সুন্দর সিঁদুরে সহেলি

জু অ্যান্ড ওয়াইল্ড অ্যানিম্যাল মেডিসিন বিষয়ে ব্যবহারিক পরীক্ষায় বহিঃস্থ পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য সকাল সাড়ে ৮টায় চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পৌঁছেছি। কাল থেকে পরীক্ষা শুরু। হাতে এক দিন সময়। তাই গেস্ট হাউজের কেয়ারটেকার মতিউরকে সঙ্গে নিয়ে ফটিকছড়ির হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের উদ্দেশে বের হয়ে গেলাম। ওখানে পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় ১২টা। তাই সকালের পাখিগুলোর কার্যকলাপ দেখা থেকে বঞ্চিত হলাম। অভয়ারণ্যের গেট থেকে দুটি টিকিট কেটে পুকুর পাড়ে এলাম। একজোড়া সরালি হাঁস, একটি গোবক ও একটি ছোট পানকৌড়ির দেখা পেলাম। এরপর দ্রুত ছড়ার দিকে হাঁটা দিলাম। প্রচন্ড গরম। আশপাশে তেমন একটা পাখি নেই। গেট থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে ছড়া। পথিমধ্যে ঝুঁটি শালিক ছাড়া আর কোনো পাখির দেখা পেলাম না।

ছড়ার কাছে এসে খানিকটা বিশ্রাম নিলাম। পানি থেকে প্যান্ট রক্ষার জন্য মোবাইল প্যান্টের নিচের অংশ খুলে ফেললাম। আমরা যে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলাম সে গাছে ইতিমধ্যেই বেশকিছু ছোট ছোট পাখির আনাগোনা শুরু হলো। একজোড়া করে সিঁদুরে মৌটুসি, সিপাহি বুলবুলি ও কালো-ঘাড় টুনটুনির দেখা পেলাম। প্রতিটি জোড়াই প্রেম পর্বের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে কালো-ঘাড় টুনটুনির অস্থিরভাবে লাফালাফি ও ডানা মেলে নাচিনাচি করে প্রেমের আহ্বান মন কাড়ল। ছোট্ট এই পাখিগুলোর সঙ্গে কিছুটা সময় কাটিয়ে ছড়ার পানিতে নেমে পড়লাম।

ছড়ার পানিতে পা রাখতেই পুরো দেহ শীতল হয়ে গেল। এতক্ষণের গরম যেন নিমেষেই উড়ে গেল। ছড়ার পুরোটা সময় অন্তত প্রচ- গরমের হাত থেকে বাঁচা যাবে। শুরুতেই দুটি প্রজাপতি ও একটি ফড়িংয়ের ছবি তুললাম। এরপর ছড়ার ভেতর ঢুকে গেলাম। ছড়ার প্রথম বাঁক পেরিয়ে লেবু বাগানের সামনে আসতেই ভ্রমণসঙ্গী মতিউর বলল ‘স্যার, পাহাড়ের গাছে দেখুন চমৎকার লাল একটি পাখি; এটার নাম কী?’ আমি প্রজাপতি খুঁজছিলাম। ওর ডাকে পেছনে তাকাতেই দেখি বিশাল একটা গাছে টকটকে লাল ও কালোর মিশ্রণে ছোট্ট একটি পাখি বসে আছে। দ্রুত ওর দিকে ক্যামেরা তাক করলাম। তবে দুই-তিনটি ক্লিক করতেই সে জায়গা বদল করল। ক্যামেরার পজিশন ঘুরিয়ে আবারও ক্লিক করলাম। চটপটে পাখিটি বারবারই জায়গা পরিবর্তন করছে। আমি সমানে শাটার চাপছি। আর এক সময় সে যখন উড়ল তখন তার ডানার নিচের কমলা-কালো ও বুক-পেটের সিঁদুরে লাল রঙে যেন আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। ক্যামেরার ফ্রেমে সেই ছবি বন্দি করতে এক সেকে-েরও কম সময় লাগল। ১৭ এপ্রিল ২০২৬ সালের ঘটনা এটি।

এতক্ষণ রূপ-লাবণ্যে ভরা অতি সুন্দর যে পাখিটির কথা বললাম সে এ দেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি সিঁদুরে সহেলি। সিঁদুরে-লাল সাত সহেলি, সিঁদুরে সাত সাইলি, আলতাপরি বা রাঙা বউ নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Scarlet or Orange Minivet। ক্যাম্পোফাজিডি গোত্রভুক্ত পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Pericrocotus flammeus  (পেরিক্রকটাস ফ্লেমিয়াস)। পাখিটি বাংলাদেশসহ দক্ষিণ, পূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বসবাস করে।

সিঁদুরে সহেলি ছোট আকারের পাখি। লম্বায় মাত্র ২২ সেন্টিমিটার। ওজন মাত্র ২৬ গ্রাম। পুরুষটির বুক, পেট ও লেজের তলা আলতা-লাল। মাথা, গলা, পিঠ ও লেজের উপরিভাগ চকচকে কালো। কালচে ডানায় দুটি আলতা-লাল পট্টি। কোমর আলতা-লাল। পুরুষ ও স্ত্রীর পালকের রঙে বেশ পার্থক্য থাকে। তবে প্রথম দর্শনে স্ত্রীটিকে দেখতে পুরোপুরি হলদে বলেই মনে হবে। স্ত্রীর কপাল, গলা, বুক, পেট ও লেজের তলা হলুদ। মাথা, পিঠ ও লেজের ওপরটা কালচে-ধূসর। ডানা কালচে ধূসর ও তাতে দুটি হলুদ পট্টি রয়েছে। স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েরই চোখ বাদামি এবং ঠোঁট কালো। পা, পায়ের পাতা এবং আঙুলও কালো।

মূলত পাহাড়-টিলাময় বন ও সুন্দরবনে বাস করে। বন ও চষা জমিতে বিচরণ করে। সচরাচর জোড়ায় বা ঝাঁকে দেখা যায়। শুঁয়াপোকা ও বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গ প্রধান খাদ্য। খাবারের সন্ধানে গাছের ডাল থেকে ডালে ঘুরে বেড়ায় ও খাবার শিকার করে। ‘টিউয়ি-টিউয়ি’ করে বেশ মধুর স্বরে বারংবার ডাকতে থাকে।

ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর প্রজননকাল। গাছের সরু শাখায় লতা, শিকড়, লাইকেন, মাকড়সার জাল ইত্যাদি দিয়ে গোলাকার ছিমছাম বাসা বানায়। বাসা বানানো হয়ে গেলে স্ত্রী তাতে ২-৪টি নীল-সবুজ রঙের ডিম পাড়ে। স্ত্রী একাই ডিমে তা দেয়। ডিম ফোটে ১৩-১৯ দিনে। মা-বাবা দুজনে মিলেমিশে ছানাদের লালনপালন করে। আয়ুষ্কাল ৪-৫ বছর।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়