মানবপাচার বন্ধ হতেই হবে

মা-বাবার অশ্রুর সঙ্গে মিশে গেছে আন্দামান ও বঙ্গোপসাগরের জল। নিকট বা সুদূর অতীতেও এমন ঘটনার কথা আমরা জানি। সব নোনা আর তিতায় ভরপুর। মায়ের চোখের জলে ভোলেনি সাগরের মন। হিংস্র মানবপাচারকারীদের নেশায়ও পড়েনি ভাটা। প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে অবৈধ ও অমানবিক পাচারের নেটওয়ার্ক সচল। বিশেষ করে কক্সবাজার, উখিয়া ও টেকনাফের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র যুবক, কিশোরদের ভালো চাকরি আর সুখ-স্বপ্নের লোভ দেখিয়ে তাদের জড়ো করা হয়েছে কোনো না কোনো আস্তানায়। তারপর তারা পাড়ি জমায় ট্রলারে করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে। বহুবার এ রকম ট্রলার গেছে। হয়তো তারা মালয়েশিয়ায় পৌঁছেছে। আবার অনেক ট্রলার আন্দামান সাগরে ডুবে গেছে। মানবপাচারকারীরা এটা বলে না যে, তাদের ট্রলার ডুবে যেতে পারে। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানে মানবপাচারকারীদের দুঃসাহসিক অভিযানের খবর। জানেন গ্রামস্তরের জনপ্রতিনিধিরাও। কিন্তু তারা ডাকাত-সন্ত্রাসী খুনিদের দ্বারা পরিচালিত পাচারকর্ম থামাননি বা থামাতে পারেননি। তাদের ব্যর্থতার সূত্র ধরে, আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে পাচারকারী চক্র। একাধিক মানবপাচারকারী চক্রের মাধ্যমে এসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। প্রশাসনের দৃষ্টির সামনে এবারও টেকনাফ এবং পেকুয়ার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। ২৭৩ জনকে নিয়ে ট্রলারটি যাত্রা করেছিল। তাদের কয়েকজন মাত্র ফিরে আসতে পেরেছে। বাকিরা পানিতে ডুবে নিখোঁজ হয়েছে কিংবা মারা গেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, স্বাধীনতার এত বছর পরও কেন টেকনাফ আর কক্সবাজার উপজেলার সমুদ্রকূলবর্তী মানুষের দারিদ্র্য মোচন করা যায়নি? তাদের দিন আনতে পান্তা ফুরানোর জীবনে এতটুকু স্বস্তি ও শান্তি নিয়ে আসতেই অজানার পথে পাড়ি জমিয়েছিল ওই তরুণরা। তারা জানত, দেশের শ্রমের দামে জীবনকে সাজাতে পারবে না। মৃত্যুকে বরণ করেই রওনা হয়েছিল মৃত্যুময় পথে। কিন্তু এসব দেখেও না দেখার ভান করেছে সংশ্লিষ্ট সবাই। আমরা বলতে পারব না এবারই শেষ, এরপর আর কোনো মানবপাচারের ঘটনা ঘটবে না। কে রুখবে অবৈধ সমুদ্রযাত্রা। কে মানবপাচারের টেকনাফ রুট চিরতরে বন্ধ করবে? দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে যে কান্নার ধ্বনি উঠেছে তা কেন সরকারের মধ্যে, প্রশাসনের অন্তরে, স্থানীয় প্রতিনিধিদের অন্তরে উঠছে না? কোনো যুবক যেন বিদেশে শ্রমিকের জীবন বেছে নিতে অবৈধ পাচারকারীদের শরণাপন্ন না হয়, সেই ব্যবস্থা করা কি দুঃসাধ্য? শুধু টেকনাফ আর কক্সবাজারের প্রতি মনোযোগ দিয়ে পাচার বন্ধ করা কোস্টগার্ডের প্রধান দায়িত্ব হতে পারে। যদি সমুদ্রপথে মানবপাচার এলাকায় উন্নয়ন ও রাজনৈতিক কর্মপ্রবাহ নির্মাণ করে, যুব সম্প্রদায়কে উদ্বুদ্ধ করা যায় তাহলে একটু সুখের জন্য তারা মোটা অঙ্ক খরচ করে মালয়েশিয়া যেতে চাইবে না। যারা কারিগরি শিক্ষায় পারদর্শী, তারা বৈধপথে সরকারি ব্যবস্থাপনায় যেতে পারেন। সীমান্তবর্তী উপজেলায় নিবিড় অনুসন্ধান করে উন্নয়নমূলক কাজ করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে বুঝতে হবে, সেখানকার আর্থ-সামাজিক সংকট। সেই সংকট নিরসনে অব্যাহতভাবে পর্যালোচনা করে গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন কাজ করতে পারলে, দারিদ্র্য দূর করা যেতে পারে। সেখানকার উপযোগী শিল্প প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে। উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তাদের নিয়োগ দিতে হবে। সবার আগে সুপরিকল্পনা এবং দক্ষতার ভিত্তিতে চাকরি, ব্যবসা ইত্যাদির জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। সমুদ্র উপকূলের জীবনকে মানবপাচারমুক্ত করতে হলে চিহ্নিত দোষী ও অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যে কজন পাচারকারী উল্লিখিত মৃত্যুর জন্য দায়ী, তাদের বিচার ও শাস্তি দিতে পারলে পাচার কমে আসবে।