উনিশ শতকের শেষভাগ। ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা নানা সংকটে নিমজ্জিত। সমাজজীবনে ধর্মীয় অজ্ঞতা, কুসংস্কার, নৈতিক অবক্ষয় এবং পাশ্চাত্য চিন্তা ও সংস্কৃতির গভীর প্রভাব। এমন সময়ে জ্ঞান, আত্মশুদ্ধি ও ইসলাহের মাধ্যমে মুসলিম সমাজকে পথ দেখিয়েছেন মাওলানা আশরাফ আলি থানভি (রহ.)। তিনি ছিলেন গবেষক আলেম, শিক্ষক, সমাজসংস্কারক ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। আত্মশুদ্ধি ও তাসাউফের শিক্ষায় অসামান্য অবদানের কারণে তিনি ‘হাকিমুল উম্মত’ নামে পরিচিত হন।
আশরাফ আলি থানভি (রহ.) ১৮৬৩ সালের ১৯ আগস্ট ভারতের উত্তর প্রদেশের থানা ভবনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই তিনি মাকে হারান। এই কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্যেও তার শিক্ষাজীবনের ভিত গড়ে ওঠে খুব অল্প বয়সে। তিনি শৈশবেই পবিত্র কোরআন মুখস্ত করেন। পরে নিজ এলাকায় ফার্সি ও আরবি ভাষার প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন।
উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন। সেখানে হাদিস, তাফসির, আরবি সাহিত্য, ইসলামি দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, ফিকহ ও ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি দেওবন্দের শিক্ষা সমাপ্ত করেন। পরে মক্কায় গিয়ে কেরাত ও তাজবিদ অধ্যয়ন করেন। তার শিক্ষাজীবন ছিল বিস্তৃত ও বহুমুখী। জ্ঞানকে মানুষের জীবন সংশোধনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি কানপুরের ফয়যে আম মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কারণে সেখানে তিনি ‘বাহরুল উলুম’ বা জ্ঞানের সাগর উপাধিতে পরিচিত হন। পরে কানপুরের জামেউল উলুম মাদ্রাসায় শায়খুল হাদিস ও প্রধান পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ ১৪ বছর তিনি সেখানে শিক্ষকতা করেন। তার কাছে অসংখ্য শিক্ষার্থী জ্ঞান অর্জন করেন এবং পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকে ইসলামের বিভিন্ন অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
থানভি (রহ.)-এর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় থানা ভবনের খানকায়ে ইমদাদিয়ায় অবস্থান গ্রহণের পর। ১৩১৫ হিজরিতে তার পীর ও মুর্শিদ হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কীর পরামর্শে তিনি সেখানে স্থায়ীভাবে অবস্থান নেন। এরপর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ইসলাম প্রচার, আত্মশুদ্ধি, তাসাউফ এবং লেখালেখির কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।
থানভি (রহ.) এমন এক সময়ে তাসাউফের ময়দানে কাজ করেছেন, যখন অনেক জায়গায় ইসলামের মৌলিক শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন রীতি ও ধারণা প্রবেশ করেছিল। নৈতিক চরিত্রের পরিশুদ্ধি, আত্মসংযম ও অন্তরের সংশোধনকে তিনি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্য ও লেখায় আকিদা, আমল, লেনদেন ও নৈতিকতার সংশোধন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি শুধু খানকাকেন্দ্রিক কাজেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। প্রায় চার দশক ধরে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে তিনি ইসলাহি সফর করেছেন। বড় বড় শহর, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইংরেজি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ইসলামি সংগঠনের সভায় বক্তব্য দিয়েছেন। তার বক্তব্য ছিল সুবিন্যস্ত, যুক্তিনির্ভর ও বিষয়ভিত্তিক। মানুষের আকিদা সংশোধন, আমলের শুদ্ধতা, লেনদেনের গুরুত্ব এবং চরিত্রের পবিত্রতা ছিল তার ওয়াজের অন্যতম প্রধান বিষয়।
ব্রিটিশ শাসনামলে পাশ্চাত্য দর্শন, সংস্কৃতি ও জীবনধারার প্রভাব ভারতীয় মুসলিম সমাজে ক্রমেই বাড়ছিল। থানভি (রহ.) এ পরিবর্তনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় সচেতনতা বাড়াতে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালান। এ বিষয়ে বহু বক্তব্য দেন এবং একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তার এসব কাজ সব ধরনের মানুষের মধ্যেই প্রভাব ফেলে। থানভি (রহ.) ছিলেন অসাধারণ লেখক। তার রচনার পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা পাওয়া যায়। এক সূত্র অনুযায়ী তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩৪৫টি। আবার অন্য এক সূত্রে এক হাজারের বেশি রচনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তার বিখ্যাত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘বেহেশতী জেওর’, ‘বয়ানুল কোরআন’, ‘ইমদাদুল ফাতাওয়া’, ‘মুনাজাতে মাকবুল’, ‘তারবিয়াতুস সালেক’, ‘ইসলাহুর রুসুম’ ও ‘তালীমুদ্দীন’। এসব গ্রন্থে ফিকহ, তাফসির, আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা ও ইসলামি জীবনব্যবস্থার নানা দিক আলোচিত হয়েছে।
তার প্রভাব শুধু তার নিজের সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তার বহু খলিফা ও শিষ্য পরবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্বীনি শিক্ষা ও ইসলাহি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। ফলে তার চিন্তা ও শিক্ষার প্রভাব বিস্তৃত ধারায় ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই তিনি ইহকাল ত্যাগ করেন।
তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া ও ডেইলি পাকিস্তান