিয়ে এই অঞ্চলে এমন একটি উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা যে কোনো সময় বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে, হরমুজ প্রণালিতে ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি, জাহাজ চলাচলে পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা ও ঝুঁকি  এবং অবরোধের শঙ্কা সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তেলের দামে। ফলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য তা মারাত্মক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

বাংলাদেশের মতো একটি অর্থনীতির জন্য এই বাস্তবতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের জ্বালানি কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা ধীরে ধীরে এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে বিকল্প উৎসের অভাব স্পষ্ট হয়েছে। একমুখী নির্ভরতা আজ সবচেয়ে বড় কৌশলগত দুর্বলতা হিসেবে সামনে এসেছে।  ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড এই বাস্তবতার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতীক। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই রিফাইনারিটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের হালকা ক্রুড তেল প্রক্রিয়াকরণের জন্য নির্মিত। এর প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং কার্যপদ্ধতি সবকিছু সেই নির্দিষ্ট ধরনের তেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে অন্য অঞ্চল থেকে তেল এনে দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ করা তার পক্ষে সহজ নয়। এই সীমাবদ্ধতা আজ একটি বড় সংকটে রূপ নিয়েছে। যখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে, তখন এই রিফাইনারি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে এবং তার প্রভাব পড়েছে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়। সবচেয়ে প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ খাতে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে, বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়। সৃষ্টি হয় লোডশেডিং, যা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। শিল্পকারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারে না, কৃষিতে সেচ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে ওঠে। শিল্প খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তৈরি পোশাক শিল্প, যা দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস। গ্যাসের স্বল্পতা এবং বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ফলে রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যা দেশের  বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতি আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে, আমরা কি এমন সংকটের জন্য প্রস্তুত ছিলাম? বাস্তবতা হলো, আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি সহজ পথ অনুসরণ করেছি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানি করা সহজ, সাশ্রয়ী এবং কূটনৈতিকভাবে সুবিধাজনক ছিল। কিন্তু এই সহজ পথই দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক নির্ভরশীলতা তৈরি করেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অনেক আগেই বুঝতে পেরেছে, একক উৎসের ওপর নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। তারা জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণ করেছে, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে এবং নিজস্ব সম্পদের উন্নয়নে মনোযোগ দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ সেই তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার এখনো সীমিত, এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানেও পর্যাপ্ত অগ্রগতি হয়নি। এখানে নীতিনির্ধারণের একটি মৌলিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চেয়ে তাৎক্ষণিক সমাধানের দিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। ফলে যখন সংকট এসেছে, তখন আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। বিকল্প উৎস খেঁাঁজার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু তা হয়েছে দেরিতে এবং বাধ্য হয়ে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন ধীরগতির। ফলে সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানো যায়নি। এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; এটি কৌশলগত দুর্বলতা তৈরি করেছে। এই বাস্তবতা আমাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরে। যদি একটি দেশ একাধিক উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারে, তাহলে কোনো অঞ্চলের অস্থিরতা তাকে পুরোপুরি বিপর্যস্ত করতে পারে না। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে, আমদানি নির্ভরতা কমানো সম্ভব।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের নীতিনির্ধারণে দূরদর্শিতা আনতে হবে। তাৎক্ষণিক সুবিধার চেয়ে, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অতিমাত্রায় মধ্যপ্রাচ্য নির্ভরশীলতা নিঃসন্দেহে বর্তমান স্থবিরতার একটি বড় কারণ। তবে এটি কোনো চূড়ান্ত নিয়তি নয়; বরং এটি একটি সতর্কবার্তা, একটি জাগরণ। এই সংকট আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে এবং আমাদের দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট করে দেখিয়েছে। এখন প্রশ্ন একটাই আমরা কি এ বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নেব, নাকি একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটাব? যদি আমরা এই সংকটকে উপলব্ধির একটি মুহূর্ত হিসেবে গ্রহণ করতে পারি, তবে তা আমাদের জন্য একটি নতুন সূচনার দরজা খুলে দিতে পারে। কিন্তু যদি আমরা আবারও স্বল্পমেয়াদি সমাধানে আটকে থাকি, তবে ভবিষ্যতের প্রতিটি সংকট আমাদের দুর্বল করে তুলবে। ইতিহাসের শিক্ষা খুবই স্পষ্ট। সবসময় নির্ভরতার ওপর দাঁড়ানো, উন্নয়ন টেকসই হয় না। তখনই টেকসই হয় উন্নয়ন যার ভিত্তি হয় বৈচিত্র, পরিকল্পনা এবং আত্মনির্ভরতা ঘেরা।

 লেখক : শিক্ষক ও  কলামিস্ট

 sultanmh17@gmail.com