বর্তমানে আমরা প্রযুক্তির উচ্চ শিখরে আসীন। তথ্যের অবাধ প্রবাহে ভাসছি। কিন্তু অদ্ভুত সত্য হলো, চোখ সচল থাকলেও আমরা যেন ক্রমেই এক ধরনের অন্ধত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের এই আধুনিক ও চাকচিক্যময় জীবনের পর্দার আড়ালে তৈরি হয়েছে অহংকারের বেড়ি ও গাফিলতির অদৃশ্য দেয়াল। আমাদের অতি পরিচিত সুরা ইয়াসিনের ৬ থেকে ১০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ মানুষের যে মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন, তা যেন আজকের এই আত্মকেন্দ্রিক প্রজন্মের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। আমাদের ক্যারিয়ারের উচ্চাকাক্সক্ষা যখন অহংকারে রূপ নেয়, তখন তা আমাদের গলার সেই অদৃশ্য বেড়ি হয়ে দাঁড়ায়, যা আমাদের সত্যের সামনে মাথা নত করতে দেয় না। আর আমাদের অতিরিক্ত দুনিয়াদারির মোহ তৈরি করে এমন এক প্রাচীর, যা আমাদের পরকাল দেখার দৃষ্টিকে ঝাপসা করে দেয়।
আজ সময় এসেছে নিজেকে প্রশ্ন করার, আমরা কি আসলেই মুক্ত? নাকি আমরা নিজেদের তৈরি করা এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি হয়ে আছি? আসুন, সুরা ইয়াসিনের এই আয়না দিয়ে আমাদের হৃদয়ের ভেতরের জগৎটাকে একবার পরখ করে দেখি।
ইরশাদ হয়েছে, ‘যাতে আপনি এমন এক জাতিকে সতর্ক করেন, যাদের পিতৃপুরুষদের সতর্ক করা হয়নি, ফলে তারা গাফেল হয়ে আছে।’ (সুরা ইয়াসিন, আয়াত ৬)
আজকের প্রেক্ষাপটে আমাদের সামনে কোরআন-হাদিস ও সত্য স্পষ্ট। প্রতিনিয়ত নানাভাবে আমাদের সতর্ক করা হচ্ছে। তারপরও আমাদের দিন শুরু হয় ফোনের নোটিফিকেশন দিয়ে। আর রিলসের স্ক্রলিংয়ে আমরা এতটাই মগ্ন যে, আমাদের আশপাশে তাকানোর সুযোগ হয় না। অতি কাছের মানুষের কষ্ট, রাগ-অভিমান এবং অবস্থাও আমাদের স্পর্শ করে না। চোখের সামনে থাকা দুনিয়ার কিংবা আখেরাতের আসল সত্য আমরা ভুলে গেছি। কোরআনের ভাষায় এই সত্য ভুলে যাওয়াকেই চরম গাফেল বা উদাসীন বলা হয়েছে।
ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের অধিকাংশের ওপর শাস্তি অবধারিত হয়ে গেছে। ফলে তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না। আমি তাদের গলায় বেড়ি পরিয়ে দিয়েছি, যা চিবুক পর্যন্ত ঠেকে আছে, ফলে তারা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে আছে।’ (সুরা ইয়াসিন আয়াত ৭-৮)
গাফিলতির পরের ধাপ হলো সত্যের বাণী শোনার পর তা অস্বীকার করা। যখন নবীজি (সা.) তাদের কাছে হেদায়েতের বার্তা নিয়ে এলেন, তারা তাদের পূর্বের অভ্যাসের কারণে তা প্রত্যাখ্যান করল। এর ফলে তাদের ওপর আল্লাহর আজাবের ফয়সালা অবধারিত হয়ে গেল। আয়াতে বেড়ি পরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি একটি রূপক অবস্থা। যারা সত্যের সামনে মাথা নত করে না, তাদের শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ তাদের গলায় অহংকারের বেড়ি পরিয়ে দেন।
বর্তমান সময়ে আমরা নিজেদের অর্জিত জ্ঞান বা বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ওপর এতটাই আত্মবিশ্বাসী যে, ওহির জ্ঞান বা ধর্মীয় অনুশাসনকে সেকেলে মনে করে অবজ্ঞা করি। আমরা ক্যারিয়ারের দম্ভ, জেদ ও অহংকারের মধ্যে হাবুডুবু খাই। আমাদের উচ্চশিক্ষা, পদমর্যাদা ও অহংকারের বেড়ি আমাদের মাথাকে এতটাই উঁচু করে রেখেছে যে, আমরা সত্যের সামনে মাথা নত করতে পারি না। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি তাদের সামনে এক প্রাচীর এবং পেছনে এক প্রাচীর স্থাপন করেছি। এভাবে আমি তাদের আবৃত করে দিয়েছি, ফলে তারা দেখতে পায় না।’ (সুরা ইয়াসিন আয়াত ৯)
তাফসিরে মারেফুল কোরআনে বলা হয়েছে, এটি মূলত তাদের কুফর ও জেদের শাস্তি। যখন কোনো মানুষ বারবার সত্যকে দেখেও না দেখার ভান করে, তখন আল্লাহ তার দেখার শক্তি ও উপলব্ধি করার ক্ষমতা কেড়ে নেন। তাফসিরে ইবনে কাসিরে বলা হয়েছে, সামনের দেয়াল হলো আখেরাতকে অস্বীকার করা এবং পেছনের দেয়াল হলো দুনিয়ার মোহে অন্ধ থাকা।
বর্তমানে আমরা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক মতবাদ, উগ্র আদর্শ বা ব্যক্তিগত স্বার্থের দেয়ালে নিজেদের বন্দি করে ফেলেছি। আমাদের সামনে সত্যের হাজারো প্রমাণ থাকলেও আমরা আমাদের মতাদর্শিক দেয়ালের বাইরে কিছু দেখতে পাই না। ফলে আমরা সত্যের মাঝখানে থেকেও অন্ধ।
ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনি তাদের সতর্ক করুন বা না করুন, উভয়ই তাদের জন্য সমান, তারা ইমান আনবে না।’ (সুরা ইয়াসিন, আয়াত ১০)
তাফসিরে মারেফুল কোরআনে বলা হয়েছে, দাওয়াত বা তাবলিগ হচ্ছে মুমিনের দায়িত্ব, কিন্তু হেদায়েত আল্লাহর হাতে। যারা নিজেদের অন্তরের দরজা বন্ধ করে দেয়, তাদের ওপর দাওয়াতের কোনো প্রভাব পড়ে না। এদেরকে সতর্ক করা আর না করা সমান। তাদের হৃদয়ের গ্রহণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে। একজন মৃত মানুষকে ডাকলে যেমন সে সাড়া দেয় না, এই আধ্যাত্মিকভাবে মৃত মানুষগুলোও আর কোনো দিন ইমান আনবে না।
বর্তমান সমাজে এমন কিছু মানুষ দেখা যায় যারা অপরাধ, দুর্নীতি বা অনৈতিকতায় এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে, তাদের বিবেক পুরোপুরি মরে গেছে। আপনি তাদের কোরআনের আয়াত শোনান বা যুক্তিতে বোঝান, তাদের ওপর কোনো প্রভাব পড়ে না। কারণ বারবার পাপ করতে করতে তাদের হৃদয়ে একটি আস্তরণ পড়ে গেছে, যা কোনো নসিহত গ্রহণ করতে পারে না।
আয়াতের শিক্ষা ও করণীয় : গাফিলতিই ধ্বংসের মূল কারণ। সত্য আসার আগে মানুষ উদাসীন থাকতে পারে, কিন্তু সত্য জানার পরও যখন মানুষ তা নিয়ে মাথা ঘামায় না, তখন তার অন্তর মারা যেতে শুরু করে। অহংকার মানুষকে সত্য দেখতে বাধা দেয়। গলার বেড়ি মূলত মানুষের ভেতরে থাকা অহংকারের প্রতীক। অহংকারী ব্যক্তি কখনো সত্যের সামনে বিনয়ী হতে পারে না। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে বারবার সত্যকে এড়িয়ে চলে, আল্লাহ তাদের চারপাশ দেয়াল দিয়ে ঘিরে দেন। ফলে তারা চাইলেও আর হেদায়েত পায় না।
প্রতিদিন একটা সময় বরাদ্দ রাখা উচিত, যেখানে কোনো ডিভাইস থাকবে না। থাকবে শুধু নিজের এবং আল্লাহর মধ্যকার কথোপকথন। বিনয় চর্চা করা। আমাদের ক্যারিয়ার বা সামাজিক মর্যাদা যেন গলার বেড়ি না হয়ে দাঁড়ায়। বড়দের সম্মান ও ছোটদের ভালোবাসা অহংকার ভাঙতে সাহায্য করে।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক