যুদ্ধবিরতির জন্য মরিয়া ছিলেন ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে বিজয়ী ঘোষণা করেছিলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিভিন্ন সময় তিনি ইরানের সামরিক অবকাঠামো, ক্ষেপণাস্ত্র ভা-ার ধ্বংস এমনকি পারমাণবিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার দাবি করেছেন তিনি; যদিও নিজের দাবির স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ কখনোই দেখাতে পারেননি ট্রাম্প। দীর্ঘ ৪০ দিনের এই সংঘাতে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের। কিন্তু কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে এই দুই মিত্রের ক্ষয়ক্ষতির আসল চিত্র খুব কমই জানা যায়। তবে ট্রাম্প বিজয় দাবি করলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বলছে ইরান নয়, ডোনাল্ড ট্রাম্পই যুদ্ধবিরতির জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে ট্রাম্প অনেকটাই হুটহাট সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং উপদেষ্টাদের পরামর্শ এড়িয়ে চলছেন। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ফলে সৃষ্ট জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে তিনি যুদ্ধবিরতির জন্য পাগলপ্রায় হয়ে উঠেছিলেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে ট্রাম্প মূলত ইরানের কতগুলো লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস হয়েছে, সেসব কৌশলগত হিসাব নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ইরানের অভ্যন্তরে বড় কোনো বিস্ফোরণের ফুটেজ দেখতে তিনি পছন্দ করতেন বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা।

ইরানের আকাশসীমায় দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার খবর জানার পর ট্রাম্প কয়েক ঘণ্টা ধরে তার সহযোগীদের ওপর চিৎকার করেছেন। একজন জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্টকে সিচুয়েশন রুম থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। কারণ, তার অস্থিরতা পরিস্থিতির উন্নয়নে কোনো কাজে আসবে না বলে মনে করতেন তারা। যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ ক্রু উদ্ধার হওয়ার পর ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে ধারাবাহিক হুমকি দিতে শুরু করেন। ইস্টার সানডের সকালে অশ্রাব্য ভাষায় তিনি হুমকি দিয়েছিলেন। ওই পোস্টের শেষে তিনি লিখেছিলেন ‘সকল প্রশংসা আল্লাহর’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইস্টার ডে’র দিনে প্রেসিডেন্টের মুখে অশ্লীল ভাষা এবং মুসলিম শব্দবন্ধ ব্যবহারের কারণে রিপাবলিকান সিনেটর ও খ্রিস্টান নেতারা হোয়াইট হাউজে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে ট্রাম্প এক উপদেষ্টাকে বলেছিলেন, ইরানকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করতে তিনি নিজেই এই ‘আল্লাহ’ লাইনটি লিখেছিলেন, যাতে তাকে স্থির ও নিশ্চিত মনে হয়। কয়েক দিন পর ‘আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’ বলে তিনি যে হুমকি দিয়েছিলেন, সেটিও উপদেষ্টাদের সঙ্গে কোনো সমন্বয় ছাড়াই হুট করে দেওয়া হয়েছিল। ইরানকে ভয় পাইয়ে দিয়ে চুক্তিতে রাজি করানোর জন্যই এটি করা হয়েছিল বলে জানান প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ।

ট্রাম্পের চুক্তি করার আগ্রহের পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া। হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা অবাক হয়েছিলেন যে, ইরান কত দ্রুত ও সহজে এই জলপথটি বন্ধ করে দিতে পেরেছে। ট্রাম্প নিজেও অবাক হয়ে বলেছেন ‘ড্রোন হাতে একজন মানুষ কত সহজে হরমুজ বন্ধ করে দিতে পারে!’। জ্বালানি কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহীরা জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট ও অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টকে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতা ট্রাম্পকে মাঝেমধ্যে চাপে রাখলেও কখনও কখনও তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহও দেখিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘন ঘন ফোন সাক্ষাৎকার তার প্রেস টিমের সঙ্গে সমন্বয় করা ছিল না। প্রেস টিম তাকে মিডিয়াতে কথা কমানোর পরামর্শ দিলেও তিনি তা শোনেননি। তার উপদেষ্টারা তাকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার পরামর্শ দিলে তিনি তা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতে, ‘তিনি কী বলবেন? তিনি তো জয় ঘোষণা করতে পারছিলেন না। পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিজেও জানতেন না।’ শেষ পর্যন্ত ১ এপ্রিল তিনি ভাষণ দিলেও যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে বা জনসমর্থন বাড়াতে খুব একটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি।

ইসরায়েলে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ : ইসরায়েলের তেল আবিবে গত শনিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন হাজারো মানুষ। এ সময় চলমান যুদ্ধ, নিরাপত্তা ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া রাফায়েল পনিনা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, এখানে আসা মানুষজন বর্তমান সরকার এবং পরবর্তী সরকার উভয়ের কাছেই ৭ অক্টোবর কী ঘটেছিল এবং তার পরবর্তী ঘটনাগুলোর তদন্ত দাবি করছে। কারণ, আমরা সবাই এর উত্তর পাওয়ার অধিকার রাখি। তার অভিযোগ, নেতানিয়াহু ‘তাদের সমাজকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দিচ্ছেন’ এবং একইসঙ্গে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত করছেন।

আরেক বিক্ষোভকারী ও সমাজকর্মী লি হফম্যান-আগিভ বলেন, ‘আমি আজ এখানে এসেছি প্রথমত ৭ অক্টোবর এবং এরপর চলমান যুদ্ধে যারা তাদের প্রিয়জন হারিয়েছেন, সেই পরিবারগুলোর প্রতি সংহতি জানাতে। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী যে অন্তহীন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন, তার কারণে এই ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছেই।’ বিক্ষোভে অংশ নেওয়া চেইম ট্রিভ্যাক্সের অভিযোগ, লেবানন ও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে ইসরায়েল ভুল করেছে। তার ভাষায়, নেতানিয়াহু দেশের জন্য নয়, বরং নিজের আইনি জটিলতা এড়াতেই এসব পদক্ষেপ নিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, চলমান যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের কারণে ইসরায়েলে জনঅসন্তোষ বাড়ছে, যা সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

ইউয়ানে তেলের দাম মেটাচ্ছে ভারতে : যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় সাময়িক ছাড়ের সুযোগ নিয়ে কেনা ইরানের তেলের দাম চীনা মুদ্রা ইউয়ানে মেটাচ্ছে ভারতীয় শোধনাগারগুলো। মুম্বাইভিত্তিক আইসিআইসিআই ব্যাংকের মাধ্যমে এই লেনদেন হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিষয়টি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল চারটি সূত্র। ইরানের আগ্রাসনের জেরে বিশ্ববাজারে বেড়ে যাওয়া তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে গত মাসে সমুদ্রে ভাসমান রুশ ও ইরানি তেল কেনায় ৩০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দেয় ওয়াশিংটন; গতকাল রবিবার ইরানি তেলের ওপর থেকে এই ছাড়ের মেয়াদ শেষ হলেও রুশ তেলের ক্ষেত্রে তা আরও এক মাস বেড়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে ২০ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল কিনেছে ভারতের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন (আইওসি)। ‘জয়া’ নামের একটি বড় জাহাজে আসা ওই তেলের আনুমানিক মূল্য প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার। গত ৭ বছরের মধ্যে এই প্রথম ইরান থেকে ক্রুড তেল কিনল ভারত।

এ ছাড়া বেসরকারি শোধনাগার রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের জন্য ইরানি তেলবোঝাই চারটি জাহাজকে ভারতের বন্দরে নোঙর করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে গত সপ্তাহে জানায় একাধিক সূত্র। এলএসইজির পরিসংখ্যান ও সূত্রের খবর, এখনও পর্যন্ত ‘এমটি ফেলিসিটি’ নামের একটি জাহাজ থেকে তেল খালাস করা হয়েছে। আইওসি এবং রিলায়েন্স দুই শোধনাগারই আইসিআইসিআই ব্যাংকের মাধ্যমে এই তেলের দাম মেটাচ্ছে। ব্যাংকটি তাদের সাংহাই শাখার মাধ্যমে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে বিক্রেতাদের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাচ্ছে। তবে বিক্রেতাদের পরিচয় জানা যায়নি।

এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ই-মেইলে আইসিআইসিআই, আইওসি, রিলায়েন্স ও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো উত্তর মেলেনি। তেলবাহী ট্যাংকার ভারতের জলসীমায় প্রবেশ করলেই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নোটিস অভ রেডিনেস দেয়। দুটি সূত্রের দাবি, সেই নোটিস পাওয়ার পরই তেলের মোট দামের প্রায় ৯৫ শতাংশ মিটিয়ে দিয়েছে আইওসি। এর মধ্যে একটি সূত্রের তথ্যমতে, এভাবে মূল্য পরিশোধের পদ্ধতিটি সচরাচর দেখা যায় না।