বিলুপ্তির পথে শখের হাঁড়ি

মাটির তৈরি ছোট-বড় পাত্র দক্ষ হাতে রঙের প্রলেপে হয়ে ওঠে শখের হাঁড়ি। একসময় ঘর সাজানো আর ছোটখাটো জিনিসপত্র রাখার কাজে গ্রামে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হতো এই হাঁড়ি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় বদলে গেছে এই ধারা। গ্রামীণ ঐতিহ্য হিসেবে এখন শখের হাঁড়ির সমাদর হয় মূলত বৈশাখী আয়োজনে। গ্রামীণ মেলা কমে যাওয়াসহ নানান সীমাবদ্ধতায় ভালো নেই শখের হাঁড়ির শিল্পীরা। ফলে অনেকেই পেশা বদল করেছেন। আবার অনেকেই খুঁজছেন নতুন পথ।

এই শতাব্দীর শুরু থেকেই ভালো নেই পাল সম্প্রদায়ের কারুশিল্পীরা। আধুনিকতার সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছেন তারা। এই দৌড়ে তারা আর নিজেদের ধরে রাখতে চান না। সহজ পথ খুঁজে অনেকেই জড়িয়ে পড়ছেন কৃষিকাজ কিংবা অন্য কোনো পেশায়। অন্য মৃৎশিল্পীরা হয়তো মাটির হাঁড়ি-পাতিল ও কলস বিক্রি করছেন। তবে শখের হাঁড়ির কদর তলানিতে পৌঁছেছে। বিগত ৫ বছরে বড় ধাক্কার শিকার হয়েছেন শখের হাঁড়ির কারিগররা। করোনার থাবা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এসব কাটিয়ে এবারের বৈশাখ ঘিরে তারা একটু সোজা হয়ে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাতে প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি। সময়ের সাথে তাল মেলাতে না পেরে হতাশা জমেছে এই কারিগরদের মনে।

রাজশাহী অঞ্চলের আলোচিত শখের হাঁড়ির কারিগর সুশান্ত কুমার পাল। আফসোস করে তিনি বলেন, ‘মনে হয় এই শিল্পটা আর টিকবে না। আমি থাকা পর্যন্ত হয়তো এটা করে যাব। কিন্তু আমার ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনিরা এসব কতদিন ধরে রাখবে, তা নিয়ে সংশয় আছে। তারা এখন আমার সঙ্গে কাজ করছে। কিন্তু আর্থিক যে দুরবস্থা তাতে তো বেশি দিন টিকে থাকার কথা নয়।’ সৌখিন এই মৃতশিল্পী বলেন, ‘করোনার কারণে দুই বছর বৈশাখ উদযাপনের আয়োজন তেমনভাবে হয়নি। এরপর দুই বছর বৈশাখ মাসে রোজা ছিল। এর পরের দুই বছর আবার রাজনৈতিক অস্থিরতা। এসব কারণে কয়েক বছরে বানানো এসব জিনিসপত্র বস্তাবন্দি করে রেখে দিতে হয়েছে।’

সুশান্ত পালের দেওয়া তথ্যমতে, তিনি অন্তত ৪০ বছর ধরে এই কাজ করছেন। তার সময়ে এ অঞ্চলে অন্তত ৪ হাজার কারিগর শখের হাঁড়ি বানাতেন। কিন্তু এখন আর হাঁড়ি বানানোর কোনো কারিগর নেই। এখন শুধুমাত্র সুশান্ত পাল ও তার পরিবারের কয়েকজন এই কাজ করে থাকেন। তিনিসহ তার স্ত্রী মমতা রানী পাল, দুই ছেলে সঞ্জয় কুমার পাল, মৃত্যুঞ্জয় কুমার পাল, ছেলেদের স্ত্রী মুক্তি রানী পাল ও করুণা রানী পাল এখনো টিকিয়ে রেখেছেন এই শিল্প। তাদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করেন সুশান্ত পালের নাতি-নাতনিরাও। সুশান্ত পালের তত্ত্বাবধানে প্রতি বছরই এখানে তৈরি হয় শখের হাঁড়ি, পঞ্চসাঞ্জি, মাটির পুতুলসহ দৃষ্টিনন্দন তৈজসপত্র। রঙ, মোটিফ ও নকশায় তার তৈরি শখের হাঁড়ি পেয়েছিল দেশজোড়া পরিচিতি। বাংলাদেশে প্রচলিত শখের হাঁড়ির এখন নাম হয়ে গেছে ‘রাজশাহীর শখের হাঁড়ি’।

কয়েক বছর আগেও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘর, বাংলা একাডেমি, চীন-মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্র এবং হার্ডকো স্কুল চত্বরে মেলার আয়োজন করা হতো। সেসব মেলায় তাদের মৃৎশিল্প জায়গা পেতো। সুশান্ত পাল এসব মেলায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন পুরস্কারও পেয়েছেন। বিদেশেও গেছেন মেলায় অংশ নিতে। এখন এসব অতীত। সুশান্ত বলেন, ‘এই শিল্প হারিয়ে যাবে এটা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আমারতো আর কিছু করার নাই।’

সুশান্ত পাল বলেন, ‘রাজশাহীর পদ্মা নদীর ধারে বিকেলে অনেকেই ঘুরতে যান। নদীর ধারে ছোটখাটো অনেক দোকানও বসে প্রতিদিন। সেখানে যদি জেলা প্রশাসন একটা দোকান দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে সেখানে কিছু শখের হাঁড়ি, খেলনা রাখা যেত। এতে সাধারণ মানুষ দেখতে পেতো। কিছু বিক্রিও হতো। এতে আমার পরের প্রজন্ম হয়তো আরও কিছুদিন এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে পারত।’

এদিকে আধুনিকতার এই যুগে মাটির তৈরি নিত্যপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন বিশেষজ্ঞরাও। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের পৃষ্ঠপোষকতার বিকল্প নেই বলছেন তারা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অধ্যাপক ড. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমরা আধুনিক সমাজে মেলামাইনসহ যেসব পণ্য ব্যবহার করি সেগুলো স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। অথচ মাটির তৈরি নিত্যপণ্যগুলোয় সেই ক্ষতি হয় না মানুষকে এই তথ্যটা আমাদের জানাতে হবে।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের সভাপতি ড. এ. কে. এম আরিফুল ইসলাম মনে করেন, এই শিল্প রক্ষায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা খুব জরুরি। বেসরকারি কোনো বড় প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলেও এই শিল্প বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে। বিদেশে আমাদের দেশের সৌখিন এসব কাজের বেশ চাহিদা আছে। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা গেলেও ঘুরে দাঁড়াতে পারে এই শিল্প।