তিন ধাপে আনসারের নতুন পরিকল্পনা

বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রযুক্তি সক্ষমতা বৃদ্ধি, তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারী উদ্যোক্তা তৈরি এবং সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে সরকারের গ্রহণ করা উন্নয়ন ও সেবামূলক কর্মসূচি প্রত্যন্ত জনপদের ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছে। ক্ষমতাসীন সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এসব বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষমতাসীন বিএনপির ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য সব মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিটি মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও বিভাগ একটি নিদিষ্ট ছকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে দপ্তরগুলো দলটির ইশতেহারে বর্ণিত প্রতিশ্রুতি, বাস্তবায়ন কর্মকৌশল, ফলাফল এবং তা বাস্তবায়নে বাহিনী কীভাবে ভূমিকা রাখবে, সে বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন সব বাহিনী ও অধিদপ্তর কর্মপরিকল্পনা সাজিয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন।

এতে প্রথম ধাপে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে বাহিনীগুলো কী করবে, তা তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ২০২৬-২৭ অর্থবছর এবং তৃতীয় ধাপে সরকারের পূর্ণ মেয়াদে (পাঁচ বছর) কী কী পরিকল্পনা রয়েছে, তা তুলে ধরা হয়েছে। সব বাহিনী সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ ও অপরাধ দমনে কঠোর ভূমিকা রাখার কথা উল্লেখ করেছে।

আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর গ্রহণ করা উদ্যোগ সম্পর্কে মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাহিনীর পক্ষ থেকে শিক্ষিত বেকার ও প্রত্যন্ত অঞ্চেলের জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনমুখী কাজে লাগাতে নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর বিশে^ আইটি দক্ষতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। বিষয়টি বিবেচনায় রেথে বাহিনীতে দক্ষ  আইটি জনবল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের নির্দেশনা অনুসারে আনসার বাহিনী স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। যার অংশ হিসেবে বিদেশি ভাষা শিক্ষার ওপরও গুরুত্বসহকারে দক্ষতামূলক বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে, যা বাহিনীর জনসেবামূলক কার্যক্রমকে আরও বেগবান করছে।’

বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী তাদের পরিকল্পনায় প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিয়েছে। সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে আনসার বাহিনী সারা দেশে ১ লাখ ৯১ হাজার ১৩৪ জনকে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছে। একইভাবে সরকারের প্রথম অর্থ বছরে আনসার বাহিনীর পক্ষ থেকে উপরোক্ত বিষয়ের ওপরে ৬০ থেকে ৭০ দিন করে ৪ থেকে ৬ ধাপে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৯৮০ জনকে এবং এরপর ৬০ থেকে ৭০ দিন করে ২০ থেকে ৩০ ধাপে ৭ লাখ ১৪ হাজার ৮৬০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা জানিয়েছে। এসব প্রশিক্ষণে নারী ও পুরুষ উভয়ে অংশ নেওয়া সুযোগ পাবেন।

সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের প্রশিক্ষণের মধ্যে দেশব্যাপী কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে ৬৫ হাজার তরুণকে ২৮ দিন মেয়াদি ‘ভিডিপি অ্যাডভ্যান্সড কোর্স’ ও ‘ইউথ লিডারশিপ কোসের্র’ আওতায় নিয়ে আসা হবে। জানা গেছে, এটি বেসামরিক নাগারিকদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো একটি কোর্স। প্রশিক্ষণার্থীদের সনদপত্র দেওয়া হয়। এরা আনসার বাহিনীতে চাকরির এবং বিভিন্ন সময় চুক্তিভিক্তিক কাজের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পান। তাদের অস্ত্র প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অপ্রচলিত যুদ্ধ কৌশল, সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কৌশল বিষয়ে ধারণা দেওয়া হয়। এর ফলে তারা সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ-উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি, প্রতিরোধ ও প্রতিহত করতে ভূমিকা রাখতে পারবেন।

একই সময়ের মধ্যে সারা দেশে নারীদের ফ্যাশন ডিজাইন ও ওভেন অপারেটিংয়ের ওপরে পাঁচ ধাপে ৩৯০ জনকে প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। বন্যা ও ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ মোকাবেলায় ৯০ হাজার স্বেচ্ছাসেবীকে বিভিন্ন মেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ভাষা ও দক্ষতা, যুগোপযোগী শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষিত চালকসহ আটটি ক্যাটাগরিতে ৩ হাজার ১৪০জনকে প্রশিক্ষণ পাবেন। এর বাইরে ৪০০ জনকে জাপানিজ ভাষা শিক্ষা দেওয়া হবে। জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় ১০০ জনকে ট্রেডে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ইশতেহারের আলোকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ৬৫ হাজার গাছ বিতরণ করার পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে।

আনসার বাহিনী সরকারের সেবামূলক কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্যসেবা, তরুণ কর্মসংস্থান, ক্রীড়া উন্নয়ন, পরিবেশ ও জলবায়ু এবং ডিজিটাল অর্থনীতি কর্মসূচি বাস্তবায়নে তাদের পরিকল্পনা তুলে ধরেছে। এর মধ্যে প্রথম ১২০ দিন দেশের প্রত্যান্ত অঞ্চল থেকে প্রকৃত দরিদ্র পরিবার এবং প্রকৃত কৃষক, মৎস্যচাষি ও খামারিদের শনাক্ত করে সরকারের ডাটাবেজ করতে সহায়তা করবে। এরপর শেষের ৬০ দিন কার্ড বিতরণ ও সরকারি ক্রয়কেন্দ্রের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কাজ করবে।

স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির আওতায় একইভাবে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ যাচাই, টিকাদান ও জনস্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন করা হবে। পরে হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাহিনীর তত্ত্বাবধানে মেডিকেল ক্যাম্প বসানো হবে।

এদিকে প্রতিটি উপজেলায় ৬০ জন করে (৪৯৫টি উপজেলায় ২৯ হাজার ৭০০ জন) তরুণকে ‘স্কিল ডেভেলপমেন্টের’ প্রশিক্ষণ দেওয়ারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ক্রীড়া উন্নয়নের জন্য আনসার বাহিনী সরকারের প্রথম ১২০ দিন গ্রামীণ পর্যায়ে ক্রীড়া প্রতিভা বিকাশে সহায়তা এবং প্রতিভা অন্বেষণ করবে। পরের ৬০ দিনে তারা বাহিনীর ক্রীড়া দলকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জন্য প্রস্তুত করবেন। এ ছাড়া নতুন ২ শতাধিক ক্রীড়া প্রতিভা তৈরি করবেন।

বাহিনী ও সরকার সম্পর্কে যেকোনো ধরনের গুজব ও প্রোপাগান্ডা মোকাবিলায় একটি সাইবার ইউনিট গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে আনসার বাহিনীর পরিকল্পনায়। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তায় উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ আয়োজনের কথাও জানা হয়েছে।

প্রায় ৬১ লাখ সদস্যের প্রশিক্ষিত আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী দীর্ঘদিন থেকে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে শক্তিশালী ভূমিকা রেখে আসছে। বৃহৎ জনবল, গ্রামভিত্তিক নেটওর্য়াক, শৃঙ্খলাবদ্ধ কাঠামো, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সমন্বিত কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের।

সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। অতীতে দেখেছি,  যে দলই সরকারে গেছে, তারা নির্বাচনী ইশতেহারকে উপেক্ষা করেছে। বর্তমান সরকার যেটা পরিকল্পনা নিচ্ছে, সেটা ভালো। তারা যেনো সাধারণ মানুষ ও দেশের জন্য কল্যাণকর অন্যান্য বিষয়গুলো উপেক্ষা না করেন, সে দিকে যেনো নজর রাখেন।

তিনি বলেন, সরকারের এখন বড় বিষয় তারা যেনো দলীয়করণ না করে ফেলেন। আমাদের দরকার যোগ্য, মেধাবী ও সৎ লোক। সব জায়গায় দলীয় লোক যোগ্য হয় না। বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই, আওয়ামী লীগ সরকারের দিকে তাকালেই দেখবেন দলীয়করণই শেখ হাসিনাকে দানবে পরিণত করেছে। আমরা যেনো এ পথে না হাঁটি।