৬০ উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে সরকার গঠনের পর ইতোমধ্যে দুই মাস পার করেছে। এই সময়ে ৬০টি উল্লেখযোগ্য ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচিত হচ্ছে বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে। প্রধানমন্ত্রী এর মধ্যেই বিশ্বখ্যাত ‘টাইম’ সাময়িকীর প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন। গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সরকারের ৬০ দিনের নানা পদেক্ষপ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহদী আমিন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী বলেন, গত দুই মাসে সরকারের ওপর জনগণের আস্থা ফিরে এসেছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর। তিনি জনগণের মাঝে থাকছেন এবং সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা করছেন। অতিরিক্ত নিরাপত্তার তোয়াক্কা করছেন না। মনে হচ্ছে যেন, দেশসেবা ও জনকল্যাণমূলক কাজগুলো সম্পন্ন করার লক্ষ্যেই দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন রাষ্ট্রসংস্কারে প্রধানমন্ত্রীর উল্লেখযোগ্য ৬০ পদক্ষেপ গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরে বলেন, নির্বাচনের আগে দেওয়া ইশতেহার বাস্তবায়নে সরকার ইতিমধ্যে ১৮০ দিনের একটি অগ্রাধিকারমূলক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের মাধ্যমে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন এবং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই সরকারের মূল লক্ষ্য। উল্লেখযোগ্য ৬০টি পদক্ষেপ হলো

কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষা : ১. নারীর ক্ষমতায়নে পাইলট প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যে ৩৭ হাজার ৫৬৭ পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান, যার মাধ্যমে প্রতি মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে; ২. দশ জেলার ২২ হাজার কৃষককে ১০টি সুবিধাসংবলিত ‘কৃষক কার্ড’ প্রদান ও ৩. প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ।

সংসদ ও আইনি সংস্কার : ৪. সংসদীয় গণতন্ত্রের নজির স্থাপন করে প্রথম অধিবেশনে ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিষ্পত্তি। এর মধ্যে গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার রক্ষাবিষয়ক অধ্যাদেশসহ ১৬টি অধ্যাদেশ অধিকতর যাচাইয়ের পর বিল আকারে আসবে। ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

জ্বালানি, পরিবেশ ও অবকাঠামো : ৫.৫৪টি জেলায় ২০  হাজার কিলোমিটার নদী-খাল খননের কাজ শুরু; ৬. বৈশ্বিক সংকট সত্ত্বেও ভর্তুকি বাড়িয়ে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা; ৭. রুফটপ সোলারের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত ও ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ; ৮. জ্বালানি সংগ্রহের জন্য ‘ফুয়েল কার্ড’-এর পাইলটিং শুরু; ৯. প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও রমজান ও পরবর্তী সময়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা; ১০. চার হাজার ৯০৮ জন ইমাম-মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মের পুরোহিত ও যাজকদের মাসিক সম্মানী প্রদান শুরু এবং হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও নৃ-গোষ্ঠীবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী নিয়োগ।

প্রবাসী ও ধর্মীয় সেবা : ১১. জাকাত ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং ঈদ উপলক্ষে অসহায়দের মাঝে ত্রাণ বিতরণ; ১২. প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ; ১৩. হজের খরচ টিকিটপ্রতি ১২ হাজার টাকা কমানো এবং ‘নুসুক হজ কার্ড’ চালু।

কর্মসংস্থান ও শিল্প : ১৪. সরকারি অফিসের চার লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি শূন্যপদ পূরণে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ; ১৫. বন্ধ চিনিকল, রেশম ও পাটকল পুনরায় চালুর উদ্যোগ; ১৬. ইকোনমিক জোন ও হাইটেক পার্কগুলোতে স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ইকোসিস্টেম তৈরি।

অর্থনীতি ও বৈদেশিক বিনিয়োগ : ১৭. ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য নির্ধারণ; ১৮. ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করার পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো; ১৯ হাজার ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাবাসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা শিথিল এবং ২০. ঈদের আগে সব শ্রমিকের বেতন-বোনাস নিশ্চিতকরণ।

শ্রমবাজার ও জনশক্তি রপ্তানি : ২১. মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং অভিবাসন ব্যয় হ্রাস; ২২. ইউরোপের ৭টিসহ মোট ৮টি দেশের সঙ্গে নতুন শ্রমবাজারের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি; ২৩. দেশজুড়ে টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে বহুমুখী দক্ষতা বৃদ্ধির কারিকুলাম চালু এবং ২৪. উত্তরবঙ্গকে ‘অ্যাগ্রো প্রসেসিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ।

প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবা : ২৫. পে-পাল ও অন্যান্য পেমেন্ট গেটওয়ে বাংলাদেশে চালুর উদ্যোগ; ২৬. এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা, যার ৮০ শতাংশই হবে নারী এবং ২৭. স্বাস্থ্যসেবায় ‘ই-হেলথ কার্ড’ ও হাসপাতালে বিশেষ নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন।

শিক্ষা ও ক্রীড়া : ২৮. পুনঃভর্তি ফি বাতিল এবং সব স্তরের শিক্ষাবৃত্তির অর্থ দ্বিগুণ করা; ২৯. উচ্চশিক্ষায় বিদেশ গমনে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ব্যাংক গ্যারান্টি; ৩০. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৯ হাজার ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত; ৩১. চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক এবং উপজেলাপর্যায়ে ১৮ জন করে ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগ; ৩২. প্রতিভা অন্বেষণে ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা পুনরায় শুরু; ৩৩. দুই লাখ শিশুকে স্কুল ড্রেস ও জুতা প্রদান এবং ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ পাইলট প্রকল্প; ৩৪. মাদ্রাসায় স্মার্ট ক্লাসরুম ও কারিগরি কোর্স অন্তর্ভুক্তকরণ ও ৩৫. ১০০ ক্রীড়াবিদকে স্পোর্টস অ্যালাউন্স প্রদান।

পরিবেশ ও বনায়ন : ৩৬. পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা ও এ বছর এক কোটি ৫০ লাখ চারা উৎপাদন এবং খালের পাশে হাঁটার রাস্তা ও নেটিং ব্যবস্থা।

মিতব্যয়িতা ও সুশাসন : ৩৭. প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ভবনের বদলে নিজ বাড়ি ব্যবহার এবং যাতায়াতের খরচ নিজ তহবিল থেকে বহন; ৩৮. প্রটোকল সীমিত করে ট্রাফিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং সরকারি সফরে আড়ম্বর হ্রাস; ৩৯. জমি নামজারিতে অনলাইন আবেদন বাধ্যতামূলক ও ২৪/৭ হটলাইন চালু; ৪০. মরুপ্রক্রিয়া রোধে ‘পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প’ গ্রহণ; ৪১. মন্ত্রী-এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট না নেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত এবং  ৪২. সরকারি-বেসরকারি খাতে পাটজাতপণ্য ব্যবহারে নির্দেশনা।

জনস্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলা : ৪৩. ডেঙ্গু প্রতিরোধে জাতীয় পরিচ্ছন্নতা অভিযান; ৪৪. হামের টিকাদান কর্মসূচি পুনরায় শুরু; ৪৫. চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা ও জনবান্ধব পুলিশ গঠন; ৪৬. ঢাকায় ইলেকট্রিক বাস ও নারীদের জন্য ‘পিংক বাস’ সার্ভিস; ৪৭. নদী দখলদারদের পাঁচ বছর কারাদ- বা ১৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে আইন সংশোধন ও ৪৮. সরকারি অফিসে বিদ্যুৎ ও এসি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার ১১টি নির্দেশনা।

নিয়োগ ও উন্নয়ন : ৪৯. এনটিআরসির মাধ্যমে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষ নিয়োগে মেধাভিত্তিক পরীক্ষা; ৫০. ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপন, যা ২০২৯ সালে চালু ও ৫১. ফুটপাত ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন।

গণমাধ্যম ও অধিকার : ৫২. অবাধ বাকস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ; ৫৩. হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর উদ্যোগ; ৫৪. ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ফ্রি ইন্টারনেট; ৫৫. চলন্ত ট্রেন ও হাজার হাজার মাদ্রাসা-কারিগরি প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালু।

কূটনীতি ও বিচারব্যবস্থা : ৫৬. প্রবাসীদের কল্যাণ ও বাণিজ্য প্রসারে ‘অর্থনৈতিক কূটনীতি’র ওপর জোর; ৫৭. সীমান্ত হত্যা বন্ধ ও পানি বণ্টনসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন; ৫৮. পাচারকৃত অর্থ ফেরাতে ১০ দেশের সঙ্গে আইনি সহায়তা জোরদার; ৫৯. উপকূলীয় অঞ্চলে নদীভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং ৬০. মানবাধিকার রক্ষা ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধের প্রতিশ্রুতি।

সংবাদ সম্মেলনে ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম রনি, হাসান শিপলু, সুজাউদ্দৌল্লা সুজনসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইংয়ের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।