মুসলিমের জীবন যেমন হওয়া উচিত

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ইসলাম মানুষকে কেবল নামাজ-রোজার মধ্যে আটকে রাখে না, বরং তার চরিত্র, আচরণ, চিন্তা এবং সমাজের সঙ্গে সম্পর্কসহ প্রতিটি বিষয়কে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো দেয়। কিন্তু আজকের দুনিয়ায় অনেক মুসলিম এই কাঠামো থেকে সরে গেছে। ইসলামের মূল শিক্ষাগুলো জীবন থেকে উঠে গেছে আর সেই জায়গায় এসেছে নানা ধরনের বিভ্রান্তি। যে মুসলিম ইসলাম ছাড়া অন্য আশ্রয়ে নিজেকে নিরাপদ মনে করে, সে আসলে নিজেকেই অপমানিত করছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় সে সুরক্ষিত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে পরাধীন।

একজন সত্যিকারের মুসলিমের প্রথম এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো গায়েবে বিশ্বাস। আল্লাহ সুরা বাকারার শুরুতেই মুত্তাকিদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, তারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, নামাজ কায়েম করে এবং যা দেওয়া হয়েছে তা থেকে ব্যয় করে। এই বিশ্বাস শুধু কথার বিষয় নয়, এটি জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। যে বিশ্বাস করে যে, সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, সৃষ্টির আগে থেকেই লেখা, সে কখনো হতাশায় ভেঙে পড়ে না, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে না।

ইতিহাস সাক্ষী, নবীজি (সা.)-এর ওফাতের পর মুসলিমরা তৎকালীন দুই মহাশক্তি রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যকে পরাজিত করেছিল। হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে মুসলিমরা পৃথিবীর নেতৃত্ব দিয়েছে। আজ যারা ক্ষমতায়, তাদের এই আধিপত্য মাত্র দুই-তিনশ বছরের। আল্লাহ কোরআনের সুরা আলে ইমরানের ১৪০ নম্বর আয়াতে বলেছেন, এই দিনগুলো আমি মানুষের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বদলে দিই। তাই হতাশ হওয়ার কারণ নেই। পরিবর্তন আসবে, তবে সেজন্য মুসলিমদের নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে, দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং সংকল্পে অটল থাকতে হবে।

আজকের মুসলিম সমাজের একটি বড় সংকট হলো, তারা এমন সব উৎস থেকে জ্ঞান নিচ্ছে, যেগুলো ইসলামের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়। এর ফলে ধীরে ধীরে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়েও তাদের মাঝে সংশয় তৈরি হচ্ছে। এক সময় সুদের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে সাহস পেত না। এখন অনেকেই এটাকে নিয়ে তর্ক করে। মদ নিষিদ্ধ কি না সেটা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তোলে। অথচ কোরআনের সুরা মায়েদার ৯০ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট বলা আছে, নেশাদার বস্তু, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি এবং ভাগ্য নির্ণায়ক তীর শয়তানের কাজ, এগুলো থেকে দূরে থাকো। এখানে দূরে থাকো শব্দটি নিষেধাজ্ঞার চেয়েও শক্তিশালী অর্থ বহন করে, কিন্তু অজ্ঞতার কারণে মানুষ এটা বুঝতে পারছে না।

যে মুসলিম ইসলামের বিধান মেনে চলে, সে সমাজে অদ্ভুত বলে পরিচিত হয়। যে মেয়ে হিজাব পরে, যে ছেলে সুন্নাহ মেনে চলে, তাকে গোঁড়া বা চরমপন্থি বলা হয়। এটা সমাজের বিকৃতি, মুসলিমের দোষ নয়। যে দ্বীনের কাছাকাছি, সে যত বেশি আক্রমণের মুখে পড়ে, আর যে ইসলামকে জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছে, সে সমাজে স্বাভাবিক বলে স্বীকৃতি পায়। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে? একজন মুসলিম তার দ্বীনের ওপর গর্বিত। কোনো পরিস্থিতি, কোনো চাপ, কোনো প্রলোভন তাকে তার বিশ্বাস থেকে সরাতে পারে না।

মুসলিমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তার আচরণ সবসময় এক রকম থাকে। সে কার সামনে আছে সেটার ওপর নির্ভর করে তার চরিত্র বদলায় না। কিন্তু আজকাল এমন অনেক মানুষ আছে, যারা ধার্মিকদের সামনে নামাজ পড়ে, ভালো সাজে আর অসৎ সঙ্গীদের সঙ্গে নিষিদ্ধ কাজে মেতে ওঠে। তারা মনে করে এটা বুদ্ধিমানের কাজ, কিন্তু এটা মূলত মুনাফেকি।

রমজান মাসে অনেককে দেখা যায় নামাজ পড়তে, কোরআন পড়তে, রোজা রাখতে। কিন্তু ঈদের চাঁদ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সব শেষ। এতে রমজানের ইবাদতকে ছোট করা হচ্ছে না, বরং প্রশ্ন উঠছে বাকি এগারো মাসের জীবন নিয়ে। রমজানে যা করা হয় তা সারা বছরই করা উচিত, রমজানে আরও বেশি করতে হবে। 

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক