এক সময়ের সফল সংস্করণ ওয়ানডেতে আগের সেই রমরমা দিন আর নেই বাংলাদেশের। ঘরের মাঠে চেনা উইকেটে নিউজিল্যান্ডের তৃতীয় সারির ক্রিকেটারদের সঙ্গে হেরে যাওয়ার পর ওয়ানডে দলের ভঙ্গুর দশা সামনে এসেছে আরও একবার। ব্যাটসম্যানদের দায়িত্বহীন ব্যাটিংয়ে গড়পড়তা সংগ্রহও বাংলাদেশের জন্য হয়ে যাচ্ছে পাহাড়সমান। এর পেছনে প্রধান কারণ নিয়মিত প্রান্ত বদলের মাধ্যমে রানের চাকা সচল রাখতে না পারা আর ইনিংসের মাঝের ওভারগুলোতে বাউন্ডারি মারতে না পারা।
সবশেষ ২ বছরে ২১টা ওয়ানডে খেলে বাংলাদেশের জয় মাত্র ৬ ম্যাচে। এই ৬ ম্যাচের মাত্র একটিতেই বাংলাদেশ জিতেছে পরে ব্যাট করে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচটায় বাংলাদেশ জিতেছিল ১১৪ রান তাড়া করে, মাত্র ২ উইকেট হারিয়ে। ৫০ ওভারে ১১৫ রানের নিরাপদ লক্ষ্য তাড়া করে অনায়াস জয় পেলেও যখনই লক্ষ্যটা একটু বড় হয়েছে, তখনই বাংলাদেশ হেরেছে ম্যাচ। ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপের পর থেকে প্রথম ইনিংসে গড় রান ২৫৩, যেটা বিশ্বকাপে ছিল ২৮০-এর বেশি। ভারতীয় উপমহাদেশের কন্ডিশনে এই রানটা ২৬৫-২৭৫, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায় দ্রুতগতির আউটফিল্ড ও পেস বোলিংয়ের আধিক্যের কারণে সেটা বেড়ে হয় ২৮০ রানের বেশি। ইংল্যান্ড এবং ক্যারিবিয়ানে এই রানটা গড়পড়তা ২৫০-এর আশপাশে। অথচ বাংলাদেশ এমন গড়পড়তা সংগ্রহও তাড়া করতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছে। শারজায় আফগানদের ২৩৫ রানে অলআউট করার পর বাংলাদেশ অলআউট হয়, কলম্বোতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২৪৪ রান তাড়া করতে নেমেও বাংলাদেশ অলআউট হয়ে যায় ১৬৭ রানে। পাল্লেকেলেতে লক্ষ্যটা ছিল একটু বেশি, শ্রীলঙ্কার করা ২৮৫ রানের জবাবে বাংলাদেশ অলআউট হয় ১৮৬ রানে। শারজায় আফগানিস্তানকে ১৯০ রানে অলআউট করেও রানতাড়ায় মাত্র ১০৯ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ, সবচেয়ে বড় লজ্জাটা আসে এরপরের ম্যাচে যেদিন আফগানদের ২৯৩ রানের জবাবে বাংলাদেশ অলআউট হয়ে যায় মাত্র ৯৩ রানে। মিরপুরেও পাকিস্তানের বিপক্ষে ২৭৪ রান তাড়া করতে গিয়ে মাত্র ১১৪ রানেই সবকয়টি উইকেট হারায় বাংলাদেশ, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২২১ রানে অলআউট হওয়াটাকে তাই উন্নতির লক্ষণই বলা যায়!
সবচেয়ে কাছাকাছি সময়ে, বাংলাদেশের সফলভাবে রানতাড়া করে জেতার যে নজির সেটা হচ্ছে ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ। দুই বছরের বেশি সময় আগে, চট্টগ্রামে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২৫৫ রান তাড়া করে ৩২ বল হাতে রেখে ৬ উইকেটে জিতেছিল বাংলাদেশ। যে ম্যাচে নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুশফিকুর রহিম মিলে পঞ্চম উইকেট জুটিতে যোগ করেছিলেন ১৬৫* রান, ১৭৫ বল অবিচ্ছিন্ন থেকে। মুশফিক অবসর নেওয়ার পর মিডল অর্ডারে ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’ এর ভরসাটা কেউ দিতে পারেননি, কেউ টপ অর্ডারের সঙ্গে মিডল অর্ডারের যুগলবন্দিটা করতে পারেননি। ফল, তাসের ঘরের মতোই ব্যাটিং অর্ডারের ধসে যাওয়া।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের ইনিংস স্থায়ী হয়েছিল ২৯১ বল (৪৮.৩ ওভার)। এর ভেতর ১৬৬টা ডেলিভারিই ছিল ডট বল অর্থাৎ এই ডেলিভারিগুলো থেকে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা কোনেপা রান নিতে পারেননি। অঙ্কের হিসেবে ৫৬ শতাংশের বেশি বলই বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা দিয়েছেন ডট। ভারত, অস্ট্রেলিয়ার মতো শীর্ষপর্যায়ের দলগুলো একটা ওয়ানডে ইনিংসে গড়ে ১২০-১৩০টা ডট বল দিয়ে থাকে, পরের দিকের দলগুলোর ক্ষেত্রে সেটা ইনিংসে ১৪০-১৫০ বলের মতো। কিন্তু বাংলাদেশ সীমিত ওভারের খেলায় ইনিংসের অর্ধেকের বেশি বলেই রান তুলতে ব্যর্থ।
ডট বলের ঘাটতি পোষাতে ব্যাটসম্যানরা বাউন্ডারি মারেন। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা পিছিয়ে সেই জায়গাতেও। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের ইনিংসে চারের সংখ্যা মাত্র ৫টি, ৬ মাত্র ৩টি। অর্থাৎ বাউন্ডারি থেকে এসেছে মাত্র ৩৮ রান। শুধু তাই নয়, ইনিংসে দুটো বাউন্ডারির মধ্যে বিরতি ছিল ৯১ বল! ২৪তম ওভারের চতুর্থ বলের পর বাংলাদেশ পরের বাউন্ডারিটা মেরেছে ৩৯তম ওভারের পঞ্চম বলে।
পাওয়ার প্লেতে ৩০ গজ বৃত্তের বাইরে মাত্র ২ জন ফিল্ডার থাকার সুবিধা নিয়ে শুরুর ১০ ওভারে দ্রুত রান তোলার প্রচেষ্টা থাকে টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের। ১ রানে জীবন পাওয়া সাইফ হাসানের প্রথম ১০ ওভার শেষে রান ছিল ২৯ বলে ১৮, অথচ অন্য দলগুলোতে এই সময়ে ব্যাটসম্যানরা প্রচেষ্টাতেই থাকেন অন্তত ১৩০-১৫০ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করতে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে প্রথম দুই ম্যাচে শুরুতে অল্প রানে আউট হওয়া সাইফ তৃতীয় ওয়ানডেতে খেলেছিলেন ৫৫ বলে ৩৬ রানের ইনিংস। তারপরও বাংলাদেশের দলীয় সংগ্রহ পৌঁছেছিল ২৯০ রানে, কারণ অন্য প্রান্তে তানজিদ হাসান তামিম খেলেছিলেন ১০৭ বলে ১০৭ রানের ইনিংস, পরের দিকের ব্যাটসম্যানদের কল্যাণে দল পেয়েছিল স্বাস্থ্যবান সংগ্রহ। কিন্তু লক্ষ্য যখন ২৪৭, তখন সাইফের এমন ব্যাটিং দলের জন্য ডেকে এনেছে বিপর্যয়। ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে সাইফ বলছিলেন, আউট না হয়ে আরেকটু ইনিংসটা লম্বা করলে হয়তো দলের কাজে আসত। তবে এই আক্ষেপ চিরকালীন।
প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ডের অনামি ক্রিকেটারদের নিয়ে গড়া দল বলেই হয়তো প্রত্যাশাটা ছিল বেশি, তবে মাঠের খেলায় ডিন ফক্সক্রফটরা দেখিয়ে দিয়েছেন খেলতে জানলে এই উইকেটেও কী করে খেলা যায়। আর মরুর শারজা কিংবা দ্বীপদেশ শ্রীলঙ্কা থেকে চিরচেনা ঢাকা, উইকেট আর কন্ডিশনের বদল হলেও বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের অজুহাতও যে বদলায় না সেটাও প্রমাণিত। কারণ এই যোগ্যতা নিয়েই তারকাখ্যাতি আর ব্যাংকে মোটা টাকা এলে তো আর দক্ষতা বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না!