দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে এ সময়ে নিশ্চিত হামে কারও মৃত্যু হয়নি। আর ‘সন্দেহজনক’ হামে আক্রান্ত হয়েছে ৯৪২ জন এবং নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ৮৬ জনের। সব মিলিয়ে হামের নতুন রোগী পাওয়া গেল এক হাজার ২৮ জন। এই নিয়ে সরকারি হিসাবে গত ৩৫ দিনে হাম সন্দেহে ১৭৮ জনের মৃত্যু হলো। গতকাল শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৩৫ শিশুর। তাতে মোট মৃত্যু দাঁড়াল ২১৩ জনে। এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিকে ‘জরুরি পরিস্থিতি’ ও ‘মহামারী’ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস প্ল্যাটফরম ফর পিপলস হেলথ (ডিপিপিএইচ)।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৮ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত সন্দেহজনক হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে ২২ হাজার ৪০৯ জন। এই সময়ে সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৪ হাজার ৫২২ জন। এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামের রোগী পাওয়া গেছে ৩ হাজার ২৭৮ জন। এ পর্যন্ত হাম থেকে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ১১ হাজার ৭৫১ জন।
বিভাগওয়ারি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ‘সন্দেহজনক’ আক্রান্তের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় ঢাকা বিভাগে ৫০৬ জন। এর মধ্যে ৮১ জনের নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে। এর পরেই রাজশাহী বিভাগে ২০৮ জন ‘সন্দেহজনক’ আক্রান্তের মধ্যে নিশ্চিত হামের রোগী পাওয়া গেছে ২ জন এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ৯২ জনের মধ্যে ২ জনের নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া বরিশাল বিভাগে ৫০ জন, খুলনায় ৪৫ জন, ময়মনসিংহে ৫ জন, রংপুরে ৩ জন এবং সিলেট বিভাগে ৩৩ জনের মধ্যে সন্দেহজনক হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেলেও নিশ্চিত কোনো হামের রোগী পাওয়া যায়নি।
সরকারি হিসাবে বিভাগওয়ারি মৃত্যুর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ‘সন্দেহজনক হামে’ সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে ৮২ জন। এরপরই রাজশাহী বিভাগে ৬৫ জন, চট্টগামে ১২ জন, খুলনায় ১০ জন, সিলেটে ৫ জন এবং বরিশালে ৪ জন। তবে ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগে এখন পর্যন্ত কারও মৃত্যু হয়নি।
‘জরুরি পরিস্থিতি’ ঘোষণার দাবি : দেশে চলমান হামের পরিস্থিতিকে ‘মহামারী’ হিসেবে ঘোষণা করে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন ডিপিপিএইচ। অবিলম্বে গণটিকাদান কর্মসূচি চালুরও দাবি জানিয়েছে তারা। গতকাল রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে ‘হামে শিশুমৃত্যু : জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে করণীয়’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান ডিপিপিএইচের সঙ্গে যুক্ত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা।
তারা বলেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হলেও সময়মতো কার্যকর টিকাদান কর্মসূচি জোরদার না করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তারা আরও বলেন, টিকা সংগ্রহে গাফিলতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং জনস্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিরোধযোগ্য এ মৃত্যুর জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তারা।
সংগঠনটি দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ হিসেবে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, ভ্যাকসিন উৎপাদনে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বর্তমান সংকট স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতার একটি স্পষ্ট বার্তা। কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, কোনো রোগের বিস্তার যখন সময়, স্থান ও আক্রান্ত ব্যক্তির বিবেচনায় অস্বাভাবিক হয়, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যায় এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা সেটাকে সামাল দিতে পারে না, সেটা জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি। বর্তমানে হামের বিস্তার এ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে ডিপিপিএইচ মনে করছে। তাই সরকারের কাছে ‘জরুরি পরিস্থিতি’ ঘোষণার আহ্বান জানাচ্ছে সংগঠনটি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ডিপিপিএইচের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘হামের কারণে যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তা প্রতিরোধযোগ্য ছিল। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিলে শিশুদের প্রাণ বাঁচানো যেত।’ দেশে হামের মহামারী চলছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সরকার স্বীকার করুক বা না করুক, দেশে বর্তমানে হামের মহামারী চলছে। জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি বা রাজনৈতিক পরিণতির ভয়ে হয়তো সরকার এটিকে জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা করতে দ্বিধা করছে।’
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ‘হাম সংক্রমণ করোনার চেয়েও দ্রুত হয়। টিকা দিলেও তাৎক্ষণিক সেটার কার্যকারিতা পাওয়া যায় না। দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় হাসপাতালের সেবাকে প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।’ দেশে আগে হামে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি হাজারে তিনজনের মৃত্যু হতো। এবার তা ১০ জনে পৌঁছেছে বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে ডিপিপিএইচ কয়েকটি দাবি ও সুপারিশ তুলে ধরে। এগুলো হলো অবিলম্বে দেশে গণটিকাদান কর্মসূচি চালু করা। আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসার জন্য উপজেলা থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। টিকা নিয়ে সমাজে বিদ্যমান ভুল ধারণা আর গুজব মোকাবিলায় কার্যকর জনসচেতনতা কার্যক্রম চালু করা, শক্তিশালী রোগ নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা করা।
এ সময় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি রশিদ-ই-মাহবুব, শিশু বিশেষজ্ঞ কাজী রকিবুল ইসলাম, সংগঠনের সদস্য সচিব শাকিল আখতার প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সদস্য ফয়জুল হাকিম।