কালজয়ী ছবিটির সেই মা ও মেয়ে

গারো পাহাড়ের পাদদেশে তখন ভরদুপুর। রোদে ঝলমল করছে পাহাড়ের ঢাল। সেই ঢাল বেয়ে নেমে এসেছে পাহাড়ি ঝর্ণা। ঝর্ণার ধারা এতটাই স্বচ্ছ, দেখে মনে হয় নদীর তলদেশে থাকা নুড়ি পাথরগুলো পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে। জলমগ্ন কিনারায় পাথরের ওপর বসে শাঁখা ও বালা হাতে প্রাণভরে পিপাসা মেটাচ্ছেন এক নারী। শরীর অবসন্ন। কিন্তু সেই অবসন্ন শরীরে জীবনের এক গভীর টান। লেথেন (কোচ নারীদের পোশাক) পরা নারীটির পিঠে বাসেক (ওড়না)  দিয়ে বাঁধা দেড় মাসের এক শিশু। ক্ষুধার্ত শিশুটি নিশ্চিন্তে মায়ের বুকের দুধ খাচ্ছে। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, পাহাড় আর পাহাড়ি জনপদ সব মিলিয়ে এক অন্য রকম আবহ। শেরপুরের বিখ্যাত আলোকচিত্রী নীতিশ রায়ের ক্যামেরায় ধরা পড়া সেই কালজয়ী মুহূর্তটির শিরোনাম ‘তৃষ্ণা’। ছবিটি ১৯৮২ সালের ১৬ জুলাই জাপানে অনুষ্ঠিত সপ্তম এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় ‘ইয়াকুল্ট’ পুরস্কার পায়। ইউনেস্কোর এশিয়ান কালচারাল সেন্টার ছিল ওই প্রতিযোগিতার আয়োজক। নীতিশ রায়ের এই পুরস্কার পাওয়ার খবর ও ছবি ওই বছরের ৬ আগস্ট দৈনিক ইত্তেফাকের ৭ নম্বর পৃষ্ঠায় ছাপা হয়।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে নীতিশ রায় ভারতে চলে যান। ওই বছর ১৬ জুন কলকাতা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক জয় বাংলা পত্রিকায় তিনি নিজস্ব আলোকচিত্রী হিসেবে যোগ দেন। যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে শেরপুর সীমান্তবর্তী তাওয়াকুঁচা ও হলদিগ্রাম বিওপি ক্যাম্প এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে। যুদ্ধের প্রস্তুতি, ধ্বংস, রক্তপাত আর বিজয়ের মুহূর্তসহ মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য দুর্লভ আলোকচিত্র তার ক্যামেরায় ধরা। ফলে বেশ কয়েক বছর ধরে সামাজিক মাধ্যমে তৃষ্ণার্ত নারীর এই কালজয়ী ছবিটিকে মুক্তিযুদ্ধ সময়ে তোলা বলে প্রচার করেন অনেকে। বলা হয়, ছবিটি শেরপুর অঞ্চলের আসাম ও মেঘালয়ের গারো পাহাড় সীমান্তবর্তী এলাকার এক হাজং নারীর। কিছুটা ঝাপসা ও ক্রপ করা ছবিটি পোস্ট করে লেখা হয়, পানিতে ভেসে থাকা সাদা রঙের বস্তুগুলো মানুষের মরদেহ। ১৯৮২ সালে ইত্তেফাকে প্রকাশিত সেই ছবির পেপারকাটিং আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল। ফলে ছবিটি নিয়ে আমার মনে সন্দেহ জাগে। পেপারকাটিংটি দেখে আমার মনে হয় ছবিটি আশির দশকের শুরুতে তোলা।

এই ছবিটির বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ২০২৩ সালে আমি দৈনিক দেশ রূপান্তর-এর শেরপুর প্রতিনিধি মো. শফিউল আলম সম্রাটের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সম্রাট জানালেন, “২০১৭ সালের ৮ জুন মারা যান নীতিশ রায়। নিঃসন্তান ছিলেন বলে স্ত্রী সন্ধ্যা রায়কে নিয়ে তিনি শেরপুর শহরের নয়াআনি বাজার মহল্লায় বসবাস করতেন। শহরের নিউমার্কেটে ‘রূপশ্রী’ নামে তার একটা বিখ্যাত স্টুডিও ছিল। পাশাপাশি তিনি দৈনিক সংবাদ, ইত্তেফাক, ভোরের কাগজসহ বিভিন্ন পত্রিকার শেরপুর সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করতেন। তিনি বাংলাদেশ ফটোগ্রাকিক সোসাইটিরও সদস্য ছিলেন।” আমার অনুরোধে সম্রাট নয়আনি বাজারের ২৮১ নম্বর বাড়িতে যান কবি সন্ধ্যা রায়ের সঙ্গে কথা বলতে। রাষ্ট্রীয় অবহেলায়, বিনা চিকিৎসায় মারা যান স্বামী। তাই তার মনে অনেক ক্ষোভ। অভিমানে তিনি সম্রাটের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। তার কয়েকদিন পর মারা যান সন্ধ্যা রায়। ফলে এই ছবির আর রহস্য ভেদ করা আমার পক্ষে আর সম্ভব হয়নি।

বিভিন্ন সময় বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশিত হওয়ায় ২০২১ সালে এই ছবির রহস্য ভেদ অভিযানে নামেন শেরপুর জন-উদ্যোগের আহ্বায়ক ও শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ। প্রথমে তিনি শেরপুর ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি রাজিয়া সামাদ ডালিয়ার স্মরণাপন্ন হন। কারণ নীতিশ রায়ের এই ছবির মূল নেগেটিভ, ক্যামেরা ও কিছু স্মারক তার সংগ্রহে আছে। পরে নীতিশ রায়ের পরিচিত অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। কিন্তু কেউ এই ছবির নারীটির সম্পর্কে কিছু বলতে পারলেন না। পরে তিনি গারো পাহাড়ে গিয়ে ওই নারীকে খুঁজতে শুরু করেন। গারো পাহাড়ে গিয়ে জানলেন, এই সম্প্রদায়ের নারীরা শাঁখা পরেন না। পরে তিনি ঝিনাইগাতি ও নালিতাবাড়ী উপজেলার হাজংপাড়ায় গিয়ে ওই নারীর খোঁজ করেন। তারাও কিছু বলতে পারেন না। ২০২৫ সালে নেত্রকোনার বিরিশিরিতে আদিবাসী কালচারাল সেন্টারে কোচ সম্প্রদায়ের ‘বিহু’ অনুষ্ঠানে যান আবুল কালাম। সেই অনুষ্ঠানের আলোচক ছিলেন তিনি। অনুষ্ঠানে কোচ, হাজং ও গারো সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় লোকজন উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে চা খাওয়ার সময় তিনি নীতিশ রায়ের ছবিটি দেখিয়ে ওই নারীর পরিচয় জানতে চাইলেন। ছবিটি দেখে আদিবাসী নেতা যুগলকিশোর কোচ বিস্ময়ের সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘আরেহ! এই নারী তো আমার পরিচিত। তিনি হাজং না, কোচ সম্প্রদায়ের। তার বাড়ি ঝিনাইগাতি উপজেলার সীমান্তবর্তী গান্ধিগাঁও গ্রামে। তিনি এখনো বেঁচে আছেন!’

এ কথা শুনে আবুল কালামের বিস্ময়ের ঘোর আর কাটে না। তিনি শেরপুর শহরে না ফিরে রাতে যুগলকিশোর কোচকে নিয়ে গেলেন ঝিনাইগাতির কোচপাড়া রাংটিয়ায়। সেখানে তিনি এই ছবির সেই মা-মেয়েকে খুঁজে পান। জানতে পারেন ছবির সেই নারীর নাম কুমুদিনী কোচ আর তার মেয়ের নাম রিতা কোচ। ৪৪ বছর বয়সী রিতা জানালেন, মায়ের কাছে তিনি ছবিটির অনেক গল্প শুনেছেন। তবে নিজ চোখে কখনো দেখেননি। এর কয়েকদিন পর ছবিটির একটি বড় প্রিন্ট করে যুগলকিশোর কোচ আর মিথুন কোচকে সঙ্গে নিয়ে আবার সেই গান্ধিগাঁও গ্রামে যান আবুল কালাম। ছবি দেখে রিতার চোখ ঝিলিক দিয়ে ওঠে। আর এভাবেই আবিষ্কার হয় ৪৩ বছর আগের বিখ্যাত সেই ‘তৃষ্ণা’ ছবির অখ্যাত মা ও মেয়ে।

কুমুদিনীর বয়স এখন ৬৬ বছর। পাহাড়ি টিলায় ১৭ শতক ভিটায় তার বসবাস। বয়সের ভারে এখন চোখে কম দেখতে পান। কয়েকটি গরু আছে তার। গরুগুলো সকালে ছেড়ে দিয়ে আসেন পাহাড়ে। সন্ধ্যার আগে সেগুলোকে বাড়ি নিয়ে আসেন। স্মৃতির ঝাঁপি খুলে কুমুদিনী বলেন সে দিনের ঘটনা। ছবিটা তোলা হয় কান্দিগাঁও কালাখোসা নামের একটি জায়গায়। সেখানকার একটি নিচু জায়গায় পাহাড়ি ঝর্ণা বয়ে যাচ্ছিল। পিতার অসুস্থতার খবর পেয়ে তিনি দেড় মাসের রিতাকে পিঠে নিয়ে বাপের বাড়ি নকশি নওকুচি গ্রামে যাচ্ছিলেন। ঝর্ণার পানিতে তিনি পিপাসা মিটান। তখন নীতিশ রায় তার ছবি তুলেছিলেন। ওই সময় ছবি তোলার বিষয়টি তিনি বুঝতে পারেননি। তবে আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়ার পর ছবিটির কথা তিনি লোকমুখে শুনেছেন। শুনে কিছুটা লজ্জাও পেয়েছিলেন। নীতিশ রায় একবার তার বাড়িতে গিয়ে সাদা-কালো ছবিটি দিয়ে গিয়েছিলেন। সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায় ছবিটি।

সেদিন কুমুদিনীর পিঠে বাঁধা সেই শিশু রিতার বয়স এখন ৪৪ বছর। তার জীবনও ছবির মতো সহজ হয়নি। রিতা কুমুদিনীর দ্বিতীয় সন্তান। রিতার স্বামী ভোজন কোচ পেশায় ট্রাকচালকের সহকারী ছিলেন। ২০১৬ সালে ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে মারা যান। চিকিৎসা চালাতে গিয়ে জমিজমা বিক্রি করতে হয়। একমাত্র ছেলে ধরনেশ^র কোচের বয়স এখন ১৮ বছর। স্বামীর মৃত্যুর পর রিতা ছেলেকে নিয়ে ফিরে আসেন মায়ের বাড়িতে। বর্তমানে বন বিভাগের জমিতে দিনচুক্তি শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। কুমুদিনীর বড় ছেলে স্বপন কোচ অনেক আগেই ভারতে চলে গেছেন। পঞ্চম ছেলে রুপন কোচ মারা গেছে বহু বছর আগে। এখন আছেন লিবিতা কোচ, তাপস কোচ, মল্লিকা কোচ, দুর্জয় কোচ, রাধা কোচ আর সুস্মিতা কোচ।

কুমুদিনী কোচ জানান, তার সংসারটা একদিন ছিল চাঁদের হাটের মতো। তার স্বামী বৈদ্যনাথ কোচ ছিলেন পাথর শ্রমিক। ২০০৩ সালের একদিন বৈদ্যনাথ পাথর তুলতে পাহাড়ে যান। তখন বাড়িতে খবর আসে পাথর চাপায় কয়েকজন শ্রমিক মারা গেছেন। সেই লাশগুলোর মধ্যে বৈদ্যনাথকেও পাওয়া যায়। স্বামীকে হারিয়ে পাঁচ মেয়ে আর তিন ছেলেকে নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েন কুমুদিনী। এখন ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে, যার যার মতো সংসারি হয়েছে। কুমুদিনীর বাড়ি এখন নাতি-পুতিতে ভরা। তার সরল ভাষ্য ‘বুড়া হইছি। এহন খাই আর কুহাই। কুহাই আর ঘুমাই।’

নীতিশ রায় মারা যাওয়ার আগে শেরপুর ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি ও সমাজসেবী রাজিয়া সামাদ ডালিয়ার কাছে ‘তৃষ্ণা’ ছবিটির মূল কপি, ক্যামেরা ও বিভিন্ন সনদ সংরক্ষণের জন্য রেখে যান। রাজিয়া সামাদ পরবর্তী সময়ে ক্যামেরাসহ কিছু ছবি ও সনদ জামালপুরে গান্ধী আশ্রমের মুক্তিসংগ্রাম জাদুঘরে প্রদান করেন। তবে ‘তৃষ্ণা’ ছবিটি শেরপুর ডায়াবেটিক সমিতিতে সংরক্ষিত আছে। নীতিশ রায়ের তোলা ৩০টি ছবি নিয়ে আজ ১৯ এপ্রিল শেরপুর শহরের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে একটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রদর্শনীর শুরুতেই থাকবে ‘তৃষ্ণা’ ছবিটিও। ছবির এই প্রদর্শনী উদ্বোধন করবেন ‘তৃষ্ণা’ ছবিটির সেই মা ও মেয়ে।