দেশে সূর্যমুখী চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তেলবীজ হিসেবে এর চাহিদা বাড়ায় কৃষকরা নতুন করে এই ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সফলভাবে সূর্যমুখী উৎপাদন হচ্ছে, যা খাদ্যতেল নির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। জানিয়েছেন চট্টগ্রামের মিরসরাই থেকে আজমল হোসেন এবং দুমকি, পটুয়াখালী থেকে মজিবুর রহমান
চট্টগ্রাম, মিরসরাই
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সূর্যমুখী চাষ। ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং কৃষকদের আর্থিকভাবে লাভবান করার লক্ষ্য নিয়ে সরকারি প্রণোদনা সহায়তায় এবার উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সূর্যমুখীর চাষ করা হয়েছে। মাঠজুড়ে ফুটে থাকা হাজারো সূর্যমুখী ফুল একদিকে যেমন প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়িয়েছে, অন্যদিকে নতুন এই ফসলকে ঘিরে আশার আলো দেখছেন স্থানীয় কৃষকরা। সরেজমিন দেখা গেছে, অনুকূল আবহাওয়া ও যথাযথ পরিচর্যার কারণে অধিকাংশ গাছে ইতিমধ্যে ফুল ফুটেছে। ফলে বাম্পার ফলনের প্রত্যাশা করছেন চাষিরা।
তবে ভালো ফলনের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কৃষকরা জানান, মাঝেমধ্যেই পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে গাছের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কীটনাশক প্রয়োগের পরামর্শ দিচ্ছেন।
কৃষক সমীর চন্দ্র দাশ বলেন, কৃষি অফিসের প্রণোদনা পেয়ে তিনি ১৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ৪০ শতক জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে সূর্যমুখী চাষ করেছেন। শুরুতে কিছুটা সংশয় থাকলেও বর্তমানে গাছের বৃদ্ধি ও ফুলের অবস্থা দেখে তিনি আশাবাদী। সবকিছু অনুকূলে থাকলে খরচ বাদ দিয়ে ভালো লাভ হবে বলে তিনি মনে করছেন।
একইভাবে কৃষক জুয়েল দাশ জানান, চলতি বছরই প্রথমবারের মতো তিনি সূর্যমুখী চাষ করেছেন। এখন তার জমিজুড়ে ফুটে থাকা হলুদ ফুল দেখে তিনি বেশ উৎসাহিত। তার ভাষায়, মাঠভরা ফুল দেখে মনে হচ্ছে ফলন ভালোই হবে। বর্তমানে ভোজ্যতেলের দাম ভালো থাকায় তিনি আশা করছেন এ মৌসুমে লাভও বেশি হবে। স্থানীয় বাসিন্দা নুরুন নবী বলেন, তাদের এলাকায় গত দুই বছর ধরে সূর্যমুখী চাষ হচ্ছে। আশপাশের কৃষকদের সফলতা দেখে তিনিও আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। সরকার থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে আগামী বছর তিনিও সূর্যমুখী চাষে যুক্ত হতে চান বলে জানান।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা দিদারুল আহসান পাভেল বলেন, তার দায়িত্বপ্রাপ্ত ইছাখালী ইউনিয়নে এ বছর প্রায় ১ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী আবাদ হয়েছে। কৃষকদের আগ্রহ, পরিশ্রম এবং সরকারি সহায়তার কারণে এই আবাদ ধীরে ধীরে বাড়ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামীতে এই পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে।
মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন, সূর্যমুখীর তেলে পুষ্টিগুণ বেশি এবং বাজারে এর চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। এ কারণে কৃষকরা এ ফসলের প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন। তিনি জানান,
কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে চাষাবাদ থেকে শুরু করে ফসল সংগ্রহ এবং তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্ত কোনো সমস্যা না হয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সূর্যমুখীর আবাদ শুধু কৃষকদের নতুন আয়ের পথ তৈরি করছে না, বরং মিরসরাইয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও বাড়িয়ে তুলছে। প্রয়োজনীয় সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে সূর্যমুখী মিরসরাইয়ের কৃষকদের জন্য একটি লাভজনক বিকল্প ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
দুমকি, পটুয়াখালী
পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় সূর্যমুখী চাষের আবাদ বাড়ছে, কম খরচ ও বেশি লাভের আশায় কৃষকদের আগ্রহও বাড়ছে। চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৪১ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় বেশি।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে এখন বিস্তীর্ণ জমিতে সূর্যমুখীর হলুদ ফুলের সমারোহ দেখা যাচ্ছে। একসময় যেখানে বোরো ধান চাষ হতো, সেখানে এখন বিকল্প হিসেবে সূর্যমুখী চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা। কৃষকদের মতে, এই তেলবীজ ফসলে খরচ কম, সেচের প্রয়োজনও কম এবং লাভজনক হওয়ায় এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
স্থানীয় কৃষক মো. সেরাজ উদ্দিন খান, আবুল বাশার ও মো. ওলিউর রহমান জানান, সূর্যমুখী চাষে ফলন ভালো হওয়ায় তারা লাভবান হচ্ছেন। কেউ কেউ নিজস্ব ব্যবহারের জন্য তেল উৎপাদন করছেন, আবার বাজারেও বিক্রি করছেন। নতুন কৃষকরাও এই চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
তবে বাজারজাতকরণ, ন্যায্যমূল্য এবং তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এসব কৃষক। তারা আরও সরকারি সহায়তা ও সেচ সুবিধা বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ইসমিতা আক্তার সোনিয়া জানান, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৩৫ হেক্টরের বিপরীতে এবার ৪১ হেক্টরে আবাদ হয়েছে। কৃষি প্রণোদনার আওতায় কৃষকদের বীজ ও সার দেওয়া হচ্ছে এবং আগামীতে আবাদ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রয়োজনীয় সহায়তা ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে দুমকিতে সূর্যমুখী চাষ দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।