যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান হামলাকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পোপ লিও চতুর্দশের মধ্যে এক নজিরবিহীন বাগযুদ্ধ শুরু হয়েছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ক্যাথলিক ধর্মতত্ত্বের এক প্রাচীন প্রশ্ন: একটি যুদ্ধ কখন ‘ন্যায়সঙ্গত’ বা ‘জাস্ট ওয়ার’ হিসেবে গণ্য হয়?
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে পোপের এই বিরোধ বেশ পুরনো ও একপাক্ষিক। পোপ লিও সম্প্রতি প্রশ্ন তুলেছিলেন, যারা যুদ্ধ করে ঈশ্বর কি আদেও তাদের প্রার্থনা শোনেন? এর জবাবে ট্রাম্পের সরাসরি আক্রমণ এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পাল্টা যুক্তি মার্কিন রাজনীতিতে নতুন ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
চলতি সপ্তাহে জর্জিয়া ইউনিভার্সিটিতে এক অনুষ্ঠানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেন। ক্যাথলিক ধর্মে ধর্মান্তরিত ভ্যান্স পোপের শান্তিবাদী অবস্থানের প্রশংসা করলেও যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, পোপ শান্তির পক্ষে কথা বলবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আপনি কীভাবে বলতে পারেন যে ঈশ্বর কখনোই অস্ত্রধারীদের পক্ষে থাকেন না? নাৎসিদের হাত থেকে ফ্রান্সকে মুক্ত করা বা ইহুদি নিধন ক্যাম্পগুলো থেকে মানুষকে উদ্ধারের সময় ঈশ্বর কি আমেরিকানদের পক্ষে ছিলেন না?
ভ্যান্স আরও বলেন, হাজার বছরের পুরনো ‘জাস্ট ওয়ার থিওরি’ বা ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধতত্ত্বের একটি ঐতিহ্য রয়েছে। তবে পোপকে অনেকটা নসিহত করার ভঙ্গিতে তিনি বলেন, আমি যেমন সরকারি নীতি নিয়ে কথা বলার সময় সতর্ক থাকি, পোপেরও উচিত ধর্মতত্ত্ব নিয়ে কথা বলার সময় অত্যন্ত সতর্ক থাকা। পোপকে ধর্মতত্ত্ব শেখানোর এই চেষ্টা নিয়ে ইতিমত্যেই তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।
হাউস স্পিকার মাইক জনসন, যিনি একজন কট্টর ইভানজেলিকাল খ্রিস্টান, তিনিও এই যুদ্ধকে ন্যায়সঙ্গত বলে পরোক্ষ সমর্থন দিয়েছেন। তিনি জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট যুদ্ধের ভয়াবহতা বুঝতে পেরেই এই পথে হাঁটছেন। তার মতে, খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বে ‘জাস্ট ওয়ার’ একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিষয় এবং আকাশের নিচে প্রতিটি কাজেরই একটি নির্দিষ্ট সময় থাকে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, ইরান যখন পরমাণু আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল, তখন কোনো আন্তর্জাতিক সমর্থন বা জনমত গঠন না করেই যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসন পেন্টাগনের নাম বদলে ‘ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার’ করার মাধ্যমে যুদ্ধের মানসিকতাকে আরও উসকে দিয়েছে।
পোপের বক্তব্যের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাথলিক বিশপ সম্মেলন একটি স্পষ্টীকরণ বিবৃতি জারি করেছে। বিশপদের মতে, ক্যাথলিক চার্চের শিক্ষা অনুযায়ী একটি দেশ কেবল তখনই অস্ত্র তুলে নিতে পারে যখন সব শান্তির প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং সেটি ‘আত্মরক্ষামূলক’ হয়।
একটি যুদ্ধকে ‘ন্যায়সঙ্গত’ হতে হলে খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী চারটি কঠিন শর্ত পূরণ করতে হয়:
১. আক্রমণকারীর দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতি হতে হবে স্থায়ী, গুরুতর এবং নিশ্চিত।
২. যুদ্ধ ছাড়া অন্য সকল উপায় (আলোচনা বা কূটনীতি) ব্যর্থ বা অকার্যকর প্রমাণিত হতে হবে।
৩. যুদ্ধে সফল হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা থাকতে হবে।
৪. যুদ্ধের ধ্বংসলীলা যেন মূল সমস্যার চেয়েও ভয়াবহ আকার ধারণ না করে। আধুনিক মারণাস্ত্রের যুগে এই শর্তটি পূরণ করা সবচেয়ে কঠিন।
শিকাগোর আর্চবিশপ কার্ডিনাল ব্লেজ কুপিচ সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ মোটেও ‘ন্যায়সঙ্গত’ নয়। তিনি একে ‘ইচ্ছাধীন যুদ্ধ’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই।
এই বিতর্কে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ২০০৯ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণের ভাষণের প্রসঙ্গটিও ফিরে আসছে। ওবামা বলেছিলেন, কোনো ‘পবিত্র যুদ্ধ’ কখনো ‘ন্যায়সঙ্গত’ হতে পারে না। ধর্মের দোহাই দিয়ে যুদ্ধ করলে মানুষের ওপর নৃশংসতা চালানোর ক্ষেত্রে কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ওবামা ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরমাণু চুক্তি করেছিলেন, যেখানে ট্রাম্প ও তার বর্তমান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ যুদ্ধের নিয়মকানুন তোয়াক্কা না করার পক্ষে মত দিচ্ছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আধুনিক মারণাস্ত্র ও গণবিধ্বংসী অস্ত্রের যুগে ‘জাস্ট ওয়ার থিওরি’র প্রয়োগ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ও ভ্যাটিকানের এই দূরত্ব আসলে বিশ্বশান্তির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পোপ যেখানে বলছেন ঈশ্বর যুদ্ধবাজদের প্রার্থনা শোনেন না, সেখানে হোয়াইট হাউস যুদ্ধের মধ্যেই মুক্তি খুঁজছে।
সূত্র: সিএনএন