উন্নয়ন সোপানের শুরুতেই শিক্ষার অবস্থান। যদি তাকে পাশ কাটানো হয়, তাহলে সবকিছু মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। এই যে সামনে বাজেট, সেখানে বাজেট হতে যাচ্ছে বিশাল। এবার শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ বেশি হওয়া দরকার। শিক্ষায় বাজেট কেন দক্ষিণ এশিয়ার কম থাকবে, সেটাই মুখ্য প্রশ্ন। এতদিন সেটা থেকেছে। শিক্ষা নিয়ে বর্তমান সরকারের চমৎকার ১৮০ দিনের পরিকল্পনা রয়েছে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জোরেশোরে কাজ চলছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যাটা বহু পুরনো। তাই পুরনো রোগের চিকিৎসা একদিনে নিরাময় সম্ভব না। এর পরিবর্তন সময় নিয়ে করতে হবে। পাল্টে দিতে হবে গোঁজামিল ভরা শিক্ষাব্যবস্থা। একবার তা করতে পারলে, বাকিটা এমনিতেই হবে। তবে সেটি করা সহজ কথা নয়। সেই পথ দুরূহ এবং যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং। শিক্ষা খাতে ১৮০ দিনের কর্মসূচি, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ। কর্মসূচিতে প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা গড়তে, বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। সেই লক্ষ্যে দেশের সব স্তরের ৫০ হাজার শিক্ষকের হাতে অত্যাধুনিক ট্যাব দেওয়া হবে। পাশাপাশি ২০ হাজার মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও দেড় হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াইফাই চালু করবে সরকার। চমক জাগানো প্রতিশ্রুতি হিসেবে বিবেচিত, ‘বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস’ দেওয়া হবে শিক্ষার্থীদের। এছাড়া শিক্ষা টিভি চালু, শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার মতো টেকসই উদ্যোগ রাখা হয়েছে। শিক্ষা খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অগ্রাধিকার তালিকার ৩৬ কাজের মধ্যে অধিকাংশই চমক জাগানিয়া। তবে সেখানে টেকসই প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তারপরও শিক্ষা উন্নয়নে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার অর্ধেকও যদি ১৮০ দিনের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তাহলে শিক্ষা খাতে নিঃসন্দেহে গতি বাড়বে। এর ফলে শিক্ষকরা যেমন উৎসাহিত হবেন, তেমনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা বাড়বে। ভেঙে পড়া শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনে এ পরিকল্পনার অন্তত ৮০ শতাংশ বাস্তবায়ন জরুরি। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি-অনিয়ম ও ধীরগতি ঠেকানো বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা।
আগামী ৬ মাসের মধ্যে মাধ্যমিক ও কলেজ শিক্ষকদের হাতে প্রথম পর্যায়ে ৫০ হাজার ট্যাব তুলে দেবে সরকার। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা নিশ্চিতে ১৮০ দিনের মধ্যে ২০ হাজার মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমগুলো পুরোদমে চালু করা হবে, আগামী আগস্টের মধ্যে। প্রথম পর্যায়ে প্রতিটি উপজেলা ও মহানগরে তিনটি করে ১ হাজার ৮শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্কুল ড্রেস দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে এটি চালু হবে সারা দেশে। অনগ্রসর এলাকার ১০০টি বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস দেওয়ার মাধ্যমে, এ প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। ঝরে পড়ার হার ও সামাজিক বৈষম্য কমাতে, এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন হবে বলে আমরা আশা করতে পারি। দীর্ঘদিনে শিক্ষাব্যবস্থায় যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা এত সহজে দূর হবে না। দেশের জন্য দরকার একটি টেকসই শিক্ষাব্যবস্থা। বছর বছর ছাত্রছাত্রীদের গিনিপিগ বানিয়ে কারিকুলাম পরিবর্তন করা হবে না। বারবার কাটাছেঁড়ায় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে ওদের উদ্বিগ্নতা বাড়ে এবং পড়াশোনায় মনোযোগ কমে। পাসের হার কম বা বেশির সঙ্গে মানসম্মত শিক্ষার সম্পর্ক যে কম এতগুলো বছরে আমরা অন্তত তা বুঝতে পেরেছি। সুতরাং, সেদিকে না তাকিয়ে গুণগত শিক্ষা প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না সেটা যাচাই করাই আসল কাজ। এমন একটি সিঁড়ি তৈরি করতে হবে যা হেঁটে ছাত্রছাত্রীরা একটি সম্পদ হয়ে বের হতে পারে।
আমরা বহু বছর যে শিক্ষা, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের বুকে বসিয়ে দিয়েছি অথবা দিতে চেয়েছি, সেখানে কতজন শিক্ষিত হয়েছে আর কতজন শিক্ষিত হয়নি সে হিসাব এখন করা না গেলেও, পাসের হারের গড় নিশ্চয়ই দেখতে পারেন। সেখানে লাভের কিছু নেই। পাসের হার আর শিক্ষার্জন এক কথা নয়। দুটো আলাদা এবং বিপরীতমুখী। যদিও আমরা এক করার চেষ্টা করেছি, তাতে লাভ হয়নি। উল্টো দেশে অশিক্ষিতের বাজার বসেছে। চাপ দিয়ে একটি পদ্ধতি শিশুদের মধ্যে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা কার্যত অসফল হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কখনো চাপের হওয়া উচিত ছিল না এবং হলে সেটি বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়। ঠিক এখন যে রকম হচ্ছে। আমরা চাই, একটি চাপমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা। এটা শুধু আমাদের চাওয়া নয়, উন্নত বিশ্ব তা করে দেখাচ্ছে। সেই সব দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ধরনই হলো শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপমুক্ত রাখা। যে দেশ যত উন্নতি করেছে, দেখা যাবে উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা। তাই-ই হলো শিক্ষার প্রকৃত আধুনিকায়ন। আমরাই শুধু এর ব্যতিক্রম। স্বাধীনতার পর থেকে আমরা শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়েছি ঠিকই, শিক্ষিতের হার বেড়েছে, তবে চাপমুক্ত করতে পারিনি। শিক্ষাকে অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার চেষ্টা করেছি। শিক্ষাকে পণ্য তৈরি করেছি আমরা। সেই পণ্য বাইরের বাজারে বিক্রি করতে পারছি না। ঐ পণ্য দেশেই অনেকটা অচল পয়সার মতো গড়াগড়ি খাচ্ছে। আনন্দের উপকরণ, জ্ঞান আহরণের বিষয় হিসেবে সংযুক্ত না করে ভালো ফলাফল এবং একটি ভালো চাকরির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে শিখেছি। শিক্ষা মানুষের মধ্যকার অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগ্রত করার কাজ করলেও বাস্তবিক ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ সঠিকভাবে হচ্ছে না। শিক্ষা তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সফল হচ্ছে না। প্রয়োগের উদ্দেশ্য এবং ধরনেই এমনটা হচ্ছে বলা যায়। শিক্ষা এবং শিখনের ধারণাটা হয়েছে এমন যে বইয়ের প্রচুর পৃষ্ঠা মুখস্থ করতে হবে, প্রাইভেট কোচিংয়ে পড়তে হবে এবং যে কোনো উপায়ে ভালো রেজাল্ট করতে হবে। যদিও চাকরির বাজারে সবাই ভালো করছে না। কাঁধে ভারী ভারী ব্যাগ নিয়ে স্কুলে গেলেই শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। তখন একটি শিক্ষিত যন্ত্র তৈরি হয়। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী এ.পি.জে আবদুল কালাম শিক্ষা নিয়ে খুবই চমৎকার একটি মন্তব্য করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘যতদিন শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু চাকরি পাওয়া হবে, ততদিন সমাজে শুধু চাকররা জন্মাবে, মালিক নয়।’ যে কথার বাস্তব প্রমাণ আমরা বর্তমান সমাজে প্রতিফলিত হতে দেখছি। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আমাদের আজকের শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল চাকরি পাওয়া। একটা সার্টিফিকেট আর চাকরি, তারপর জীবনে আর কোনো দুশ্চিন্তা থাকে না। দেশে চলে আসা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বহুবার ঘষামাজা করা হয়েছে। কখনো কোনো বিষয় অকারণেই বাতিল করা হয়েছে, আবার প্রয়োজনের খাতিরে কোনো বিষয় বাদ দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা প্রসারে ভূমিকা রেখেছিল ব্রিটিশরা এমনটা বলা হয়। মূলত ব্রিটিশদের তৈরি করা শিক্ষাব্যবস্থায়, কিছুটা পরিবর্তন করে আজও আমাদের দেশে চলছে শিক্ষাদান।
ব্রিটিশ-ভারতে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নের দায়িত্ব পেয়েছিলেন লর্ড মেকলে। তিনি জানতেন, ভারতের প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থার শক্তি। যে শিক্ষা ছিল গুরুগৃহ ও আশ্রমকেন্দ্রিক। অথচ সেই দিনের পরিবর্তন হয়েছে। অনেক বছর অতিবাহিত হয়েছে। এখন শিক্ষার আধুনিকীকরণ সময়ের দাবি। সেই দাবিকে আমরা অগ্রাহ্য করতে পারি না। লর্ড মেকলের, এ উপমহাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন নিয়ে একটি চিন্তা-চেতনা ছিল এ রকম তিনি ১৮৩৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ সংসদে এক বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘আমি ভারতের আনাচে-কানাচে ঘুরেও একজন ভিক্ষুক কিংবা একজন চোরের দেখা পাইনি। এদেশে এতটা ধনসম্পদ, এদেশের মানুষের মধ্যে নৈতিক চরিত্রের এতটা উচ্চস্তর দেখেছি যে- দেশবাসীর শিক্ষা, ধর্মবিশ্বাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে না পারলে, আমরা কোনোদিনই দেশটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারব না।’ এই ভাষণে তিনি প্রস্তাব করেছিলেন, ‘আমরা এসব ঐতিহ্যগত শিক্ষাব্যবস্থা আর সংস্কৃতিকে এমনভাবে বদলে দেব যেন তারা যা কিছু বিদেশি, যা কিছু ইংলিশ, সে সব কিছুকেই তাদের নিজেদের চেয়ে উৎকৃষ্ট ভাবতে শিখবে। নিজেদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে তারা ঠিক আমরা যেমনটা চাইব, তেমনই একটি আত্মবিস্মৃত পদানত জাতিতে পরিণত হবে।’ ইংরেজদের সেই ইচ্ছার প্রতিফলন আজও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দেখতে পাই। পোশাক, চালচলনে আমরা সবসময় সেই সাহেবদের অনুসরণ করার চেষ্টা করি। নিজ সংস্কৃতিকে গুলিয়ে আমরা পর সংস্কৃতির শিক্ষা লাভ করতে শিখেছি। প্রখ্যাত অক্ষয় কুমার দত্ত ‘বঙ্গদেশে শিক্ষার বর্তমান অবস্থা’ নামক একটি প্রবন্ধে লিখেছেন ‘শিক্ষা প্রণালী যদি অপকৃষ্ট হয়, তবে কোন জাতি উন্নতির পথে অগ্রসর হইতে পারে না। শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য মানুষ্যের সকল প্রকার মানসিক বৃত্তির উন্মেষকার্য সম্পাদন। যাহাতে মনুষ্যের শারীরিক, মানসিক, সাংসারিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতিসাধন হয় শিক্ষাকার্যের তাহাই লক্ষ্য হওয়া কর্তব্য।’
আমাদের অভিভাবকদের কাছে শিক্ষা একটি প্রতিযোগিতা, যেখানে প্রথম হওয়ার জন্য দৌড়ায় মেধাবীরা। পরীক্ষা, মার্কস, রেজাল্ট অর্জনে অসহনীয় চাপ। সেই চাপের বেশিরভাগ দেখা যায়, বিভিন্ন কিন্ডারগার্টেন ও মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। কারণ তাদের বিজ্ঞাপনে লিখতে হয়, কোন প্রতিষ্ঠান থেকে কতজন শিক্ষার্থী জিপিএ ফাইভ পেয়েছে। মুখস্থ বিদ্যা দিয়ে সেই ব্রিটিশ আমল থেকে শিক্ষা চলছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু এখনো কার্যকর অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি শিক্ষা পদ্ধতি। এর পেছনে বড় কারণ হলো, মুখস্থ বিদ্যার প্রভাব। শুধু পরীক্ষায় বসা এবং পাস করলেই যে শিক্ষা সমাপ্ত হয় না, সেই মনস্তত্ত্ব কারও ভেতরে তৈরি হয়নি। নিজের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি বা নতুন কিছু উদ্ভাবন করাও যে শিক্ষার উদ্দেশ্য, অথবা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সুকৌশল যে একটি শিক্ষা সেটা গুরুত্ব না দিয়ে কেবল পাসের ভেতর আটকে আছে পুরো শিক্ষা। এই ব্যবস্থা যদি একটি বাজারের ব্যাগ হয়, তাহলে সেখান থেকে কেবল বের হচ্ছে অসংখ্য পাস করা ছাত্রছাত্রী। এর বাইরে আমরা কিছু পাচ্ছি না। মাসে মাসে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। সময় এসেছে পরিবর্তনের। এই ১৮০ দিনের পরও, শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত কাজ করতে হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
alokacharja85@gmail.com